মেইন ম্যেনু

‘আমরা লাশের বিদ্যুৎ চাই না’

‘আমরা লাশের বিদ্যুৎ চাই না। যেখানে মানুষ লাশ হয়, এ বিদ্যুৎ আমরা চাই না। পুলিশ দেওয়া হয়েছে জনগণের নিরাপত্তার জন্য। সে পুলিশ গুলি করে মানুষ মেরে গেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাই।’

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় গণ্ডামারা গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য শামীমা আক্তার এসব কথা বলছিলেন। কথা বলার সময় শামীমার চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছিল। দৃঢ়কণ্ঠে বারবার বলেছেন, ‘মানুষ মেরে করা বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।’

শামীমা আরো বলেন, ‘গত ৪ এপ্রিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সে প্রতিবাদ সভায় পৌঁছানোর আগেই পুলিশ গণহারে মানুষ মারবে তা কখনো দেখিনি। আমার জীবনে আমি কখনো এ রকমভাবে মানুষ মারতে দেখিনি।’

গণ্ডামারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এখনো কাটেনি শোক। নিহতদের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে এখনো কান্নার আওয়াজ। গত ৪ এপ্রিল গণ্ডামারা গ্রামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে চারজন নিহত হন। হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে বাঁশখালীতে চারদিনের শোকসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে এলাকাবাসী।

বুধবার গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে গ্রামের বাসিন্দারা এগিয়ে আসেন। প্রতিবাদ জানান হত্যাকাণ্ডের। একই সঙ্গে মানুষ জানিয়ে দেন, এ এলাকায় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না তাঁরা। আর এ কথা যেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায় সে জন্য গণমাধ্যমের কর্মীদের সহযোগিতাও চাইলেন তাঁরা।

পশ্চিম গণ্ডামারা গ্রামে ‘এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেড অ্যান্ড এসএস পাওয়ার-২ লিমিটেড’ নামে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে ওই কেন্দ্রে। এস আলম গ্রুপ, সেপকো থ্রি এবং এইচটিজি চায়নার যৌথ মালিকানায় প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। ২৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটি স্থাপন করা হবে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায়। এরই মধ্যে প্রকল্পের জন্য ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে মাছ ও লবণ চাষ, বাসস্থান ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।

‘ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষ’

গণ্ডামারা গ্রামে দেখা হয় ‘ভিটামাটি রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক লিয়াকত আলীর সঙ্গে। স্থানীয় মানুষের উদ্বেগের কথা গুছিয়ে বললেন তিনি।

লিয়াকত আলী বলেন, ‘প্রতিদিন এক হাজার মেট্রিক টন কয়লা যদি জ্বলে, এখানে পরিবেশের অবস্থা কী হতে পারে, আপনারা শিক্ষিত মানুষ আমার চেয়ে ভালো জানবেন। এক হাজার মেট্রিক টন কয়লার ফ্লাই অ্যাশ আকাশে উড়বে, সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে। যে ধোঁয়া উঠবে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে মেঘ হবে না। যদি ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘও না হয়, সূর্যও দেখা না যায়, তাহলে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এখানকার পরিবেশ। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

কমিটির সদস্য আবু আহমেদ তুলে ধরলেন মানুষের জীবিকার কথা। তিনি জানালেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আবু আহমেদ বলেন, ‘কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে এই যে আমাদের বঙ্গোপসাগর আছে ওখানে প্রচুর পরিমাণে মাছ হয়। আমাদের জেলেরা মাছ ধরে। পশ্চিমে আমাদের কতগুলো লবণের মাঠ আছে। ওখান থেকে মানুষ লবণ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সরকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ এলাকায় দেড়শো পরিবার আছে। আসলে এখানে ১০ হাজারের মতো পরিবার আছে। এসব মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলে এরা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র করছে। রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে পরিবেশবিজ্ঞানীরা যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের এখানে কোনো পরিবেশবিদ আসছেন না। হয়তো এস আলমের (প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে বোঝাপড়া হয়ে গেছে। আমরা সরকারকে বলতে চাই আমরা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।’

গ্রামের দুজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। উভয়েই বললেন, ‘আমি আমার দেশ চাই। বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না। সরকারকে জানায়ে দিয়েন। কয়লা দিয়ে মানুষ মরবে। জনগণ যদি মরে যায়, তবে সরকার কী করবে? কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।’

‘এক সিগারেট পরিমাণ ধোঁয়াও বের হবে না’

এসএস পাওয়ার লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান বাহাদুর আলম হিরন দাবি করেন, এ প্রকল্পের কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না।

বাহাদুর আলম বলেন, প্রজেক্টরের মাধ্যমে মানুষকে দেখানো হয়েছে। পরিবেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। একটা সিগারেট খেলে যে পরিমাণ ধোঁয়া বের হয়, সে পরিমাণ ধোঁয়াও সেখানে বের হবে না বলে দাবি করেন তিনি।

বাহাদুর আলম আরো বলেন, ‘গত ২৭ তারিখে আমাদের মাননীয় এমপি মহোদয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ওই এলাকায় বলেছিলেন যে আপনাদের ১০ জনকে নিয়ে যাওয়া হবে বিদেশে। সেখানে আপনারা প্র্যাকটিক্যালি দেখে আসবেন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র উপকার করে না অপকার করে।’

আত্মরক্ষার্থে গুলি করে পুলিশ

এদিকে পুলিশ দাবি করছে, পুলিশের গুলিতে নয়, নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে চার ব্যক্তি মারা যায়। পুলিশের দাবি, বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কুমার মজুমদার বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। দুই বছর পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ চলছে। গত এক-দেড় মাস থেকে যখন ওরা কাজ করছিল, তখন এক শ্রেণির লোকজন ওখানে বাধা দিচ্ছে। বিভিন্ন মালপত্র নেওয়ার সময় বাধা প্রদান করছিল। অনেক জিনিস ভাঙচুরও করেছে। আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। আমরা তা সামাজিকভাবে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। একপর্যায়ে দুই পক্ষ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মাধ্যমে মুখোমুখি হয়। এ অবস্থায় পুলিশ নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে ওরা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধী যারা নিজেরা নিজেরা গোলাবর্ষণ করে। পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে গুলিবর্ষণ করে।’






মন্তব্য চালু নেই