মেইন ম্যেনু

আমিই নদী, নদীই আমি

নদীর সঙ্গে মানুষের শারিরীক ও আত্মিক যোগাযোগ অনেক প্রাচীন। বলা যায়, সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষের সঙ্গে এই সম্পর্ক রচিত হয়েছে। যে কারণে নদীবিধৌত অঞ্চলগুলোতে নদীকে কেন্দ্র করে অনেক সাহিত্য দেখা যায়। নিউজিল্যান্ডের মাওরি আদিবাসীদের নাম, চিন্তা-চেতনা সবই আসে তাদের প্রাচীন নদী ওয়াংগানু থেকে। সাগর থেকে আসার এই নদী নিউজিল্যান্ডের উত্তর-মধ্যাংশের পাহাড়ের কোল ধরে ক্রমশ এগিয়ে গেছে।

কয়েক শতাব্দী ধরে এই ওয়াংগানু নদীতেই ক্যানুর মাধ্যমে যাতায়াত করছে মাওরিরা। এর বাইরে এই নদীতেই ঈল মাছ শিকার করে তাদের জীবন চলে। নদীর পাশেই ছোটো ছোটো ঘর বানায় তারা এবং একটি নির্দিষ্ট ঋতু পর্যন্ত তারা এখানেই বসত করে। নদী তীরে থাকার জন্য মাওরি জনগোষ্ঠির মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম লড়াই করে যায়। তাদের ভাষায় ‘কো অও তে আওয়া। কো তে আওয়া কো আও’, যার অর্থ বাংলা করলে দাড়ায়, ‘আমিই নদী। নদীই আমি।’

২০০১ সাল পর্যন্ত মাওরিদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার মতো কোনো লিখিত নথি বা ছবি ছিল না। তবে পরবর্তী সময়ে কয়েকজন আলোকচিত্রীর ছবির কল্যাণে মাওরি জনগোষ্ঠি আলোচনায় আসে। সম্প্রতি ৭০০ গ্লাস প্লেট ছবি দিয়ে মাওরি সম্প্রদায়ের উপর নির্মান করা হয়েছে ‘আই অ্যাম দ্য রিভার’ চলচ্চিত্রটি। উনিশ শতকের মাওরিদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক এই চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আই অ্যাম দ্য রিভার চলচ্চিত্রটিতে একশটি গ্লাস প্লেট ছবির সিরিজ ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্লেটগুলো প্রায় একশ বছর আগে ওয়াংগানু নদীর ধারে মাওরিতের বসতির আশেপাশে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই শত বছর পুরনো ছবিগুলো দিয়েই চলচ্চিত্রটির শুরুর দিকের অংশ নির্মান করা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির বর্তমান আবেদনের বাইরেও ওই গ্লাস প্লেটগুলো মাওরি জনগোষ্ঠির প্রান্তিক যাপিত জীবন সম্পর্কে জানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

নদী1গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্লেটগুলো কে বা কারা বসিয়েছিল সেটা গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই, কিন্তু ছবির প্রতিপাদ্য বিষয় যারা এই প্লেটগুলো এখন তাদেরই। সেদিক বিবেচনায় মাওরিদের ঐতিহ্য রক্ষার্থে তাদেরেই উচিত এই প্লেটগুলো সংরক্ষণ করা। পাশাপাশি দুটো সংস্কৃতির মানুষের মধ্যকার পরিবর্তন বোঝার জন্য এই প্লেটগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। প্রথমদিকে লুইজি এবং তার সহযোগীরা মাওরিদের ছবি তুলতে চাইলে তারা বাধা দেয়। কারণ কেউ তাদের ছবি তুলে বিক্রি করছে এই বিষয়টা মাওরিরা সহজভাবে নেয় না। অবশ্য পরবর্তী সময়ে ছবির গুরুত্ব বুঝিয়ে বললে তারা সীমিত স্থানে ছবির কাজ করতে দেয়।

১৮৪০ সালের দিকে সর্বপ্রথম ওয়াংগানুর উত্তরাংশে ইউরোপীয় সেটেলাররা বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আসেন। তারা তাদের অস্তিত্বের সঙ্কট থেকে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে গোটা অঞ্চল জুরে। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা মাওরিদের অনেক স্থান দখলতো করে নেয়ই, পাশাপাশি অনেক মাওরিকে দাস হিসেবেও বিক্রি করে দেয়া হয়। তবে ইউরোপীয় সেটেলাররা পুরো সময়টাই এরকম আগ্রাসন ও অত্যাচার চালাতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই মাওরিরা সেটেলারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। এরকম এক লড়াইয়ে দেড়শ মাওরি যোদ্ধা টানা ৭৯দিন ধরে ইউরোপীয় সেটেলারদের একটি দলকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এরপরই মূলত সেটেলাররা তাদের আধিপত্যবাদী আচরণ কমাতে শুরু করে।






মন্তব্য চালু নেই