মেইন ম্যেনু

আমি ব্যাচেলর এর মানে এই না যে আমি ‘জঙ্গী’…

কাসাফাদ্দৌজা নোমান: বাড়িওয়ালাকে দৃঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাচেলররা আপনার এমন কী ক্ষতি করেছে যে তাদের ভাড়া দেবেন না?’

বাড়িওয়ালা মুঠি থেকে লুঙির ভাঁজ ছেড়ে বললেন, ‘গেল বছর এক ছেলে আসছে তার বউকে নিয়ে। মাত্র বিয়ে করছে। সুখের সংসার। বাসা ভাড়া নিতে চায়। দিলাম ভাড়া। তারা বাসায় উঠল। প্রথম রাতে তাদের জন্য খাবারও পাঠাইলাম। সকালে উঠেই শুনি, দুইজনে চিত্কার করে ঝগড়া করতেছে!’

: ঝগড়া হতেই পারে। মানুষমাত্রই ঝগড়া করে। কেউ সরাসরি, কেউ মনে মনে।

: আরও আছে। দুই দিন পর ছেলেটারে দেখি, তার বউকে দেখি না। জিজ্ঞেস করলাম, কী বাবা, বউমা কোথায়? সে মুখ শুকনা করে জানাল, সে রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

: মন খারাপ হওয়ারই কথা। আজ আমার একটা বউ থাকলে সে-ও হয়তো ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে যেত।

: আচ্ছা যা-ই হোক। তার কিছুদিন পর জানাইল, তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এরপর তার কাছে পোলাপাইন আসে, আড্ডা মারে, মাঝরাতে বাড়িতে ফেরে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ছেলেটা আসলে বিয়েই করেনি। বাড়ি ভাড়ার জন্য বউ ভাড়া করে আনছিল।

‘অসাধারণ!’ আমার মুখ ফসকে শব্দটা বেরিয়ে গেল। বাড়িওয়ালা চোখ পাকিয়ে এমন একটা লুক দিলেন যে দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়ার কথা দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি আমাদের।

ব্যাচেলর বাসা খুঁজে পাওয়ার যুদ্ধে নেমেছি সেই মেস-জীবনের শুরু থেকেই। একবার বাড়িওয়ালা ৩০ তারিখে বললেন, ‘এক দিন সময় আছে। কালকেই বাড়ি ছাড়তে হবে।’

আমাদের মাথায় যেন ব্যাচেলর চৌকি ভেঙে পড়ল। নানা কথায়, বাগ্বিতণ্ডায় আমাদের রাগী বন্ধু আতিক বাড়িওয়ালার মুখের ওপর বলে বসল, ‘থাকলাম না আপনার দুই নম্বর বাড়িতে।’

বাড়িওয়ালা ভীষণ রেগে গেলেন এবং আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে বাক্স–পেটরা গুছিয়ে অজানার উদ্দেশে রওনা হলাম। কিন্তু একটা জিনিস ঠিক বুঝলাম না, বাড়িওয়ালা যে সৎ না, দুই নম্বরি ইনকাম করে, এটা আতিক জানল কীভাবে? জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কীভাবে বুঝলি যে বাড়িওয়ালার বাড়ি দুই নম্বর?’

: খোঁজ নিয়েছি।
: ডিটেইল বল তো।
: এইটা তাঁর দুই নম্বর বাড়ি। প্রথমটা নূরজাহান রোডে।

যা হোক সে রাতে আমরা এক মহান বাড়িওয়ালা পেয়েছিলাম, যিনি আমাদের বুয়া না এলে বাটিতে করে তরকারি পাঠিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ভাতটা ঝটপট রেঁধে ফেলে গরম গরম খেয়ে ফেল।’

সুখস্মৃতি রোমন্থন করলে এই দুর্মূল্যের বাজারে বাসা মিলবে বলে মনে হয় না। যাকে দেখি তাকেই জঙ্গি মনে হয়। আয়নায় তাকালে মাঝে মাঝে নিজেকেই সন্দেহ হয়! টু-লেট দেখে পরবর্তী বাসায় কলবেল চাপলাম।
বাড়িওয়ালা বের হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই?’
: ভাড়া।
: ফ্যামিলি না ব্যাচেলর?
: ফ্যামিলি।
: ফ্যামিলিতে কে কে আছে?
: আমরা তিনজন। আমার ফুফাতো ভাই মঞ্জু, আমার দূরসম্পর্কের খালার ছেলে সজীব আর আমি।
: এ তো ব্যাচেলর!
: না আংকেল, আমরা তিনজন মিলে ফ্যামিলি।

তাঁকে কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না, নারী ছাড়াও ফ্যামিলি হয়। তা ছাড়া প্রায়ই মোবাইল অপারেটরদের বিজ্ঞাপনে দেখি, ‘আমরা এখন পাঁচ লাখের পরিবার…’। তারা যদি পরিবার হতে পারে তাহলে আমাদের কী দোষ?
পরবর্তী বাসাতে গেলাম, দরজা খুলে উঁকি দিল আট-নয় বছরের একটা পিচ্চি।
: হাই বাবু, বড় কেউ আছে? বলো, বাসাভাড়ার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।

পিচ্চি চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, ‘ফ্যামিলি না ব্যাচেলর?’

