মেইন ম্যেনু

অপরিচ্ছন্ন বেরোবি, গোঁজামিল দিয়ে চলছে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন শাখা

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত একাডেমিক ভবনগুলো অপরিস্কার আর অপরিচ্ছন্নতায় পূর্ণ। ৪ টি ভবনই অপরিচ্ছন্ন আর নোংরা থাকে প্রায় সময়। ভবনগুলোর বাথরুমের অবস্থা খুবই নোংরা। এখানে পানির ট্যাপ আছে, পানি নেই। আবার কোথাও পানির ট্যাপই নাই। আবার কোনো টয়লেট সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিস্কার করা হয়না। মুখ এবং নাক চেপে যেতে হয় বাথরুমে। আর এভাবেই একাডেমিক ভবনগুলো অপরিস্কার আর নোংরা থেকে যাচ্ছে দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে আরো নোংরা অবস্থা। যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে ঘন জঙ্গল।

আর এসব বিষয়ে তদারকির জন্য নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন শাখার অবস্থা আরো বেহাল। মাত্র ২জন কর্মী দিয়ে চলছে শাখাটি। একজন সহকারি নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরেক জন ডকুমেন্ট সহকারি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪টি ভবনে মাত্র ৩ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী (ক্লীনার) এবং প্রশাসনিক ভবনে ২ জন । পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ২জন পানির লাইন মেরামতকারী (প্লাম্বার) রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি ভবনে ২১ টি বিভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। শিক্ষক রয়েছে ১৩৯ জন। আর প্রতিটি বিভাগীয় অফিসে ৪জন করে হলেও ৮১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছে।

একাডেমিক ভবন-৩ এ বিভাগ রয়েছে ৭টি। এই ৭টি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ১৪ টি বাথরুম রয়েছে। যেখানে একটি বিভাগের একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০ এর বেশি। একেকটি বিভাগের ব্যাচ সংখ্যা পাঁচ/ছয় টি। পুরো ভবন (৪ তলা) পরিস্কার করার জন্য মাত্র একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী।

এই পরিচ্ছন্ন কর্মীকে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকের অফিস কক্ষ, টয়লেট থেকে শুরু করে সবকিছুই পারস্কার করতে হয়। একজন কর্মকর্তা জানান, একজনের পক্ষে কখনোই পুরো ভবন পরিস্কার করা সম্ভব নয়। এই ভবনগুলোর বাথরুমে গিয়ে দেখা গেছে পানির ট্যাপ নাই, ট্যাপ থাকলেও পর্যাপ্ত পানি নাই। পেশাবের জায়গা আর টয়লেটগুলো দেখলে মনে হয় কয়েকমাস থেকে পরিস্কার করা হয় না। মার্কেটিং বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজন অনুসারে প্রতিটি ফ্লোরে একজন করে পরিচ্ছন্ন কর্মী প্রয়োজন কিন্তু সেখানে পুরো ভবন মিলে মাত্র একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী রয়েছেন।

একাডেমিক ভবন-২ (৫টি বিভাগ) এ গিয়ে দেখা গেছে ফ্লোরগুলোর শ্রেণিকক্ষে উঠার সিঁড়িগুলো মাস খানেক হবে নোংরা পড়ে আছে। ময়লা দিয়ে উঁচু হয়ে আছে। ছেলেদের টয়লেটগুলো নোংরা হয়ে আছে। নির্মানগত কৌশলে ছেলেদের দাঁড়িয়ে থেকে পেশাবের কাজ সারতে হয়। আবার তার পাশেই হাতমুখ ধোঁয়ার জায়গা। তবে সেখানে প্রায় সময়েই পানি থাকে না। এমনকি ট্যাপগুলোই নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইটিই (ইলেকট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের কয়েকজন ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের বেসিনে প্রায় সময় পানি থাকে না। এমনকি হাতমুখ ধোঁয়ার স্থানে ট্যাপগুলো নষ্ট তবে প্রায়গুলো চুরি হয়ে গেছে।

এই ভবনে কাজ করে তুহিন কান্ত সুমন নামে একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী। বিভাগের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, সুমন অনেক দিন হলো আসে না। আমরা তাকে পাই না। কয়েক সপ্তাহ পরপর প্রশাসনিক ভবন থেকে এক মহিলাকে নিয়ে এসে ঠেকা কাজ চালাই। এমনকি আমাদের নিজেদেরকেই পরিস্কার করতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন,‘আমি অনেকদিন নিজ উদ্যোগে এই কাজগুলো করিয়ে নিয়েছি।’ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কি না জানতে চাইলে ঐ শিক্ষক বলেন, ‘অনেকবার এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’

