মেইন ম্যেনু

আজ বসন্ত কাল ভালোবাসা

আজ বসন্তের প্রথমদিন। প্রকৃতিতে ফাগুনের ছোঁয়া। গাছে গাছে নূতন পাতা। কোকিলের কুহু কুহু ডাক জানিয়ে দেয় বসন্ত এসেছে। এই বসন্ত যেন বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে। তাই চারিদিকে বসন্ত উৎসব। সবকিছু মিলিয়ে অনাবিল আনন্দের দিন আজ। কাল আবার ভালোবাসা দিবস। অনেকের মতে রোমান ক্রিশ্চিয়ান পাদরি সেন্ট ভ্যালেনটাইনের নামানুসারে ঘোষিত ‘সেন্ট ভ্যালেনটাইনস ডে’- আমাদের এখানে পালিত হয় ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে। কারও কারও মতে, আমাদের এই বসন্ত উৎসবই পশ্চিমাদের ভালোবাসা দিবস। আজ এত উচ্ছ্বাস-আনন্দ, এত ভালোবাসা থাকার পরও কাল আবার আরেকটি ভালোবাসার দিন কেন- এ প্রশ্নও উঁকি দেয় অনেকের মনে।

তারপরও ভালোবাসা দিবসকে বরণ করার জন্য অনেকে আজ থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। বসন্ত আবাহনে সবাই হলুদ ফুল খুঁজলেও ভালোবাসা দিবসে অনেকেরই পছন্দ লাল টুকটুকে গোলাপ। অনেকেই ধরে নিয়েছেন এই দিনই হচ্ছে ভালোবাসাবাসির উপযুক্ত দিন। তাই বলে যখন ভালোবাসা দিবস ছিল না তখন কি কারও মনে প্রেম আসেনি? নাকি সবাই এ ধরনের একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে ছিল? আসলে এভাবে প্রেম আসেও না, চলেও যায় না। প্রেম নিয়ে একটি চমৎকার গান রয়েছে-

‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে-আমারি এ দুয়ারও প্রান্তে’

এই গানটি আমাদের অনেকেরই জানা এবং শোনা। গানটি যেসময় লেখা হয়েছিল তখনকার সময়ে প্রেম যেন একটু নীরবেই আসত। তবে আজকাল প্রেম নীরবে নয় সরবে আসে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আবার সরবেই চলে যায়। কারণ সময় বদলেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার ধরনও পাল্টেছে। এদিন চারিদিকে তাকালেই শহরের রাস্তায়, পার্কে, কফি শপে, রেস্তোরাঁয় জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণীকে দেখা যায়। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ রাগে ফুঁসছে। কেউবা আবার হাতে হাত রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। এদিন টিভিতে, রেডিওতে, পত্র-পত্রিকায় বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশেষ লেখা, বিশেষ সাক্ষাৎকার দেখা যায়, বিষয়- ‘কে কীভাবে ভালোবেসেছেন’। এদের অনেকেই ভালোবেসে বিয়ে করেছেন। কেউ আবার ভালোবাসার স্ত্রীকে ছেড়ে ভালোবেসে আর একজনকে বিয়ে করেছেন। সবই ভালোবাসা। অর্থাৎ চারিদিকে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা। আমার এক বন্ধু একবার আমাকে ভালোবাসা দিবস নিয়ে প্রশ্ন করেছিল- চমৎকার এই দিনে ভালোবেসে বিয়ে করা কোনো জুটির যদি সেদিনই ডিভোর্স হয়ে যায় তখন দিনটিকে তারা কী নামে অভিহিত করবে- ‘ভালোবাসা দিবস’ নাকি ‘ভালোবাসা ডিভোর্স’? উত্তর যাই হোক এখন কিন্তু এক ভ্যালেনটাইনস ডে’র ভ্যালেনটাইন, বছর ঘুরতেই অন্য কারও ভ্যালেনটাইন হতেও দেখা যায়।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এই ভালোবাসা দিবসে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা দেখা যায় যা আমাদের দেশে বড়ই বেমানান। তবে আমাদের এখানে ভালোবাসার এদিনে দেখা যায় কারও হাতে ফুল, কারও খোঁপায় ফুল, কেউবা দোকান থেকে কিনছে ফুল, কেউ বাগান থেকে ছিঁড়ছে ফুল- অভিমানে কেউবা কারও পানে ছুড়ছে ফুল। এদিন ফুলের প্রতি কেউ সুবিচার করেন, কেউ অবিচারও করেন। এ প্রসঙ্গে মান্না দে’র একটি গান রয়েছে-

‘মানুষ খুন হলে পরে

মানুষই তার বিচার করে

নেইতো খুনির মাফ,

তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ

বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে নেয়া নিহত গোলাপ…’

তবে শুধু গোলাপই নয় এই ভালোবাসা দিবসে কত ধরনের লাখ লাখ ফুল যে শহীদ হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। কেউ আবার এই ভালোবাসা দিবসকে কটাক্ষ করে লিখেছেন-

‘একদিনের এই ভালোবাসা দিবসের কী গুণ

একই দিনে কোটি কোটি ফুল হয় খুন

সত্যিকারের ভালোবাসা অন্তরেতে থাকে

লোক দেখানো ভ্যালেনটাইনস ডে বলে নাতো তাকে’