পিচ্চির কথা শুনে আমাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সজীব জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি জানো, ব্যাচেলর কী?’

: জানি। যারা বিয়ে করে নাই, তারা ব্যাচেলর।
: হুঁ, ব্যাচেলর! এখন বড়দের ডাকো।

পিচ্চি বাবু মুখের ওপর ধড়াস করে দরজা বন্ধ করে দিল। সজীব আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যাচেলর শুনে ভয় পেয়েছে।’

সারা দিন বাসা খুঁজে এবং নানা অভিজ্ঞতায় যা বুঝলাম, বাড়ির বাচ্চাকাচ্চারা ঘুমাতে না চাইলে তাদের মায়েরা হয়তো এখন ভয় দেখান এভাবে—‘ঘুমাও, নইলে ব্যাচেলর আসবে!’

সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য এখন একটাই পথ—বিয়ে। কিন্তু এই স্বল্প সময়ে কে কাকে বিয়ে করবে! প্রস্তাব দিলাম এক বান্ধবীকে, ‘দোস্ত, চল বিয়ে করে ফেলি।’

: বেকুব, আমি বিবাহিত।
: ওহ্ হো সরি, ভুলে গেছিলাম।
: তুই কি আমাকে আগে থেকে ভালোবাসতি? বলিসনি তো কখনো?
: আগে তো ব্যাচেলর ভাড়া দিত!

ফোন কেটে দিল সেই বান্ধবী। অতএব আমি দ্বিতীয় বান্ধবীর কাছে গেলাম প্রস্তাব নিয়ে। ওর নাম শেলি। বললাম, ‘ওহ্ শেলি, চলো বিয়ে করে ফেলি!’

: খাওয়াবা কী?
: সপ্তাহে দুই দিন মুরগির মাংস, তিন দিন ডিম আর আলু ভর্তা। এক দিন মাছ। আর শুক্রবার বুয়া আসে না।

শিঙাড়া খেতে হবে। দুপুরে হালকা গরম শিঙাড়া, রাতে বাসি। মিল রেট পড়বে ৪০ টাকার মতো। গেস্ট এলে আরও বাড়তে পারে। তোমার গেস্ট এলে তোমার মিলে উঠবে, আমার গেস্ট এলে আমার মিলে। আর শিঙাড়ার খরচ আলাদা, হিজ হিজ হুজ হুজ!

শেলি কিছুক্ষণ চুপ ছিল, তারপর কিছু না বলে চলে গেল। বুঝলাম, সে-ও জীবনযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। প্রথমে পাত্রী খুঁজে বের করে তারপর বাসা খুঁজে বের করা বেশ সময়সাপেক্ষ। তাই রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার রইল না। ঠিক করলাম রাস্তায় দাঁড়াব। ব্যাচেলরদের প্রতি বাড়িওয়ালাদের যে অন্যায়-অত্যাচার, তা রুখে দেওয়া হবে। একটা বিপ্লব না করলে আর হচ্ছে না।

আমরা প্রেসক্লাবের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াব। প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকবে—আই অ্যাম ব্যাচেলর অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেররিস্ট!

একটা স্লোগান লেখার পর বাকিরা মিলে আরও কিছু লিখে ফেললাম।
১. আমরা ব্যাচেলর! বউ চাই না, বাসা চাই!
২. পাখিরও বাসা থাকে, ব্যাচেলরদের থাকবে না কেন?
৩. বাসা দে বাড়িওয়ালা, নইলে বিল্ডিং চিবিয়ে খাব!

পরদিন মানববন্ধন। আরও অনেক নিপীড়িত ব্যাচেলর মানববন্ধনে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। শান্তিমতো মানববন্ধন করতে না দিলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার কথাবার্তা চলছে। রক্তে একধরনের জোশ এসেছে। প্রতিবাদ হবেই। আন্দোলন হবে প্রয়োজনে। এ বিষয়ে বিবাহিত জ্ঞানী বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য ফোন করলাম। সব শুনে সে বলল, ‘সবকিছু ঠিকই আছে, তবে সাবধান! পুলিশ খেপলে তোদের আর কষ্ট করে থাকার জায়গা খুঁজতে হবে না।’

ফোনটা রেখে দিলাম। বন্ধু কী বলতে চেয়েছে, বুঝতে পেরেছি। আসলে সে আমাকে বিরাট একটা ব্যাচেলর বাসার সন্ধান দিয়েছে। এটাই একমাত্র জায়গা, যেখানে ব্যাচেলরদের তাড়িয়ে দেবে না। যদিও থাকার জায়গা হিসেবে জেলখানা খুব একটা ভালো নয়, তবু এই খারাপ সময়ে এটা বেশ কাজে দেবে! এতজন ব্যাচেলর একসঙ্গে থাকতে পারবে, এটাই তো বিরাট ব্যাপার। অতএব আন্দোলন ঠিকভাবে করতে হবে। যাই, প্রথমে একটা ফেসবুক ইভেন্ট খুলি, ইভেন্টের নাম—আই অ্যাম ব্যাচেলর অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেররিস্ট!






মন্তব্য চালু নেই