মেইন ম্যেনু

আত্মবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছেন মা

মা, ছোট্ট একটি শব্দ কিন্তু কী বিশাল তার ব্যাপ্তি। আমার জন্মের পরপরই যার হাতে আমার হাতেখড়ি, তিনি আমার মা। ভাই-বোন সবার মাঝে আমিই ছোট। দেখতেও আমি মায়ের মতো। তাই সেই ছোটবেলা থেকে আমার মা প্রীতি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রীতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

নিজেকে গড়ে তোলার পেছনে আমার পরিবারের যথেষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছেন আমার মা শাহনাজ ইসলাম। সেই ছেলেবেলা থেকে আমি বরাবরই ক্লাসে প্রথম/ দ্বিতীয় হতাম। না হয়ে উপায়ও ছিল না। কারণ আমার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আমার মা। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক, আবৃত্তি, গান, উপস্থাপনা করতাম। মজার বিষয় হচ্ছে সবকিছু আমি উপস্থাপন করতাম আমার মায়ের সামনে।

আমার প্রথম দর্শক ও প্রথম সমালোচক মা’ই ছিলেন। মায়ের চেষ্টায় শিশু একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শতকেরও বেশি স্বীকৃতি পেয়েছি। আর এসব কৃতিত্বের পুরোটাই আমার মায়ের। জীবনে বড় বড় অর্জনগুলোতে প্রেরণার উৎস হয়ে জ্বলজ্বল করেছেন আমার মা।

আমার মা একটা খোলা বইয়ের মতো উন্মুক্ত। তাকে পড়তে কষ্ট করতে হয় না। কারণ তার ব্যক্তিত্ব পানির চেয়েও স্বচ্ছ। স্পষ্টবাদিতা তার অনেক বড় গুণ। আমার যতটুকু অর্জন তার সবটুকুর কৃতিত্ব মাকে দিতে চাই। জাতীয় বিতর্কে আমার দক্ষতা, আবৃত্তি, উপস্থাপনায় নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি সবটুকুই আমি মায়ের অর্জন মনে করি।

একটা সময় এমন হল, আমি মঞ্চে ওঠা মানেই প্রথম পুরস্কারটি আমার জন্য নির্ধারিত। এই যে এত আত্মবিশ্বাস, নিজেকে বারবার খুঁজে পাওয়া এর সবটাই আমার মায়ের অবদান। মাকে নিয়ে লিখতে গেলে আমার ভাষা গতি পায় না, মা তো মা-ই!! এসএসসি পরীক্ষায় যখন আমি স্টার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলাম, তখন মায়ের আনন্দাশ্রু দেখেছি।

বিগত বছরগুলোতে মা ঘন ঘন দেশের বাইরে যেতেন আমার বোনদের কাছে। এয়ারপোর্টে আমাদের দুজনের অশ্রু বিসর্জন যে কারও মনোবেদনার কারণ হয়ে যেত। বাবার মৃত্যুর পর আমার ভাই-বোন সবাই আগলে রাখত আমাকে। কিন্তু বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন শুধু মা-ই। আমি খুব ভাগ্যবান যে পুরনো দিনের মানুষ হয়েও মা চিন্তা চেতনায় অনেক আধুনিক।

তাই ধর্মীয় অনুশাসন দিয়েছেন আমাদের কিন্তু ধর্মান্ধ করে গড়ে তুলেননি। ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে কখনও ভীত সন্ত্রস্ত হননি। নিজের পাঁচ পাঁচটি সন্তানকে গড়ে তুলতে তুলতে নিজের কত সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন, তার হিসেব কী কেউ রেখেছি? মাকে বড্ড ভালোবাসি আমরা। আচ্ছা কেন বাসব না? কী পাইনি আমরা মায়ের কাছ থেকে?

একটি ঘটনা না বলে পারছি না। আমি তখন ৩১তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তার দিনকয়েক আগে মা অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। আমি খুব পড়াশোনা করছিলাম। আমার এত স্ট্রাগল দেখে মা বলেছিলেন, ‘এই পরীক্ষায় তোমার হারানোর কিছু নেই। তুমি চান্স না পেলে বরং এদেশের মানুষের অনেক কিছু হারানোর আছে।’

আমি জানি, আমার মতো ইফতেখার না থাকলে দেশ থেমে যাবে না। কিন্তু আমাকে শুধু অনুপ্রেরণা দিতে সেই সময়ে মায়ের সেই উক্তি আমার মাঝে একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জাগিয়ে তুলেছিল। নিজের মাঝের সেই আগুন নিয়েই আমি মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। সেদিনও মা পরীক্ষা কেন্দ্রে তার অতি আদরের ছোট ছেলেটিকে অনুপ্রেরণা দিতে গিয়েছিলেন।

চমৎকার একটি মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে গাড়িতে অপেক্ষারত মায়ের কাছে আসি। মাকে বললাম, এবার আমার চাকরি না হলে অনেকেরই হওয়া উচিত না। এটা কোনো অহংকার নয়। মায়ের অনুপ্রেণায় আমার এই আত্মবিশ্বাস হয়েছিল। আত্মবিশ্বাসের এই বীজ ছেলেবেলায় মা আমার মাঝে বুনে দিয়েছেন। আজ মায়ের আদর্শ বুকে লালন করে পুলিশ অফিসার হয়েছি। মায়ের আদর্শ আর বাংলা মায়ের আদর্শকে আমি আলাদা করে দেখি না। নিজের মায়ের পাশাপাশি দেশমাতৃকার তরে নিজেকে একইভাবে বিলিয়ে দিতে চাই।

লেখক : ইফতেখারুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ কমিশনার, মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।






মন্তব্য চালু নেই