মেইন ম্যেনু

অমর্ত্য সেন ও বাংলাদেশ

অমর্ত্য সেন এই সময়ের সেরা চিন্তাবিদদের একজন। দুর্ভিক্ষের কারণ ও বিশ্বে খাদ্যাভাব নিয়ে তার গবেষণা খাদ্য সুরক্ষায় বাস্তব সমাধানের পথ দেখিয়েছে। তার যে কোনো বই পৃথিবীর নানা প্রান্তে মনীষীমন্ডলীতে আলোড়ন জাগায়। শুধু পান্ডিত্যের জন্যে নয়, যদিও তার পান্ডিত্যের গভীরতা ও বিস্তার বিস্ময়কর কেবল তার ঝলকেই অভিভূত হতে হয় বারবার, সঙ্গে যোগ হয় তার চিন্তার সৃষ্টিশীলতাও।

অর্থনীতিবিদ হিসেবে তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ছাড়াও তিনি একই সঙ্গে দর্শন ও অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক। বিলেতে কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ও লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসেও তিনি পড়িয়েছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন শাখাতে তার বিচরণ স্বচ্ছন্দ। বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশ থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক সর্বোচ্চ মানের পুরস্কার ও পদবী অর্জনকারী এই জ্ঞানতাপস ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।

আঠার বছর বয়সে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ডাক্তার চিকিৎসা দিয়ে বলেছিলেন খুব বেশি হলে ৫ বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ১৫%। কিন্তু এরপর জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে গেছে তার। অক্লান্ত পরিশ্রমী, দুনিয়া জোড়া খ্যাতি অর্জনকারী এই ব্যক্তিটির ৮২ তম জন্মদিন আজ। অমর্ত্য সেন এর জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর।

রবীন্দ্রনাথ নিজে তার নাম রেখেছিলেন। মায়ের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, এই ছেলে একদিন দুনিয়া জোড়া নাম করবে। রবীন্দ্রনাথ মাকে বলেছিলেন, ছেলের নামের শেষের `য` ফলা চিহ্নটি যেন বাদ দেয়া না হয়। অমর্ত্য শব্দের অর্থ `অমর` বা `মৃত্যুঞ্জয়`। রবীন্দ্রনাথ কি তাহলে জানতেন এই ছেলেটি শতবর্ষী হবে? ৮২ বছরে পা দিয়েছেন অমর্ত্য সেন। এখনও তার কর্মস্পৃহা দৃঢ়, তিনি এখনও যে অক্লান্ত গতিতে কাজ করে যাচ্ছেন এই বরেণ্য অর্থনীতিবিদ।

অমর্ত্য সেন এর পৈত্রিক বাড়ি মানিকগঞ্জ। তিনি সেখানেই জন্মেছেন। অমর্ত্য সেন এর বাবা অধ্যাপক আশুতোষ সেন ও মা অমিতা সেন উভয়েরই জন্ম মানিকগঞ্জে। বাবা অধ্যাপক আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন। অমর্ত্য সেন এর শৈশব কেটেছে ঢাকায়। বর্তমান পুরনো ঢাকার ওয়ারীর লারমিনি ষ্ট্রিটের ১৪ নং বাসায় তিনি থেকেছেন। বর্তমানে তিনি ভারতের নাগরিক এবং বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিক।

অমর্ত্য সেনের লিখিত বই বিগত চল্লিশ বছর ধরে প্রায় তিরিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি ইকোনমিস্ট ফর পিস এন্ড সিকিউরিটির একজন ট্রাষ্টি। ২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে অনূর্ধ ষাঁট বছর বয়সী ভারতীয় বীর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১০ সালে তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যাক্তির তালিকায় স্থান দেওয়া হয়। নিউ স্টেটসম্যান ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ৫০ গুরুত্বপূর্ন প্রভাবশালী ব্যাক্তির তালিকায় স্থান দেয়।

