মেইন ম্যেনু

অস্কার মঞ্চে প্রিয়াঙ্কা: হলিউড দখলে বলিউডের যাত্রা

মঞ্চে লাল গালিচা মাড়ানো বলিউড সুপারস্টার প্রিয়াঙ্কা চোপরার জন্য নতুন কিছু নয়। বলতে গেলে এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতায় ভরপুর তার জীবন। তবে এবারের অভিজ্ঞতাটা তার জন্য একটু ব্যতিক্রম। কারণ মঞ্চটা যে অস্কারের মঞ্চ। অসংখ্য আলোর ঝলকানি আর হাজারো ক্যামেরার সামনে হলিউডের ডলবি থিয়েটারে বিশ্বের শীর্ষ সব সুপারস্টারদের হাতে অস্কারের স্বর্ণমূর্তি তুলে দিয়েছেন এই বলিউড তারকা।

এমন একটি জমকালো মঞ্চে ভারতীয় একজন তারকার উপস্থিতির বিষয়টি সারা পৃথিবীজুড়েই বেশ আলোচিত হয়েছে। তবে অনেকে আবার মনে করেন, অস্কার মঞ্চে বলিউড তারকাদের উপস্থিতি আরো আগেই কাঙ্ক্ষিত ছিল। অস্কারে বৈচিত্র্যের বিষয়টিও আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। পুরস্কারটির মনোনয়নে বৈচিত্র্য নেই- এমন অভিযোগে অনুষ্ঠানটি বর্জনও করেছেন চলচ্চিত্র পরিচালক স্পাইক লি এবং অভিনেত্রী জাদা পিঙ্কেট স্মিথ। তাদের অভিযোগ ছিল অস্কারে শুধু শ্বেতাঙ্গদেরই আধিপত্য দেখা যায়।

এ পর্যন্ত ভারতের কোনো অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রীকে অস্কার প্রদান করা হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র এবং হলিউডের চলচ্চিত্রে তাদের উপস্থিতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। হলিউডে ভারতীয়রা এখন আর উপেক্ষিত হওয়ার মতো নয়।

সে যাই হোক, অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে দেয়ার সৌভাগ্য খুব অল্পজনেরই হয়। আর এর জন্য বিশেষ সম্মানের চোখেও দেখা হয় প্রদানকারীকে। এবার সেই সম্মানটি অর্জন করে নিল ৩৩ বছরের প্রিয়াঙ্কা। এর আগে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নাটক ‘কোয়ান্টিকো’তে অভিনয় করে প্রথম কোনো ভারতীয় হিসেবে দেশটির ‘পিপলস চয়েস এওয়ার্ড’ পুরস্কার জিতেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। অনুষ্ঠানটিতে অভিনয়ের জন্য তাকে ৪০ লাখ ডলার প্রদান করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এছাড়া সামনে হলিউডের খ্যাতনামা তারকা ডোয়াইন জনসনের সাথে বহুল প্রত্যাশিত ‘বেওয়াচ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছেন প্রিয়াঙ্কা।

গত এক দশকে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে। মেধাবীদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে। বিভিন্ন দেশের অভিনেতা অভিনেত্রীদের সুযোগ তৈরি হয়েছে হলিউডে কাজ করার। ভারতীয় তারকাদের অবস্থানটাও সেখানে দৃঢ়। তবে সমস্যা হচ্ছে পারিশ্রমিক নিয়ে। ‘কোয়ান্টিকো’তে অভিনয়ের জন্য প্রিয়াঙ্কাকে যখন ৪০ লাখ ডলার দেয়া হয়েছিল তখন এই পারিশ্রমিক অনেক কম বলে গণমাধ্যমগুলোতে সমালোচনা হয়েছে।

ভারতীয় তারকাদের পারিশ্রমিক কম দেয়া আসলে হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এক ধরনের ব্যবসায়িক কৌশল। ভারতের একটি চলচ্চিত্র বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সুহেল শেঠ বলেন, ‘অর্থ সব সময়ই একটি ব্যাপার।’ তিনি আরো বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই ভারতীয় অভিনেতা অভিনেত্রীদের আর্থিক মর্যাদা বাড়ছে। তাই আমি হলিউডের প্রযোজক এবং বিদেশি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বর্তমান বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার আহবান জানাই।’ অধিক দর্শক আকর্ষণ করা এবং তুলনামূলকভাবে কম পারিশ্রমিকে পাওয়া যায় বলে ভারতের জনপ্রিয় তারকাদের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখে থাকে মার্কিন চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো।