একাডেমিক ভবন ৪ (বিজ্ঞান অনুষদ) এ ৪টি বিভাগ রয়েছে। এই ভবনেও একই অবস্থা। প্রায় সময় টয়লেটগুলো থাকে অপরিচ্ছন্ন আর নোংরা। ট্যাপে পানি নাই। ট্যাপগুলো প্রায় চুরি হয়ে গেছে। প্রায় সময় পায়খানা সেরে পানি ব্যবহারের উপায় থাকে না। টয়লেট টিস্যু দিয়ে কাজ সারতে হয়।এখানে আছে সন্তোষ কুমার নামে মাত্র একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী।

কবি হেয়াত মামুদ ভবনেও (কলা অনুষদ) একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী। এখানে ৫টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে। এখানে কয়েকটি বিভাগের বাথরুম মোটামুটি পরিস্কার থাকলেও পেশাবের স্থানে নাই পানির সুব্যবস্থা। আর বাকি বিভাগগুলোর অবস্থা পূর্বের ভবনগুলোর মতো।

এই ভবনগুলোতে পানির লাইন মেরামতের জন্য শামীম আহমেদ ও আইযুব আলী নামে দুই জন কর্মচারিকে দায়িত্ব দিলেও ভবনগুলোর পানির লাইনের বেহাল ব্যবস্থা দূর হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের এই দূরবস্থায় বাথরুম সারতে হচ্ছে নাক – মুখ চেপে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা আর পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি দেখাশোনা করে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন শাখা। সেখানে গিয়ে দেখা গেল মাত্র ২ জন কর্মী বসে আছে। একজন সহকারি নিরাপত্তা কর্মী । আরেকজন নিজেকে ডকুমেন্ট সহকারি পরিচয় দিলেন। সেখানে একজন সেকশন অফিসার মোঃ মোক্তারুল ইসলাম (গ্রেড-১) থাকার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইরিতে থাকলেও জানা যায়, এক বছর আগে বিশেষ কারনে তাকে বরখাস্ত করে রাখা হয়েছে। পদাধিকার বলে শাখাটিতে একজন সহকারি রেজিস্টার থাকার কথা কিন্তু এই শাখায় এখন পর্যন্ত কাউকে নিয়োগ নেওয়া হয়নি। ফলে গোঁজামিল দিয়ে চলছে এই শাখাটি।

জানা যায়, এখানে নিরাপত্তা কর্মী ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের স্বাক্ষর খাতা দেখার জন্য শাহ সোহেল মিয়া নামে একজন হাবিলদার ছিল। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে সে আর আসে না। জানা গেছে, প্রায় ২ বছর ধরে বেতন না পেয়ে সে আর আসে না। তার কাজটি করছেন আকিদা ইয়াসমিন নামে এক মহিলা। সেখানে অফিসটি এবং নিরাপত্তা কর্মীদের দেখাশুনার জন্য বিপ্লব নামের একজন সুপারভাইজার রয়েছেন। মোটের উপর বর্তমান অফিসটি ২ জন ব্যক্তি দিয়ে কোনো মতে চলছে। শাখাটিতে থাকা নিরাপত্তা কর্মীকে এ ব্যাপারে জিেেজ্ঞস করলে, তিনি এ ব্যাপারে সকল তথ্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার মোরশেদ উল আলম রনি (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) কে দেখিয়ে দেন। তবে তিনি স্বীকার করে বলেন,“এখানে জনবল কম।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে মোটামোটি কিছু কর্মী থাকলেও ৪টি ভবনের বাথরুমগুলো পরিস্কার করার জন্য মাত্র ৩ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী রয়েছে। এটি রেজিস্টার দপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি শাখা হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তর থেকে পানি সরবরাহ এবং লাইন মেরামতের কাজটি করা হয়। তবে সবই উপাচার্য এবং নিয়মের বেড়াজালে বন্দী বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী কমলেশ চন্দ্র এবং শরীফ হোসাইন পাটোয়ারী জানান, যখনই আমাদের কাছে পানি সরবরাহ সংক্রান্ত চিঠি আসে তখনই সে অনুযায়ী কাজ করি আমরা। তারা বলেন, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে পানি সরবরাহের জন্য মাত্র ২ জন পানির লাইন মেরামতকারী লোক (প্লাম্বার) রয়েছে। ২ জন লোক দিয়েই একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষকদের ডরমেটরী, উপাচার্যের বাসভবন সহ সহ পুরো ক্যাম্পাসে পানির লাইন মেরামতের কাজ করা হয়।
নির্বাহী প্রকোশলী দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পানির লাইন মেরামতের জন্য আরো জনবল প্রয়োজন। যেখানে প্রতিটি ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে একজন করে প্লাম্বার প্রয়োজন সেখানে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২জন লোক কাজ করে।

