মেইন ম্যেনু

অভিভাবকদের স্বপ্ন ও ‘টাকার মেশিন’

সাফাত জামিল শুভ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : এদেশের বাবা-মায়েরা চান তাদের ছেলে-মেয়েরা ভবিষ্যতে আয়-উন্নতিতে সবার শীর্ষে উঠুক, নাম ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে সকলে বলবে- এটাইতো বাবা-মায়েদের চাওয়া..। তাই শংকা থেকে যায়, আধুনিকতার এই যুগে বাবা মায়েরা বোধহয় জানেনই না তাদের সন্তানেরা আদৌ ‘মানুষ’ বা ‘পড়ালেখা জানা কোন প্রাণী’ হয়ে উঠছে কিনা। তারা বোধহয় ভাবেনই না, সমাজে অতি মেধাবী এবং ভাল রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীর অভাব নেই কিন্তু ভাল রেজাল্টের পাশাপাশি চরিত্রবান লোকের অনেক অভাব আছে।

আমরা জানি, প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য সকলকে জ্ঞানী করা নয়। প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান ও দক্ষতার সাথে পরিচিতি তৈরী করার উপায়। এরপর কে দক্ষ হবে, কে জ্ঞানী হবে, তা ‘মানুষ’ নিজেই নির্ধারন করবে। একটা মানুষ যখন মানসিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তার মধ্যে রাজনীতি, সমাজ, পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন সমস্যা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হতে শুরু করে। মোটামুটি ১৮ থেকে ২৫ বছর— এই বয়সটাই নির্ধারণ করে দেয় যে, একটা মানুষ ভবিষ্যতে তার চারপাশ সম্পর্কে কতোটুকু সচেতন হবে বা পৃথিবীর জন্য কতোটুকু অবদান রাখবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এ বয়সে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর আশা-আকাংঙ্ক্ষা বিসিএস, সরকারী চাকুরী অথবা প্রাইভেট কোন ব্যাংকে চাকুরীকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে।এর পেছনে থাকে বাবা-মায়ের দেখা ‘স্বপ্ন’ পূরণের তাগিদ। আর বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায় শিক্ষার তথাকথিত উদ্দেশ্য আর ‘মানুষ’ হয়ে উঠার প্রয়াস।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা লক্ষ্যহীন তরীর মতো বিভ্রান্ত। ফলে এই বিভ্রাটগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের জনগণের জাতীয় ভাবমানসের ঐক্য প্রতিষ্ঠা, দেশের সমস্যা-নীতি ও অগ্রগ্রতি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। বৃটিশ প্রবর্তিত কেরানী তৈরীর শিক্ষা অথবা ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’ এই সংকীর্ণ স্বার্থবাদিতা তাই আজ শিক্ষার মূল উপজীব্য।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা দেশে বিরাজমান ধনী গরীব বৈষম্য, গ্রাম শহরের বৈপরীত্য, নারী পুরুষের সমতা বিধানসহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে জাতিগঠনের অভিন্ন চেতনার সাথে যুক্ত করতে পারেনি। পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠা থেকে অধীত বিদ্যা শিক্ষার্থীর তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বৃদ্ধি করছে; কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে পারছে না অর্থাৎ প্রায়োগিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার্থীদের সাফল্য আসছে না। ‘শিক্ষার জন্য এসো সেবার জন্য যাও’ এ স্থলে শিক্ষা মুনাফা লাভের অথবা কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কথায় আছে, ব্যবহার বংশের পরিচয়। আজকের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের ব্যবহার দিয়ে বংশ পরিচয় মেলানো দায়। অনেক অভিজাত এবং উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের ছেলে-মেয়েদেরকে বড়দের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে দেখা যায়। তাদের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। লজ্জা পাচ্ছে না তাদের সামনে দৃষ্টি-কটু কাজ করতে। এই ঘৃণ্য পরিস্থিতিতে বড়দের মনে হয়ত একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, যে-কোন যোগে এলাম বা কোন প্রজন্মে এলাম? অবাক হবেন যদি বলি এই অবস্থার জন্য এই অভিভাবক সম্প্রদায়ই দায়ী। কিভাবে?

