মেইন ম্যেনু

আজব ভাইরাসের থাবায় কাবু শৈশব

•দু’দিন ধরে জ্বর ছিল বছর দুয়েকের তুলিকা বসুর। সেই সঙ্গে হাতে-পায়ে র‌্যাশ। যন্ত্রণায় সারা ক্ষণ অশান্ত হয়ে আছে শিশুটি। ডেঙ্গির আশঙ্কায় বাড়ির লোকেরা তড়িঘড়ি রক্ত পরীক্ষা করালেন। কিন্তু ধরা পড়ল না কিছুই। অথচ কষ্ট কমার কোনও লক্ষণই নেই। গায়ের র‌্যাশ ক্রমশ জলবসন্তের মতো চেহারা নিচ্ছে। খেতে গেলেই গলায় এমন কষ্ট যে, খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ।

•চার বছরের উৎসব রায়ের আবার জ্বর একেবারেই ছিল না। কিন্তু গায়ে ব্যথা ছিল খুব। সেই সঙ্গে হাঁটু, পায়ের পাতা, ঊরু, কনুই, হাতের তালুতে জলবসন্তের মতো গুচ্ছের গুটি। চুলকোচ্ছিল। যন্ত্রণাও হচ্ছিল। গলায় এমন জ্বালা আর ব্যথা যে, জল পর্যন্ত গিলতে পারছিল না সে।

ডেঙ্গির আতঙ্কে কলকাতা-সহ গোটা রাজ্য যখন দিশাহারা, সেই সময়েই নতুনতর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে এই অসুখ। যা আক্রমণ করছে মূলত শিশুদেরই। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার পরে ধরা পড়ছে রোগটা। নাম তার ‘হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ’। ‘কক্স্যাকই ভাইরাস’ এর বাহক। বেছে বেছে শিশুদের ঘাড়েই থাবা বসিয়ে উৎপীড়ন করাই তার স্বভাব।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ তো বটেই, ডাক্তারের চেম্বারও ছেয়ে যাচ্ছে এই রোগীতে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, এ বছর অসুখটা যে-ভাবে থাবা বসিয়েছে, তেমন ব্যাপক সংক্রমণের অভিজ্ঞতা আগে হয়নি তাঁদের। আসলে এই রোগটা এখানে তেমন পুরনোও নয়। ২০০৭ সালে এ রাজ্যে প্রথম এই রোগের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তার আগে বিচ্ছিন্ন ভাবে কেউ কেউ আক্রান্ত হয়ে থাকলেও রোগটার দাপটের বিষয়ে সবিস্তার তথ্য ছিল না। ক্রমে অসুখটা এমনই ছড়াতে শুরু করে যে, তাকে নিয়ে চর্চা বাড়তে থাকে। গত দু’মাসে হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজের প্রকোপ বেড়েছে খুব বেশি মাত্রায়।

এই রোগের বাহক ‘কক্স্যাকই ভাইরাস’-এর সংক্রমণশক্তি অতি প্রবল। খুব সহজেই এক জনের থেকে অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে সে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রোগটা ছড়ায় মূলত জল, মল, লালা, হাঁচিকাশি থেকে। অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমেও এক জনের থেকে অন্যের দেহে এর সংক্রমণ ঘটে। জলবসন্তের মতো যে-গুটি এই অসুখের অন্যতম উপসর্গ, তা ফেটে গিয়েও ঘটতে পারে সংক্রমণ। সেই জন্য কেউ এই রোগে আক্রান্ত হলে ডাক্তারেরা তাকে বাড়িতে খানিকটা আলাদা ভাবে রাখারই পক্ষপাতী। ঠিক যে-ভাবে আলাদা ঘরে রাখা হয় বসন্তের রোগীকে। সাধারণ ভাবে এক বার কেউ ‘হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ’-এ আক্রান্ত হলে পরবর্তী কালে তার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তবে ইদানীং ভাইরাসের নতুন নতুন নানা সাবটাইপ তৈরি হওয়ায় কারও কারও ক্ষেত্রে রোগটা একাধিক বারও হচ্ছে।

কতটা বিপজ্জনক এই রোগ?
‘হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ’-এ এখনও পর্যন্ত এ দেশে মৃত্যুর কোনও ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি বলেই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। কিন্তু তার জন্য রোগটাকে উপেক্ষা করার কোনও উপায় নেই। কারণ, এই রোগের কবলে পড়া শিশুদের কষ্টের সীমাপরিসীমা থাকছে না। তাদের খাওয়াদাওয়া তো লাটে উঠছেই। ব্যথা, র‌্যাশ আর গুটির একটানা উৎপীড়নে অতিষ্ঠ অশান্ত হয়ে উঠছে শিশুরা। তাদের কষ্ট চোখে দেখা যাচ্ছে না, জানাচ্ছেন অভিভাবকেরা।

এই ব্যাধির প্রতিকার কী? প্রতিরোধের উপায়ই বা কী?
‘‘আমার চেম্বারে এখন এই রোগী এত বেশি আসছে যে, ডাক্তার না-হয়েও অনেক কর্মী বহু বাচ্চাকে দেখে বলে দিচ্ছেন, হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজের কেস,’’ বলছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অপূর্ব ঘোষ। তিনি জানাচ্ছেন, সাধারণ ভাবে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল খেতে বলা হয়। আর গলায় ব্যথার দরুন শক্ত ও গরম খাবারের বদলে ঠান্ডা, গলা-গলা খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়ানোটাও জরুরি।

সাধারণ ভাবে বর্ষার পরেই এই রোগের প্রকোপ শুরু হয়। মেয়াদ পাঁচ থেকে সাত দিন। শিশুরোগ চিকিৎসক প্রবাল নিয়োগী জানাচ্ছেন, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগটা এমনি এমনিই ভাল হয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। তাই রোগীকে নজরবন্দি রাখাটা জরুরি।

কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?
‘‘নিউমোনিয়া, মায়োকার্ডাইটিস, এমনকী এনসেফ্যালাইটিসও হতে পারে,’’ বলছেন প্রবালবাবু। তাঁর পরামর্শ, এই রোগ হলে শিশুদের স্কুলে না-পাঠিয়ে বাড়িতেই রাখা ভাল। কারণ, ক্লাসে এক জনের এই রোগ হলে তা থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার নজির ভূরি ভূরি।

চর্মরোগের চিকিৎসক সঞ্জয় ঘোষ জানাচ্ছেন, গায়ে গুটি গুটি দাগ এবং ক্রমশ তা কালো হয়ে যেতে দেখে অনেকে তাঁদের চেম্বারেও আসছেন। এ ক্ষেত্রে জ্বালাভাব কমানোর জন্য ক্যালামাইন লোশন আর খুব যন্ত্রণা হলে সেটা কমানোর ওষুধ দেওয়া ছাড়া তাঁদের বিশেষ কিছু করার থাকে না। তবে তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পরিচ্ছন্ন থাকাটা যে খুব জরুরি, সেটা বারবার উল্লেখ করছেন সকলেই।






মন্তব্য চালু নেই