মেইন ম্যেনু

‘আমাকে কবর দিও না’

শুভ্রতা পবিত্রতার প্রতীক। হাসপাতালের সেই শুভ্র চাদরের উপর শুয়ে আছে নয় বছরের শিশু ফরিদ। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুব সতর্কতার সঙ্গে তার শরীর থেকে বোমার টুকরোগুলো বের করছে। আর তার মাঝেই শুয়ে থাকা ফরিদ বারবার ডাক্তারকে বলছে, ‘আমাকে কবর দিও না’। মানুষের আয়ুর হিসেবে ফরিদ এখনও অনেক ছোটো, কিন্তু মাত্র ছয়মাসের যুদ্ধের ভেতরই তার মনে জন্মেছে মৃত্যু নিয়ে তীব্র এক আতঙ্ক। যুদ্ধ তার সামনে নিদারুণ বাস্তবতা হয়ে ধরা দিয়েছে পরিচিত মুখগুলোকে কবর দিতে দেখার মধ্য দিয়ে। তাইতো ছোট্টো ফরিদ আবারও কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারকে বলছে, ‘আমাকে কবর দিও না’।

ছোট্টো ফরিদের কথাশুনে ডাক্তারের পাশেই দাড়িয়ে থাকা একজন সেবিকা হেসে সান্তনা দেবার চেষ্টা করছিল যে, তার কিছুই হবে না। ডাক্তার-সেবিকা এবং ফরিদের মধ্যকার এই সম্পর্কের দৃশ্যায়ন করছিলেন আহমেদ বাসা নামের এক আলোকচিত্রী, যিনি মূলত ওই হাসপাতালে এসেছিলেন কিছু ছবি তুলবেন বলে। কিন্তু ফরিদের শুভ্র বিছানার পাশে আসার পর তার মনের দৃশ্যপটই পাল্টে যায়।

ফরিদ ও অপরাপর আরও কিছু বিষয় নিয়ে আহমেদ বাসা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন’কে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সে স্রেফ আহত। আমি ভাবতেও পারিনি, এমনকি নিশ্চিতও ছিলাম না যে আমি দৃশ্যগুলো রেকর্ড করবো। আমি আমার স্টিল ফটোগ্রাফি(আলোকচিত্র) নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলাম।’

ওই ঘটনার কয়েকদিন পরেই মাথায় আঘাত নিয়ে মারা যায় শিশু ফরিদ। ইয়েমেনের তায়াজ শহরে পারিবারিক কবরস্থানে তাড়াহুড়ো করে তাকে কবর দিয়ে দেয়া হয়। যে কবরকে ভয় পেয়েছিল ছোট্টো ফরিদ, শেষমেষ সেই কবরেই তাকে শায়িত করা হলো। আলোকচিত্রী আহমেদ বাসা’কে এই ঘটনাটি প্রচণ্ড নাড়া দেয়। আর তখনই নিজের কাছে ফরিদ সংক্রান্ত থাকা সকল ভিডিও ফুটেজ জড়ো করতে শুরু করেন এবং সৌদি বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত বোমার আঘাতে আহত শিশু ফরিদের মৃত্যুর গল্পটি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।

ইয়েমেনসহ আরব বিশ্বে গোত্রগত দাঙ্গা নতুন কোনো বিষয় নয়। অধিকাংশ আরব গোত্রই নিজেদের সুরক্ষা এবং পরম্পরা হিসেবে অস্ত্র ধারন করছে দীর্ঘদিন ধরেই। মূলত আরব যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর কাছে প্রথম আধিপত্যভিত্তিক বাণিজ্যের জন্য যায় যুক্তরাজ্য। এরপর যুক্তরাজ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স প্রবেশ করে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যতবারই আরবের নিজস্ব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে ততবারই সমস্যা কমার চেয়ে বেড়েছে বেশি। সম্প্রতি ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট আব্দু রাবু মানসুর হাদির সমর্থক বাহিনীর মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছে তার কেন্দ্রও দেশের বাইরে। আভ্যন্তরীন এই সংঘাতের মাঝে নিজস্ব স্বার্থ নিয়ে হাজির হয় সৌদি আরব। সৌদি কর্তৃপক্ষ ইয়েমেনের মাটিতে বোমা হামলা চালানো শুরু করলে হুতি বিদ্রোহীদের তুলনায় সাধারণ মানুষই মারা যেতে থাকে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সৌদি বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত পাঁচশর অধিক সাধারণ মানুষ নিহত এবং ২৭ হাজার আহত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ফরিদের গল্প আজ বিশ্বের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। অন্যায্য যুদ্ধের বলি হয়ে মারা যাওয়া ফরিদ আর ফিরে আসবে না সত্যি, কিন্তু ফরিদকে সামনে রেখে পৃথিবীর যুদ্ধবাজ নেতৃত্ব আরও একবার ভেবে দেখতে পারে, তাদের সকল অর্থ-অস্ত্রের তুলনায় একটি প্রাণ অনেক বেশি দামি। সিরিয়ার আইলান, পাকিস্তানের মুনতাহা, বাংলাদেশের রাজন, ভারতের কিশোর নামের শিশুরা বাস্তবিক জীবনের পাপ-পূণ্যের হিসেবে আসার আগেই অন্যের ক্রোধের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিশ্বের শিশুদের মনে এক তীব্র ভয় প্রবেশ করছে যুদ্ধের কালো মেঘের অন্তরালে।






মন্তব্য চালু নেই