মেইন ম্যেনু

আইটেম গান : ঢাকাই সিনেমায় আবারও ফিরে আসছে অশ্লীলতা

প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ছবি রিলিজ হচ্ছে। দর্শক টানতে সেসব ছবিতে অতিরিক্ত বিনোদন হিসেবে জুড়ে দেয়া হচ্ছে আইটেম গান। এসব গান মোটেও রুচিশীল নয় বলেও অনেকের মন্তব্য। ভিনদেশী সংস্কৃতি থেকে ধার করে আনা আইটেম গান সুস্থ ছবিগুলোতেও পরিবেশ নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ঢাকার চলচ্চিত্রে আবারও ফিরে আসছে অশ্লীলতা-এমনটিও বলছেন কেউ কেউ। বিস্তারিত লিখেছেন অনিন্দ্য মামুন-

সিনেমায় আইটেম গান। এটা নতুন কোনো সংস্কৃতি নয়। আগেও ছিল। কিন্তু এই আইটেম গানের উপস্থাপনার বিষয়টি নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। হাল আমলে প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতেই আইটেম গান থাকছে। এর কতটা আবার একেবারেই কুরুচিপূর্ণ। এসব গানে প্রতিষ্ঠিত কিছু নায়িকার পাশাপাশি কয়েকজন নতুন শিল্পীও কাজ করেন। যারা আইটেমকন্যা হিসেবে ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিত। আগে স্বল্প পরিসরে সিনেমায় আইটেম গানের প্রচলন থাকলেও বলিউডের অনুকরণে ২০১২ সালে ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবির মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পুরোদমে আইটেম গানের চল শুরু হয়। এ ছবিতে ‘প্রেম রসিয়া’ নামে একটি আইটেম গানে পারফর্ম করেছেন বিপাশা কবির। গানের মাধ্যমে বেশ আবেদন ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন মেয়েটি। বিষয়টিকে বিনোদন নয় নেহায়েত পরিচালক এবং প্রযোজকের মনোস্কামনা পূর্ণ করার বিষয় হিসেবেই দেখেছেন অনেকেই। তাই পরবর্তী সময়ে বিপাশার বাঁকা ঠোঁটের চর্বিত চর্বণে আইটেম গানের অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হয়েছে। যদিও এর আগে থেকে ঢাকাই ছবিতে অশ্লীল গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাসরিন। তবে সেগুলো আইটেম গান নয় অশ্লীল গান হিসেবেই পরিচিত ছিল সবার কাছে। মুনমুন ছাড়াও ময়ূরী, শায়লাসহ আরও কয়েকজন নায়িকা নামধারী অশ্লীল শিল্পীর বিচরণ ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে। সেদিন গত হয়েছে।

বর্তমান ঢাকাই ছবির আরেক আইটেমকন্যার নাম নায়লা নাইম। তাকে নিয়ে কাজ করতে হলে নির্মাতাদের বেশ বেগ পোহাতে হয়। তাকে কেউ কেউ বাংলা সানি লিওন বলেও আখ্যায়িত করেন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, পর্নো তারকা সানি লিওনের তকমা যার নামের সঙ্গে জুড়ে আছে তাতে কতটা রুচিশীলতার পরিচয় দিতে পারেন তিনি! তবুও নায়লাকে নিয়ে আইটেম গানে কাজ করার চেষ্টা করেন নির্মাতারা। পারফরম্যান্স নয়, নিজেরে শরীরী আবেদন দিয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন ডেন্টিস্ট এ মেয়েটি। গানে তার অঙ্গভঙ্গি নীল ছবির নায়িকাদের হার মানায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে। দর্শকদের নেশা জাগাতে সব ধরনের অশ্লীল দৃশ্য দেখা তো কোনো আপত্তি নেই তার।