আসলে ভালোবাসা হল অন্তরের অনুভব। দু’জন দু’জনকে সত্যিকারভাবে ভালোবেসে ফেললে তখন সেটা আর লোক দেখানো বিষয় থাকে না। ভালোবাসা তখন বুকের মধ্যে ঘর বাঁধে। কোনো দিন ধার্য করে বা সিদ্ধান্ত নিয়ে ভালোবাসা হয় না। তাইতো বলা হয়, ভালোবাসা করা যায় না, হয়ে যায়। আর এই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সম্মানবোধ। যে ভালোবাসায় এসব নেই সে ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী, তার নাম ভালোবাসা নয়, মোহ।

যুগে যুগে প্রেম ছিল, প্রেম আছে, প্রেম থাকবে। জন্মের পর থেকেই মানুষ বেড়ে ওঠে এই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- এই প্রেম করতে গিয়ে অশোভন ভঙ্গিতে রাস্তাঘাটে, দোকানে, পার্কে বসে সবাইকে জানান দিতে হবে কেন? স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হবে কেন? প্রেম একটি আত্মিক অনুভূতি-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ অশ্লীল গান বা সংলাপ দিয়ে হবে কেন? কিছু কিছু রেডিওর অনুষ্ঠান শুনলে মনে হয় এরা প্রেমের পাঠশালা খুলে বসেছে। সরাসরি আলাপে জানানো হয় প্রেম করতে গিয়ে কার মন খারাপ, কেন মন খারাপ। কে কাকে কষ্ট দিয়েছে, কেন কষ্ট দিয়েছে ইত্যাদি।

ছবির কথাই ধরা যাক- প্রেমের ছবি আগেও ছিল, এখনও হচ্ছে। আগে পরিবার নিয়ে সবাই হলে গিয়ে সেসব ছবি দেখত। এখনকার মতো প্রতিদিন নায়ক-নায়িকাকে টিভিতে, রেডিওতে, ফেসবুকে বা ইউটিউবে বলতে হতো না, হলে গিয়ে ছবি দেখবেন। তখন হলের অবস্থাও এত উন্নত ছিল না তারপরও সবাই সপরিবারে ছবি দেখতে হলে যেতেন। এখন সেভাবে যান না, কারণ কী? এর জন্য দায়ী কে? হল নাকি ছবি? আধুনিক প্রযুক্তিতে আজকাল যেসব ছবি নির্মিত হচ্ছে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ছবিতে কিছু উঠতি নায়িকা দেশ-বিদেশের নায়কদের সঙ্গে তথাকথিত ভালোবাসার গানে যেভাবে অশ্লীল এবং অশোভন ভঙ্গিতে নৃত্য(!) পরিবেশন করেন তাতে পরিবার নিয়ে স্বভাবতই কারও ওইসব ছবি দেখতে উৎসাহী হওয়ার কথা নয়। এখন হাতের মুঠোয় ফোন। ছবি প্রচারণার জন্য ইউটিউবে যেসব ট্রেলার বা আইটেম সং দেখানো হয়, তাকে প্রচার না বলে অপপ্রচার বলাই শ্রেয়। কারণ তাতে দর্শক হলমুখী না হয়ে হলবিমুখ হন।

আমাদের সমাজে বাবা-মা, ভাইবোনের পারিবারিক সম্পর্ক অনেক মধুর, স্নেহ-মমতা, শ্রদ্ধার। টিভিতে, ছবিতে বা রেডিওতে যখন প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে নায়ক-নায়িকার অশোভন অশ্রাব্য কথা শোনানো হয় কিংবা অশ্লীল নৃত্য দেখানো হয় তখন তা ভাইবোন বা বাবা-মাকে বিব্রত করে, কষ্ট দেয়। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়, অনেক কিছুই উন্নত হয় এবং হয়েছে কিন্তু প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমাদের এ ধরনের পরিবর্তন কি আদৌ কোনো উন্নতির লক্ষণ?

আর একটি বিষয়- শুধু বসন্তবরণ বা ভালোবাসার দিনই নয়, ভাষার মাস হিসেবে আমাদের প্রাণের মেলা বইমেলাও চলছে এখন। আমরা অনেকেই ভালোবেসে অনেককেই অনেক কিছু উপহার দেই। আগে ভালোবেসে একজন আর একজনকে বই উপহার দিত। এই দিবসভিত্তিক প্রেমে তাতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। আশা করছি, আমরা সবাই সবাইকে বিভিন্ন উপলক্ষে বেশি বেশি করে বই উপহার দেব।

যেহেতু বহুদিন ধরে আমরা ফেব্রুয়ারি মাসকে ভাষার মাস হিসেবে পালন করে আসছি, একসময় এই মাসটিকে বলা হতো ‘শোকের মাস’। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বলা হতো ‘শহীদ দিবস ও শোক দিবস’। পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে আমাদের অন্তরে যে ভাষা চেতনার বিকাশ ঘটে হঠাৎ করে এমন কিছু দিবস আমদানি সেই অনুভূতিকে আহত করে কিনা সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

পরিশেষে বলব, ভালোবাসুন সবাইকে। একটি দিনের জন্য নয়, ভালোবাসুন সারা জীবন ধরে। ভালোবাসুন প্রকৃতিকে। ভালোবাসুন দেশকে। ভালোবেসে ভালো থাকুন সবাই। সবার জন্য ভালোবাসা।

লেখকঃ হানিফ সংকেত






মন্তব্য চালু নেই