ইংরেজি ভাষাভাষিদের কাছে ভারতীয় তারকা এবং চলচ্চিত্রের চাহিদাও ব্যাপক। বছরে প্রায় হাজারটি নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ভারতের নিজস্ব নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশটির চলচ্চিত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কেপিএমজি’র তথ্য মতে, ২০১৯ সালের মধ্যে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থেকে ভারতের আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৮.৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের প্রায় একশ কোটি মানুষ নিয়মিত সিনেমা দেখে। আগামীতে ভারতে আরো বহুমুখী চলচ্চিত্র তৈরি হবে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ভারতের মুম্বাইভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ‘সিএএ কেডব্লিওএএন’র প্রতিষ্ঠাতা অনির্বাণ দাস ব্লাহ বলেন, ‘ভারতের চলচ্চিত্র শিল্প আগামী এক দশকেরও কম সময়ে বর্তমানের চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুন বড় হবে।’ এতে ভারতীয় দর্শকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার চেয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। সুহেল শেঠ বলেন, ‘চলচ্চিত্রে দক্ষতা এবং নৈপুণ্য- উভয়ক্ষেত্রেই আরো বৈচিত্র্য আনা হবে। মার্কিনিদের জন্যও রুচিসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হবে।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে আছে বর্ণ এবং লিঙ্গবৈষম্য। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তোপের মুখে পড়ে হলিউড। ‘হলিউড শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খানের কথা। বলিউডে এ পর্যন্ত শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। মার্কিন চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন এক দশক ধরে। ২০০৯ সালে অস্কারজয়ী যুক্তরাজ্যের ’স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ চলচ্চিত্রে পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করে যুক্তরাষ্ট্রে খ্যাতি লাভ করেন তিনি। পরে বক্স অফিস হিট করা আরো কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ইরফান। মূলত ইরফান এবং প্রিয়াঙ্কার পথ ধরেই হলিউড যাত্রা শুরু করেন দিপিকা পাডুকোনের মতো তারকারা। সম্প্রতি মার্কিন অভিনেতা ভিন ডিজেল’র বিপরীতে এক্স সিরিজের সিনেমা ‘ট্রিপল এক্স: দ্য রিটার্ন অফ জেন্ডার কেজ’ চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন দিপিকা।

এছাড়া এখন মার্কিন টেলিভিশনে আরো কিছু ভারতীয় মুখ প্রায়ই চোখে পড়ে। এর মধ্যে নিমরাত কর, সুরজ শর্মা, কোনাল নায়ার এবং অনিল কাপুরের মতো মুখগুলোও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন তারা। অনেক বছর ধরেই চলচ্চিত্রের জন্য ভারতীয় অভিনেতা অভিনেত্রীদের ভাড়ায় কাজ করায় হলিউড। যুক্তরাষ্ট্রের এই ইন্ডাস্ট্রিটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন বাজার সন্ধানে নেমেছেন দেশটির নির্মাতারা।

ভারতীয়দের আগে হলিউডে এ অবস্থানটি ছিল চীনাদের। চীনের অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাণের স্থান এমনকি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনাদের ব্যবহার করতো হলিউড। ২০০৮ সালে স্লামডগ মিলিয়নিয়ার নির্মাণের পর তা বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জনের পর ভারতের দিকে ঝুঁকেছে হলিউডের কলাকৌশলীরা। চলচ্চিত্র নির্মাণে এখন ভারতীয়দেরই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা। বলিউডের তারকারা অভিনয় করায় চলচ্চিত্রগুলো ভারতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে থাকে। এতে নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে হলিউডের। এছাড়া চলচ্চিত্র যখন প্রদর্শন করা হয় তখন লাখো ভারতীয় জড়ো হয় প্রেক্ষাগৃহগুলোতে।

তবে এখন পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়ে একটি সমস্যা রয়েই গেছে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে ইরফান খানের আয় ২০ লাখ মার্কিন ডলারেরও কম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভারতে আমাকে যে পারিশ্রমিক দেয়া হতো এটা তার চার ভাগের একভাগ।’ এতসব সত্ত্বেও হলিউডে দিন দিন নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেই চলেছেন বলিউড তারকারা। আগামীতে হয়তো হলিউড নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে বলিউড।

বিবিসি অবলম্বনে






মন্তব্য চালু নেই