নায়লা নাঈমের মতো স্বঘোষিত বাংলার সানি লিওন নামে আরও এক আইটেমকন্যার নাম রয়েছে নির্মাতাদের ঝুলিতে। তিনি জ্যাকলিন মিথিলা। ফেসবুকে তিনি নিজেকে বাংলার সানি লিওন বলেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। আদর্শ হিসেবে সানি লিওনকেই সামনে রাখেন বলে স্বগর্বে বলে বেড়ান। এ মেয়েটি নায়লার চেয়ে আরও এককাঠি সরস। পুরো নগ্ন হয়ে শুটিং করতে তার আপত্তি নেই।

গণমাধ্যমে তার খোলামেলা পোশাকে উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। কোনো কোনো নির্মাতা তাকে নিয়ে কাজ করার স্বপ্নও দেখেন। আবার কেউ কেউ স্বপ্ন পূরণ করেও ফেলেছেন। কিন্তু সত্যিকার আইটেমকন্যা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি মিথিলার। আইটেম কন্যাদের সারিতে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন কবির তিথি নামের এক মডেল-অভিনেত্রী। তিনি মূলত নাটকে অভিনয় করেন। আরও আছেন স্ট্যানিং মিতু নামের দোহারা গড়নের মেয়েটিও।

এর বাইরে চিত্রনায়িকা পরিমনি, মাহি, ববি ও মৌসুমী হামিদ সবাইকেই আইটেম গানে কোমর দোলাতে দেখা গেছে। এ ছাড়াও ইদানীং আবার অশ্লীল ছবির নায়িকা খেতাব পাওয়া মুনমুনও নামছেন আইটেম গানে। তবে আইটেম গান কিংবা অশ্লীল হয়ে দর্শক টানা যে সহজ ব্যাপার নয়, বিষয়টি নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝে গেছেন তারা। বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইটেম গান যখন ছবির জন্য আর্ট হিসেবে দাঁড়িয়েছে ঠিক সে সময় ঢাকাই ছবিতে আইটেম গানের নামে চলছে অশ্লীলতার মহড়া।

এ প্রসঙ্গে একসময়ের জনপ্রিয় নায়ক সোহেল রানা বলেন, ‘দর্শক সিনেমা দেখেন বিনোদন নেয়ার জন্য। সিনেমাতে গল্পটাই আসল বিষয়। সাধারণত যারা গল্পের দুর্বলতার জন্য দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পান না তারাই সিনেমায় বিকল্প পন্থার অনুপ্রবেশ ঘটান। বর্তমানে আইটেম সং তেমনই একটা বিষয়। মূলত ঝাঁকালো নাচগান দিয়ে সিনেমাকে দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার একটি নেতিবাচক কৌশল, যা কোনো মেধাবী নির্মাতার কাছেই কাম্য নয়।’

এ প্রসঙ্গে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘আসলে আইটেম সং সময়ের একটি চাহিদা মাত্র। সবসময় দর্শকদের এমন কিছু চাহিদা থাকে। তবে সেটা যেন অতিরিক্ত না হয়। আইটেম গানের নামে যেন চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবনূর বলেন, ‘আমাদের সময় এ ধরনের গানকে অশ্লীল গান হিসেবেই চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু এখন শুনছি এগুলো নাকি আইটেম সং। ছবির গল্প ভালো থাকলে কখনই এ ধরনের গানের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতারা ছবির গল্পের দিকে মনোযোগ না দিয়ে এ ধরনের খোলামেলা গানের দিকেই বেশি বাজেট ও মনোযোগ দিয়ে থাকেন’ বলিউড সিনেমার অনুকরণে আইটেম গানের নামে অশ্লীলতা চললেও বাংলাদেশের ছবিতে আইটেম গান জনপ্রিয় হতে পারছে না। কেন পারছে না এটাও একটা প্রশ্ন। এর কারণ অনেক।

