মেইন ম্যেনু

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস

ম্যানগ্রোভ এক বিশেষ ধরণের উদ্ভিদ যা সাধারণত সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের নোনা পানিতে জন্মায়। এগুলো হচ্ছে শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ। জোয়ারের সময় শ্বাসমূলের সাহায্যে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ শ্বসন কাজ চালায়। উইকিপিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, একশটিরও বেশি গাছ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে জন্মায়। যেমন- সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, কেওড়া এগুলো ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ।

এই ম্যানগ্রোভ গাছগুলোর দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একটি হল, এদের শ্বাসমূল থাকে। এদের মূল থেকে একটা ডালের মতো চিকন অংশ মাটি ভেদ করে উঠে আসে। জোয়ারের সময় যখন মাটির উপরে পানি জমে যায়, তখনো এই শ্বাসমূলগুলো পানির উপরে ভেসে থাকে। এই শ্বাসমূলগুলোর মাথায় এক ধরনের শ্বাসছিদ্র থাকে, যাদের বলে নিউমাটাপো। এর সাহায্যেই ম্যানগ্রোভ গাছেরা শ্বাস নেয়।

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস। ম্যানগ্রোভ বা বাদাবনের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং এর প্রতিবেশ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে এই বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ বন কেটে চিংড়ি চাষ করার প্রতিবাদে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই আয়োজিত সমাবেশে একজন অংশগ্রহণকারীর মৃত্যু হয়। সেই থেকে তার স্মরণে এই দিনটিতে আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পৃথিবীতে ১,৮১,০০০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিস্তৃত ছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, এ বনাঞ্চলের আয়তন ১,৫০,০০০ বর্গ কি.মি. এর নিচে নেমে এসেছে। সমগ্র পৃথিবীর উপকূলীয় আবাসস্থল অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হতে অতিরিক্ত কাঠ ও মাছ আহরণের ফলে এবং উপকূলীয় ভূমিকে বিকল্প ব্যবহার যোগ্য ভূমি হিসেবে ব্যবহারের ফলে এ বনাঞ্চল হুমকির সম্মুখীন। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো অনেক প্রজাতিই এ বনকে তাদের জীবনচক্রের কোনো না কোনো সময় ব্যবহার করে।

সারা পৃথিবী ব্যাপী গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও উপউষ্ণ (Tropical and Sub-tropical) উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ জাতীয় বনাঞ্চল দেখা যায়। পৃথিবীতে ১০২টি দেশে ম্যানগ্রোভের অস্তিত্ব থাকলেও কেবলমাত্র ১০টি দেশে ৫০০০ বর্গ কি.মি. এর বেশি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে। পৃথিবীর সমগ্র ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ৪৩% ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া এবং নাইজার এ অবস্থিত এবং এদের প্রত্যেকটি দেশে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ২৫% হতে ৬০% ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রয়েছে।

বাংলাদেশে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ বন (সুন্দরবন) পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের থেকে বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলেমিটার জায়গাজুড়ে এ বন বিস্তৃত। বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। ৪০০ খাল, নদী-নালা এবং খাঁড়িময় জলজ অঞ্চল নিয়ে গঠিত সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা। এ বনে প্রায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদের দেখা মেলে। এখানকার উল্লেখ্যযোগ্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে- সুন্দরী, গেওয়া, গরান, গোলপাতা, বাইন, কাঁকড়া, হারগোজা, হেতাল প্রভৃতি।

সত্যিকার অর্থে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বলতে যাদের বোঝায় তাদের প্রজাতি সংখ্যা পুরো পৃথিবীতে প্রায় ৫০, যার ৩৫ প্রজাতিই রয়েছে এ সুন্দরবনে। লবণের তারতম্যের ভিত্তিতে বনের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। পৃথিবীর বিখ্যাত বেঙ্গল টাইগারের সবচেয়ে বড় পপুলেশনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল এ সুন্দরবন। বাঘ ছাড়াও এখানে রয়েছে লোনাপানির কুমির, চিতল হরিণ, অসংখ্য শূকর, বানরসহ রঙ-বেরঙের অসংখ্য পাখি। প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩২০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং ৪০০ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল সুন্দরবন।

জীববৈচিত্র্যের এমন প্রাচুর্যতার জন্য সুন্দরবন ১৯৯২ সালের ২১ মে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। আর এজন্য সুন্দরবনের সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় সুন্দরবন দিবস।

একদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই সুন্দরবন। অন্যদিকে বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে খাদ্যে রূপান্তরিত করে নোনাজলের এই উদ্ভিদরাজি বেড়ে ওঠে। প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়ে কমিয়ে দেয় পরিবেশের দূষণ।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কার্বন শোষণের ক্ষমতা হারাচ্ছে। নির্বিচার গাছপালা কেটে ফেলায় দূষণ বেড়েই চলেছে। ফলে জলের নোনাভাব বেড়ে গিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ। ম্যানগ্রোভ, গুল্ম ঘাস, ফাইটোপ্লাঙ্কটন, মোলাস্কাস ক্রমাগত তাদের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অথচ গাছের শরীরে জমিয়ে রাখা কার্বনকে বলা হয় ব্লু কার্বন। কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের ফলে কমে উষ্ণায়নের মাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব থেকেও কার্বন রক্ষা করে গাছ। এখনো পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে মোটামুটি ৬৬২ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড আটকে আছে!

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন নানা রকম প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নুনের বিষে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বাড়ছে তেলদূষণ, শব্দদূষণসহ আরো নানা ধরনের মনুষ্যসৃষ্ট আপদ। সাম্প্রতিক সময়ে নুনের আধিক্য সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক গবেষনায় বলা হয়, মাটি ও পানিতে নুনের বাড়বাড়ন্তে অনেক প্রজাতির গাছ একেবারেই হচ্ছে না অথবা সাংঘাতিকভাবে এর বৃদ্ধি কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে নুনের পরিমাণ বাড়ে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি।

প্রাপ্ত এক তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রায় ১০ কোটি জীববৈচিত্র্য আছে, এর মধ্যে মানুষ প্রায় এক কোটির সন্ধান পেয়েছে। মানুষ কৃষিকাজ ও খাদ্যের জন্য প্রায় ৭ হাজার উদ্ভিদ ও কয়েক হাজার প্রাণীর উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। মানুষের জীবন ধারণের জন্য জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনের কোনো শেষ নেই।

পৃথিবীতে এখনো হাতে গোনা যে কয়টি জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য আছে তার মধ্যে আমাদের সুন্দরবন উল্লেখযোগ্য। তাই এটিকে রক্ষার প্রয়াসে তেমনই উদ্যোগগ্রহণ বাঞ্ছণীয়।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই