মেইন ম্যেনু

অন্ধত্বকে জয় : জন্মান্ধ ৪ বোনের পথচলা

পটিয়া (চট্টগ্রাম) : উম্মে তাসলিম চৌধুরী, উম্মে তানজিলা চৌধুরী, উম্মে হাবিবা চৌধুরী ও উম্মে সালিমা চৌধুরী। জন্মান্ধ চার যমজ। জন্মের পর থেকেই তারা দেখেননি পৃথিবীর আলো। মনের ইচ্ছা শক্তি দিয়ে তারা অন্ধত্বকে জয় করেছেন। চার বোন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। নিয়োজিত রয়েছেন শিক্ষকতার মহান পেশায়। জ্বালছেন শিক্ষার আলো।

পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের নাছির উদ্দিন চৌধুরীর চার যমজ কন্যা আলোকিত করছেন সমাজকে। এলাকায় মহৎ কর্মে তরুণ, তরুণী, শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে আলোকবর্তিতা পথ দেখাচ্ছে। এবারের ইত্যাদিতে তাদেরকে নিয়ে ইত্যাদির পরিচালক হানিফ সংকেত একটি বিশেষ সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।

জানা গেছে, পরিবারে তারা চার বোন এক ভাই। ভাই পৃথিবীর আলো দেখলেও চার বোন জন্ম থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। বর্তমানে চার বোনের মধ্যে তিনজনেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গর্বিত শিক্ষক। অন্য বোন উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে যাচ্ছেন। এখানে আশার কথা হলো জন্মান্ধ সেই অন্ধের পথচলা। তারা পটিয়ার শত শত শিশুর মাঝে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো। সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এই চার বোনের মধ্যে তিনজন শিক্ষকতার পাশাপাশি রান্নাবান্না, গান, স্ক্রিন টাচ মোবাইল, কম্পিউটারসহ প্রায় সব কাজে পারদর্শী।

যা বর্তমানে সমাজে বিরল এক দৃষ্টান্ত। উম্মে তানজিলা চৌধুরী পটিয়া পৌরসদরের মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা, উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া পৌরসদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা, উম্মে তাসলিমা চৌধুরী পটিয়া পৌর সদরের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও অপর বোন উম্মে সালিমা চৌধুরী চট্টগ্রাম নগরীর পিতা-মাতার সঙ্গে লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে জীবন যাপন করছেন।

ছোট ভাই নঈম উদ্দীন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ লেখাপড়া শেষ করে চট্টগ্রামে বায়িং হাউজে কর্মরত রয়েছেন। তাদের জন্মস্থান পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামে। পিতার নাম- নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও মাতার নাম- শামীমা আক্তার চৌধুরী। তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তারা চট্টগ্রাম শহরের হামজার বাগ এলাকায় বাবার ব্যবসা বাণিজ্যের সূত্রধরে বাসায় শৈশব কাল হতে বড় হয়। মুরাদপুরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হইতে উচ্চ শিক্ষায় ডিগ্রি গ্রহণ করেন।

চার বোনের মধ্যে বর্তমানে তাসলিমা, তানজিলা ও হাবিবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। চার বোনের মধ্যে প্রতিবন্ধী উম্মে তানজিলা চৌধুরী পটিয়া পৌরসভার মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হইতে সমাজতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সে এই ছাত্রী লেখাপড়া শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদান করে।

তানজিলা জানান, শিক্ষকের মতো প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে স্কুলে প্রবেশ করে এবং স্কুল ছুটির শেষে বাসায় ফিরে যান। আমি জন্মান্ধ হলেও আমার কাজের মূল্যায়ন করায় আমি গর্বিত। তিনি বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাজমুন নাহার ম্যাডাম তাকে খুবই ভালোবাসেন। ক্লাস নেয়ার সময় তাকে প্রতিদিন একজন শিক্ষক সহযোগিতা করে থাকেন। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাজমুন নাহার বলেন তানজিলা গান, কম্পিউটার এবং স্ক্রিন টাচ মোবাইল অপারেট করতে পারে। সে খুব ভালো শিক্ষিকা প্রতিবন্ধীদের উৎসাহ দিলে সমাজকে তারা আরো এগিয়ে নিতে পারবে।

উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া পৌর সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তিনি নিয়মিত অন্যান্য সুস্থ সবল শিক্ষকদের মতোই পাঠদান করেন বলে প্রধান শিক্ষিকা চাঁদ সুলতানা জানান। সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর সুযোগ্য সন্তান ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র মো. রবিউল হাসান চৌধুরী বলেন, আমাদের সুস্থ শিক্ষকদের ন্যায় হাবিবা ম্যাডাম আমাদের সুন্দর ভাবে ক্লাসে পাঠদান করেন। এবার গত ২ সপ্তাহ পূর্বে আমাদের ক্লাসে হাবিবা ম্যাডামের পাঠদান পর্ব ইত্যাদিতে দেখানোর জন্য রেকর্ডিং করা হয়।

আমাদের এ সময় শিক্ষকরা বলেন, এবারের ঈদে ইত্যাদির প্রধান আকর্ষণ হবে। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু পটিয়াবাসীরা ইত্যাদির আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানটি আমরা উপভোগ করেছি। পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ অন্ধত্বকে জয় : জন্মান্ধ ৪ বোনের পথচলা

গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা উম্মে তাসলিমা চৌধুরী বলেন তারা চার বোন অন্ধ হলেও তাদের একমাত্র ভাই (দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন)। লেখাপড়া শেষ করে বায়িং হাউজে কর্মরত রয়েছে। তাসলিমা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি গ্রহণ করেন। দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা। তিনি বলেন, আমি জন্মান্ধ হলেও আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। আমি আমার হৃদয়ের আয়নায় পৃথিবীতে দেখি।

এ পর্যন্ত নিজের এবং মা-বাবা ও ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় উচ্চ শিক্ষায় ডিগ্রি গ্রহণ করতে পেরেছি। সরকার আমাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা সরকারের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। পটিয়ার স্বনামধন্য হাফেজ আহমদ চৌধুরী স্কলারশিপের চেয়ারম্যান আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার আহমদ কামাল চৌধুরী বলেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। একই পরিবারের ৪ বোন জন্মান্ধ এবং তার মধ্যে তিনজন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। যা বর্তমানে পটিয়ায় এক দৃষ্টান্ত স্বরূপ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে খুবই চিন্তিত। এদের নিয়ে ভাবার দরকার।

এজন্য পটিয়া উপজেলায় এ ধরনের অসহায় প্রতিবন্ধীদের কাজে সমাজের প্রভাবশালী মহল এগিয়ে আসলে তাদের সহযোগিতার হাত আরো জোরদার হবে। প্রতিটি মানুষ প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ালে তারা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। পটিয়া পৌর সদরের অধিবাসী স্কুলের অভিভাবক, পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব বাবুল বলেন, এ ৪ বোন কীর্তিমান শিক্ষিকা।

অন্ধ হয়েও সমাজে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। আজকের এ ডিজিটাল যুগে যেখানে সুস্থ সবল মানুষগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না, সেখানে তাদের এ অর্জন বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে বলে আমি মনে করি। আমি তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আরো এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখার জন্য বর্তমান সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। -এমজমিন






মন্তব্য চালু নেই