মেইন ম্যেনু

আমি তো ভালো ছাত্রী ছিলাম, কী প্রয়োজন ছিল বিয়ের !

মেহেরুন্নেসা রিমা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছোট ভাই খায়রুল বাশারের মেয়ে ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবদুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী। চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল সার্জিস্কোপে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর গত ১০ জানুয়ারি রাতে মারা যান তিনি। কন্যা সন্তানের জন্ম হওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তিনি মারা যান বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ। রিমা তার চাচা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিকে বড় আব্বা বলে ডাকতেন।

শোকাহত চাচা রিমার জবানিতে নিজের ও স্বজনদের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। চলুন জেনে নেয়া যাক জবানিতে রিমা কী বলেছেন :

বড় আব্বু! আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছো? নাহ্ কান্না নয়, দোয়া চাই। এখন কবরে পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে মুক্ত হয়ে খোলা মাঠে আমি খেলা করছি। খেলা থামিয়ে তোমার কান্নার শব্দ শুনে আবার কবরে এসে শুয়ে পড়লাম।

পৃথিবী আমাকে বাঁচতে দিলো না। কী প্রয়োজন ছিল এই বিয়ের? আমি তো ভালো ছাত্রী ছিলাম। তোমার ইচ্ছা পূরণ করে মাস্টার্সে ভালো ফল বয়ে এনে শিক্ষকতা করে তোমাদের মুখ উজ্জ্বল করার বাসনা আমার পূর্ণ হলো না।

পৃথিবী এতো স্বার্থপর যে, সব মানুষের আশা এখানে পূর্ণ হতে দেয় না। একটা না একটা বাধা নেমে আসে। আমি তো মা-বাবার কাছে বিয়ের কথা বলিনি। কেন আমাকে বিয়ে দেওয়া হলো? তাও একজন প্রবাসী ছেলের সঙ্গে। না পেলাম স্বামীর সুখ, না পূরণ হলো মনের আশা। মানুষের মনে অনেক সুপ্ত বাসনা থাকে। আমারও ছিল, কাউকে ব্যক্ত করিনি।
থাক, আজকেও তোমার কাছে ব্যক্ত করলাম না। পরকালে দেখা হলে একদিন খুলে বলবো।

মেয়েরা যখন গর্ভবতী হয়, তখন কতো সমস্যা থাকে। সব সমস্যার কথা মা-বাবাকে খুলে বলা যায় না। স্বামীও নেই, কাকে বলি? এটাকে বিয়ে বলা হলো কেন বুঝি না। অল্প সময়ের জন্য স্বামীকে কাছে পাওয়া, তারপর আবার দূরে চলে যাওয়া- এর নাম কি বিয়ে? বাবার সংসারে এসে সময় কাটানোর নাম কি বিয়ে? আমি এত্তো বোঝা ছিলাম যে, আমাকে বিদায় করার জন্য স্বার্থপরেরা এক হয়ে এ কাজ করলেন?

বড় আব্বা! আমার জন্য কোনো দুঃখ করো না। আমি এখানে ভালোই আছি। তুমি শুধু নেই, নেই মা-বাবা। মাঝে মধ্যে স্বপ্নে এসে হাজির হলে বিরক্ত হবে না তো? তুমি তো একটুতেই নার্ভাস হয়ে যাও। আমি এলে নার্ভাস হয়ো না। তোমাকে দেখতেই শুধু আসবো। তুমিই আমাদের গর্ব, তুমি আমাদের সম্বল।

পৃথিবীর ডাক্তারগুলো যেন কেমন! আমার পেট ওপেন করে সেলাই না দিয়েই আরেক রোগী দেখতে ভোঁ-দৌড়। নার্স কি সেলাই করবেন, না আমার রক্তক্ষরণ বন্ধ করবেন? নার্স কি অক্সটার্জিন ব্যবহার করতে জানেন?

আমার রক্তে আমি যখন গোসল করছি, ওই সময় কে একজন এসে আমার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। তখন আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। চোখ ভরে বাচ্চাকে দেখার সুযোগ হল না। কে একজন চাদর উল্টিয়ে টের পান, এখন আমার শরীরে আর রক্ত নেই। ওই সময় হাজার বোতল রক্ত দিলেও কিছুই হওয়ার নয়।

মৃত্যু যে এতো সুখের, তা আগে জানতাম না। আমি উড়ে যাচ্ছি মহাকাশে, কী আরাম, কী উপলব্ধি! এ আরাম ছেড়ে কি কেউ পৃথিবীর দিকে আসবে? আমি কিন্তু আসবো শুধু তোমাকে দেখতে। আমার জন্য কেঁদো না, চোখের পানি মুছে ফেলো, না হলে আমার ক্ষতি হবে।

এখন আমি এক বাগান থেকে অন্য বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পৃথিবীতে শুধু স্বর্গের বর্ণনা শুনেছি। ওই বর্ণনা সঠিক নয়, স্বর্গ তার চেয়েও বেশি সুন্দর। এই সৌন্দর্য উপলব্ধি করা থেকে আমাকে বিরত করো না। তুমি কাঁদলে আমার তো সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। দোহাই বড় আব্বা, কেঁদো না, আমি ভালো আছি। এটাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। এটাকে মেনে নাও। শান্ত হও। সবাই সুখে থাকো।

লেখক: নুরুল ইসলাম বিএসসি
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী






মন্তব্য চালু নেই