মেইন ম্যেনু

আমাগো ইসকুল নদীতে ভাইসা গেছে ইসকুলে যামু কেমনে?

হামিদা আক্তার বারী, ডিমলা করেসপন্ডেট, নীলফামারী : আমাগো ইসকুল নদীতে ভাইসা গেছে, আমরা এহন ইসকুল যামু কেমনে ? আমাগো বাড়ী-ঘর এহন এইহানে নিয়া আইছে আমাগো বাজান। মা কইছে এহন থাইকা আমাগো এহানে থাকতে হইবো। ইসকুল নাই। ইসকুল যামু কেমনে। পড়া লেহা করতে তো মনে চায়। আমাকো স্যার তো এহন এহানে আইসা পড়াইবো না। বই খাতা তো আমাগো আছে। আমাগো মা বাজান পড়া লেহা জানে না পড়াবো কেমনে ? এভাবেই কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা একের পর সংবাদকর্মীদের কাছে প্রশ্ন করেই চলেছে। কিন্তু কোন উত্তর নেই সংবাদকর্মীদের। এসব শিশুদের মন রক্ষার্থে বলা হলো তোমরা সকলেই বই খাতা নিয়া আসো তোমাদের জন্য এখানেই স্কুল হবে। তোমরা আবারও আগের মত স্কুলে যাইবা। পড়া-লেখা করবা। শিক্ষিত হয়ে অনেক বড় হইবা। এই বলতেই হাতে বই খাতা নিয়া ছুটে আসে ডালিয়ার পাউবো’র সিলট্রাপে আশ্রয় নেয়া আব্দুল করিমের শিশু কন্যা তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ইয়াছমিন, সুলতানের শিশু পুত্র প্রথম শ্রেণীর ছাত্র মোমিনুর,শফিকুলের শিশু কন্যা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী শান্তি আক্তার,শাহাজাহানের শিশু পুত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র জহুর”ল,দারব আলীর শিশু পুত্র চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র আরিফ,আনোয়র হোসেনের শিশু পুত্র তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র মিলন ও কলম্বিয়া বাধে আশ্রয় নেয়া আবুল কালামের কন্যা পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী আমিনা, মো: আলীর কন্যা ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্রী ইসমোতারাসহ অসংখ্য শিশু কিশোর ছুটে আসে বই-খাতা হাতে নিয়ে। ছবি তুলতেই ছুটে আসে আশ্রয় নেয়া এসব শিশুদের অভিভাবকবৃন্দ। তাদের মধ্যে এসব শিশুদের অভিভাবক আব্দুল করিম,শাহাজাহান,আনোয়ার হোসেন জানান, আমরা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দু:শ্চিন্তায় আছি। হঠাৎ করে সর্বনাশী তিস্তা আমাদের বাড়ী-ঘরের সাথে সাথে ছেলে মেয়েদের স্কুলগুলিও নদী গ্রাস করে গিলে ফেলেছে। আমরা তো কোন মতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু আপাতত পেয়েছি।

প্রশাসন থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষজন আমাদের খোঁজ খবর মোটামুটি ভালোই নিচ্ছে। খাওয়া দাওয়াসহ কোন কিছুর অসুবিধা হচ্ছে না। এমন কি স্বাস্থ্য সেবা হাতের নাগালেই পাচ্ছি । সরকারী ভাবে স্বাস্থ্য বিভাগ মেডিকেল ক্যাম্প করেছে । কিন্তু দু:চিন্তায় পড়েছি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। তিস্তার পানি বৃদ্ধি হওয়ায় প্রায় ২/৩ মাস ধরে স্কুলে যেতে পারেনি ছেলে-মেয়েরা। এভাবে চলতে থাকলে এসব কোমল মতি শিশুরা আর স্কুলে যেতে চাইবে না। এক সময় তারা ঝড়ে পড়বে।