প্রথমত, এ সময়ে যেসব আইটেম গান হচ্ছে সেগুলোর প্রায় প্রতিটির সেট, শিল্পীর কস্টিউম, গানের কথা, কম্পোজিশন-সবই এক। ইংরেজি-হিন্দি-বাংলা শব্দের মিশেলে এমন এক কথার গান তৈরি হচ্ছে, যা গানের মাধুর্যতা নষ্ট করে প্রবল বাণিজ্যের সস্তা উপকরণে পরিণত হয়েছে। মুন্নী, শিলা, চামেলি, দেহ, রূপ, রস, দিল- এ রকম উত্তেজক হিন্দি-বাংলা শব্দ দিয়ে গাঁথা হচ্ছে গানের কথা। যার কারণে ঢাকাই ছবিতে আইটেম গান এখন রুচিহীনতার মহোৎসব ছাড়া কিছুই নয়।

এ মুহূর্তে ঢাকাই ছবির আইটেম গানের কথা হচ্ছে এ রকম- ‘ওরে পাকনা চেয়ে দেখনা আমি আইসক্রিম, চাইলে পাবি আইলে খাবি দেখবি নাইস ড্রিম, আইসক্রিম খাবো আমি মিষ্টি মিষ্টি করে, নাইস ড্রিম দেখবো আমি দুষ্টু দুষ্টু করে’, কিংবা ‘আয় না দু’জনে মিলে ওয়ান টু খেলি, মুন্নী শিলা নই আমি চামেলি’, অথবা ‘আমি দেখতে লালে লাল, রূপে গোল মরিচের ঝাল’ ও ‘ফুর্তি ফুর্তি আজ, ফুর্তি সারা রাত, বাকি সব যা কিছু, যাক গোল্লায় যাক, স্ট্যাটাস আমার সিঙ্গেল দেখে প্রেমের ছাড়াছড়ি’। এসব সস্তা কথার গানের সঙ্গে আইটেমকন্যাদের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি মূলত কয়েক বছর আগের অশ্লীলতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের।

মূলত কাটপিস জুড়তে না পেরে নির্মাতারা আইটেম নামে এসব অশ্লীল গান দিয়েই ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছেন’ বলে সুস্থধারার দর্শকদের অভিযোগ। কিন্তু আইটেম গান কী সত্যিই অশ্লীলতা? মোটেও তা নয়। বরং চলচ্চিত্রে সঠিকরূপে এটিকে ব্যবহার করতে পারলে ভালো হবে বলেই মন্তব্য করেছেন অনেক বোদ্ধা। এ ছাড়া এটিকে সময়ের দাবিও বলেছেন কেউ কেউ। বেশ কয়েকজন নায়িকা আইটেম গানে নিজেদের আলাদা মেধার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন। যেহেতু সময়ের পরিক্রমায় আইটেম গানের ট্রেন্ড চালু হয়েছে, তাই যথোপযুক্ত আইটেম কন্যার অভাবে কিছু নায়িকা এ ট্রেন্ডের হাল ধরে রেখেছেন। অনেকে বলেছেন ছবিতে আইটেম গান দোষের কিছু নয়। হাল আমলের প্রায় ছবির ক্ষেত্রে আইটেম গানের সঙ্গে ছবির গল্পের কোনো মিল থাকে না, এটিকেই দোষের বলে দেখছেন তারা। শুধু দর্শকদের বাড়তি বিনোদন দিতেই এ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

বলিউডের নায়িকা স্নেহা উল্লাল থেকে শুরু করে মার্কিন মুলুকের অধিবাসী সিন্ডি রোলিংয়ের মতো অনেকেই এসেছেন ঢাকাই ছবির আইটেম গানে। কিন্তু খুব একটা জমাতে পারেননি। এর কারণ গানে রুচিশীলতার অভাব। নির্মাতাদের অজ্ঞতা এবং কুরুচিপূর্ণ প্রযোজকের আবির্ভাবই বাংলাদেশে এ আইটেম শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলা যায়নি। বরং আইটেমের নামে ঢাকার চলচ্চিত্রে আবারও অশ্লীলতা জেঁকে বসছে বলেই দর্শকরা অভিযোগ করেছেন।






মন্তব্য চালু নেই