এটা বোঝার জন্য একটু পিছনে তাকাতে হবে। বেশিদিন আগের কথা না, সন্তান-সন্তুতি মা-বাবার একটি নির্ধারিত বিধিবিধানে থেকে বড় হতো। সেই সময়ে সন্তান-সন্তুতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাবা-মার নজরদারিতে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল। বাবা-মার আদেশ, নিষেধ, উপদেশই ছিল পরমধার্য। সেই সময়ে পরিবারের শিশু-কিশোরদের বিছানা ছাড়তে হতো খুব ভোরে। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে বা না-খেয়ে মক্তবে যেতো আরবি পড়তে। অন্যধর্মালম্বীরা পূজো দিতো কিংবা স্বীয় ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করতো। সেখান থেকে এসে প্রাত:রাশ সেরে স্কুলের উদ্দেশ্য রওনা দিতো। স্কুল থেকে এসে একটু খেলাধূলা করতো মাঠে যেয়ে বা বাড়ির আঙিনায়। সন্ধ্যে হলে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতো। তারপর স্কুলের বাড়ির কাজ সেরে একটু টিভি দেখে (যাদের টিভি ছিল) ৯টা-১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তো। সকাল হলে আবার শুরু। এটাই ছিল অভিভাবকের বিধানচক্র। এই বিধিবিধানে লালিত-পালিত হয়ে তৎপ্রজন্ম পেয়েছে নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং পেয়েছে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সচ্চরিত্রবান করে গড়ে তোলার শিক্ষা।

বর্তমান প্রজন্মের যারা অভিভাবক তারাও এই বিধান চক্রে থেকে বড় হয়েছে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ তারা এই সমস্ত বিধিবিধান বা নৈতিক শিক্ষা তাদের সন্তানদের জন্য নিশ্চিত করতে পারছেন না বলেই তরুণ প্রজন্ম বা নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে। আগে টিভি থাকলেও ছিলনা কোন স্যাটলাইট চ্যানেল, মোবাইল, ইন্টারনেট এবং এত্তসব সহজ প্রক্রিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তাই এসবের অপব্যবহারের বলয়ে পড়ে তরুণ প্রজন্মের নষ্ট হওয়ার ভয়ও ছিলনা। তবুও অভিভাবক মহল যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কিন্তু এখন এ সমস্ত মাধ্যম এবং ইন্টারনেটের বদলৌতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এসবের অপব্যবহার। এসবের মাত্রাতিরিক্ত অপব্যবহার বর্তমান প্রজন্মকে মহামারীরূপে ধ্বংস করছে।

উল্টো রথ যাত্রার কথা শুনেছি, কিন্তু উল্টো রথের সাথে রথ যাত্রীরাও যদি উল্টো দিক থেকে হাটা শুরু করতো তখন অবস্থা যাই হতো এখন সমাজে তাই হচ্ছে। আজকের অভিভাবক সম্প্রদায় সব দেখে সহ্য করছেন, বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করছেন না। করবেনইবা কেন তারাও তো কম যান না। শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে একসাথে বসে স্টার জলসা, জি বাংলা দেখা বাবা-মায়েরা আধুনিক হলে, ছেলে মেয়েতো অত্যাধুনিক হবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের চাওয়া অনুযায়ী তথাকথিত “এ প্লাস”- কিন্তু ঠিকই বাড়ছে, কিন্তু ‘মানুষ’ হচ্ছে কয়জন?

স্কুলের বাচ্চাদের ওজনের অতিরিক্ত ব্যাগ না দেয়ার জন্য কিছুদিন আগে নাকি হাইকোর্ট রুল জারি করেছে, এ যেন ‘অসুস্থ অভিভাবকত্ব রুগ্ন প্রজন্ম’। আশাকরি অচিরেই অভিভাবক সম্প্রদায়ের বোধোদয় হবে। নিজেরা যে রূপ সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ অভিভাবকত্বে গড়ে উঠেছেন সে অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে সুস্থ ও সুষ্ঠু অভিভাবকত্বে জাতিকে উপহার দেবেন একটি মেধাবী ও সুষ্ঠু প্রজন্ম, কোন টাকার মেশিন নয়।






মন্তব্য চালু নেই