অমর্ত্য সেন তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন ১৯৪১ সালে সেইন্ট গ্রেগরি উচ্চ বিদ্যালয় এ। দেশ ভাগের পরে তারা ভারতে চলে গেলে অমর্ত্য সেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঐ বছরই তিনি ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পড়তে যান। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। বি.এ শেষ করার পর পি.এইচ.ডি গবেষনার জন্য অমর্ত্য সেনকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি বিষয়ের চয়ন করতে হয়। তিনি জন রবিনসনের অধীনে অর্থনীতির বিকল্প কৌশলের উপর তার গবেষণাপত্র দাখিল করেন। অমর্ত্য সেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর অর্থনীতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।

এ বছরের শুরুতেই বাংলাদেশে এসেছিলেন অমর্ত্য সেন। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে হোটেলে যাবার পথে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে তিনি বললেন, ‘শান্তি নিকেতন ও ঢাকার ধুলা মাখানো বাতাস আমার জন্য ক্ষতিকারক নয়।` কথাটি সামান্য মনে হতে পারে কিন্তু অসামান্য এই কথাটি থেকেই আমরা এদেশের মাটি ও বাতাসের সাথে অমর্ত্য সেন এর হৃদয়ের গভীর সংযুক্তির পরিচয় পাই। তিনি এই মাটিরই সন্তান।

অমর্ত্য সেন একজন অক্লান্ত মানুষ। তিনি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ভারত থেকে আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে এগিয়েছি। সামাজিক অগগ্রতিতে বাংলাদেশের সাফল্য বা অর্জন থেকে ভারতের শিক্ষা নেবার আছে বলে মনে করেন অমর্ত্য সেন এবং তিনি সেটা প্রকাশ্যেই বলেন। তিনি মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি গত তিন দশকে পৃথিবীর বৃহৎ দেশগুলির মধ্যে `দ্বিতীয় দ্রুততম`। ভারত একটি বড় দেশ। সেখানে সকল প্রদেশে উন্নয়ন কিন্তু সমান হারে হয়নি।

ভারত শক্তিশালী দেশ। সেদেশের অর্থনীতি বহুদূর এগিয়েছে বটে। কিন্তু অমর্ত্য সেন মনে করেন সেই অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও যদি দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে তার প্রভাব না পড়ে তাহলে সেই অগ্রগতি নিয়ে তার অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সেই কারণেই তিনি জনগণের আয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন, দুর্নীতি, শিক্ষার গুরুত্ব, স্বাস্থ্য সম্পদ, সংবাদপত্র, জনগণের দায়বদ্ধতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন। এমনকি তার সর্বশেষ গ্রন্থ `ভারত : উন্নয়ন ও বঞ্চনা` -তেও এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। সেখানে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বারবার বাংলাদেশের উন্নয়ন সাফল্যকে তুলে ধরেছেন।

ঢাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে একক বক্তৃতায় অমর্ত্য সেন বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গবৈষম্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। এটি বাংলাদেশের বড় কৃতিত্ব। গত তিন-চার দশকে এসব মানবিক উন্নয়নে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিশাল পার্থক্য হয়েছে। তবে ভারতে এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রগতি হয়েছে বলে মত দেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের মাথাপিছু আয় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। এখন তা বেড়ে ১০০ শতাংশ হয়েছে। এটা ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতি। তবে ১৯৯০ সালে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু তিন বছর কম ছিল। এখন ভারতের চেয়ে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু তিন বছর বেশি। নব্বইয়ের দশকে শিশুমৃত্যুর হার বাংলাদেশে বেশি ছিল। এখন ভারতের চেয়ে কম। আবার সেই সময়ে কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়ার হার দুই দেশের মধ্যে প্রায় সমান ছিল। এখন বাংলাদেশে বেশি। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারতের অনেক কিছু শেখার রয়েছে।’রাইজিংবিডি






মন্তব্য চালু নেই