সময়মত পানি সরবরাহ প্রক্রিয়া এবং ভবনগুলোর শিক্ষার্থীদের বাথরুমে পানির ট্যাপ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, যখন ট্যাপ নষ্ট হয়ে যায় তখন নতুন ট্যাপ লাগিয়ে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়।

সঠিক সময়ে পানির লাইন মেরামতের ব্যাপারে বলেন, এটা প্রক্রিয়ার বিষয়। কোনো ভবনের পানির লাইন নষ্ট হলে অথবা ট্যাপ নষ্ট হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে লিখিত আকারে অভিযোগ প্রথমে রেজিস্টারের নিকট যায়। এরপর উপাচার্যের অনুমোদনক্রমে পরে নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরে যায়। এর মাঝখানে অর্থদপ্তরে চিঠি পাওয়ার পর তারা প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে স্টোরে রাখে। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তর থেকে প্লাম্বার নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে দেয়। এতে অভিযোগ আসার সাথে সাথে কাজটি দ্রুত হয় না, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারনে বেশ বিলম্ব হয়।

সরাসরি এই দপ্তরের দায়িত্বে থাকলে প্রয়োজনীয় মালামাল নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হতো। ফাইল প্রসেসিং বিলম্বিত হওয়ার কারনে কাজ সঠিক সময়ে করা সম্ভব হয় না বলে জানান দপ্তরটির এক উপ-সহকারি নির্বাহী প্রকৌশলী।

একজন প্লাম্বার (পানির লাইন মেরামতকারি) অভিযোগ করে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সময়মত মালামাল না পাওয়ায় তা সঠিক সময়ে লাগানো অথবা মোরমত করা সম্ভব হয় না। এমনকি প্লাম্বারকে নিজে গিয়ে পানি ছাড়তে হয়।

স্বল্প জনবলের কারনে সময়মত কাজ করা সম্ভব হয় না। তিনি জানান, আমাদের সাথে আজহার নামে একজন সহকারী প্লাম্বার থাকলেও আড়াই বছরের বেশি সময় বেতন না পাওয়ায় নিয়মিত আসে না।

যথেষ্ট পরিমানে পরিচ্ছন্ন কর্মী (ক্লীনার)এবং প্লাম্বার নিয়োগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার মোরশেদ উল আলম রনির (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল কল রিসিভ করেন নি। এমনকি সশরীরে দেখা করতে চাইলেও গত ২ দিনে ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করেও তার সাক্ষাৎ মিলে নি।
তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘উপাচার্য নিজেই ক্লীনার এবং প্লাম্বার নিয়োগ দেন।’

নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকৌশলী বলেন, কোনো বিভাগের লিখিত আকারে অভিযোগ বা চাহিদাপত্র পেলে আমরা রেজিস্টারের মাধ্যমে উপাচার্যকে জানাই। এরপর উপাচার্য সেটি অনুমোদন দিলে রেজিস্টার দপ্তরে যাওয়ার পর অর্থ দপ্তরে যায়। সেখান থেকে আবার প্রয়োজনীয় চাহিদার জন্য অর্থ বরাদ্দ হলে উপাচার্য সেটিতে স্বাক্ষর দিয়ে অনুমোদন দেন। এরপর অর্থ দপ্তরের মাধ্যমে মালামাল ক্রয়ের পর স্টোরে জমা রাখা হয়। মোটের উপর চাহিদাপত্র থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় মালামাল নির্দিষ্ট বিভাগে বা জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত উপাচার্যের নিকট প্রক্রিয়াটি ৩ বার যাওয়া আসা করে।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারনে নির্দিষ্ট স্থানে মালামাল পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ে বলে জানান এক কর্মকর্তা।

নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন শাখার বেহাল দশা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় ক্লীনার ও প্লাম্বার নিয়োগের বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার উপাচার্যকে ফোন দিলে ‘আমি টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দেই না’ এই বলে ফোন কেটে দেন।

উল্লেখ্য যে, শুধু একাডেমিক ভবনগুলোই নয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘন জঙ্গলে ভরা। আর এসব জঙ্গলের ফাঁকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে যৌন সম্পর্ক সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ঘটছেও বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। প্রশাসনের এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ মিলছে না বলে জানা গেছে।






মন্তব্য চালু নেই