এ সময় দেখা মিলে দিনাজপুর সরকারী মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মাস্টার্স পড়ুয়া ছাত্র মোমিনুর রহমান মোমিনের সাথে তিনি জানান, আমার গ্রামের বাড়ী এই গ্রামেই। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পাড়ছিন যে কেন এখনও প্রশাসন এসব কোমল মতি শিশুদের কথা চিন্তা করে আপাতত অস্থায়ী ভিক্তিতে ডালিয়া পয়েন্টে একটি স্কুল ঘর নির্মাণ করে আশ্রয় নেয়া শিশুদের পড়ালেখা চালু করছে না। তাছাড়া যে সব স্কুল নদীগর্ভে বিলীণ হয়ে গেছে সেসব শিক্ষকববৃন্দ তো আছেই। তাদেরকে দিয়েই এই শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব। তা না হলে আর কিছু দিন গেলে এরা ঝড়ে পড়ে যাবে। পড়াশুনায় মনোবেশন করতে চাইবে না। এমনিতেই তারা এখন ছিন্নমূল পথ শিশুর মতোই ঘুরে ফেরছে ইেদক সেদিক।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় তিস্তার ভয়াবহ বন্যায় ভাঙ্গনের শিকার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের একের পর এক গ্রামগুলির সবকিছুই বিলীন হয়ে যাওয়ায় তিস্তার চরে বসবাসকারী কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কায্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তিস্তা নদী বেষ্টিত টেপাখড়িবাডী ইউনিয়নে সর্বনাশী তিস্তার গতিপথ এবারে পরিবর্তন হয়ে নতুন একটি চ্যানেল সৃষ্টি হওয়ায় ইউনিয়টির ৬ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,১টি উচ্চ বিদ্যালয় ও ১টি কিন্টার গার্ডেন বিদ্যালয় বন্যা ও ভাঙ্গনের কবলে পরে ধ্বংস হয়ে গেছে। বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন না হলেও এক বুক পানিতে তলিয়ে রয়েছে। উপজেলা তিস্তানদী বেষ্টিত টেপাখড়িবাডী ইউনিয়নটি বন্যা ও ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানসহ ইউনিয়নটির ৪-৯ ওয়ার্ডের গ্রামগুলি ডিমলার মানচিত্র হতে হাড়িয়ে যেতে বসেছে। ৬টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১টি উচ্চ বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় শিক্ষা কায্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী মধ্য সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরখড়িবাড়ী বাবুপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জিঞ্জিরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেপাখড়িবাড়ী ২নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্বখড়িবাড়ী প্রাথমিক সরকারী বিদ্যালয়, হায়দার পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একতার বাজার কিন্টার গার্ডেন বিদ্যালয়ও ইউনিয়নটির একমাত্র টেপাখড়িবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়টি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

শিক্ষা কার্যক্রমের খবর নিতে কথা হয় টেপাখড়িবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাতেমা খাতুন সাথে তিনি জানান, বন্যায় ও ভাঙ্গনের কারনে বিদ্যালয়টির অস্তিত্ব প্রায় বিলীনের পথে। আমার বিদ্যালয়ে ৪৭২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। গত প্রায় দুই মাস ধরে পাঠদান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের ভবিষৎ জীবন হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। জিঞ্জির পাড়াা সরকারী প্রাথমিক দ্যিালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল বাছেদ জানান, তার বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে বিদ্যালয়টি পানিতে তলিয়ে গেছে। ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

চরখড়িখড়িবাড়ী মধ্য সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাদৎ হোসেন বলেন, আমার বিদ্যালয়টি তিস্তার বন্যার শুরুতেই বন্যার পানি ও ভাঙ্গনে কবলে পড়ে দুটি ভবন দেবে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়। ৪৪৩ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে। চরখড়িবাড়ী বাবুপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমার বিদ্যালয়টিও তিস্তা নদতীতে তলিয়ে গেছে। ৪৪০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, বন্যা ও ভাঙ্গনের কারনে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় কন্যার কবলে পড়ে পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পাশ্ববর্তি বিদ্যালয়ে পাঠদান দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারছেনা। একারনে ৬ টি বিদ্যালরেয়র প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

ডিমলা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আহসান হাবীব বলেন, ইউনিয়নে একটি মাত্র উচ্চ বিদ্যালয়। বন্যা ও ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বিদ্যালয়টি তিস্তার গর্ভে বিলীন হতে চলেছে। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম সাহিন বলেন, যে কোন ভাবেই হোক এসব শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। প্রয়োজনে টিনসেড অস্থায়ী ঘর নিমার্ণ করে হলেও জর”রী ভিক্তিতে এসব শিশুদের পড়া-লেখার দিকে ফিরে আনতে হবে। এ জন্য সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের তড়িৎগতিতে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।



(পরের সংবাদ) »



মন্তব্য চালু নেই