মেইন ম্যেনু

“আম্মু আমি আর দুষ্টামি করবো না, তুমি ফিরে এসো”

ছোটবেলা থেকেই খানিকটা উচ্ছল আর দূরন্ত প্রকৃতির ১১ বছরের শিশু তানজিলুর হক লিপ্টন। তাকে কোচিংয়ে পৌঁছে দেয়ার সময় মাথায় হাত বুলিয়ে মা কুসুম আক্তার বলেছিলেন, যাও, দুষ্টামি করবেনা। তারপর ছেলের অপেক্ষায় কোচিং সেন্টারের নিচে বসেছিলেন মা।

মাত্র দেড় ঘণ্টার মাথায় ছেলে শুনতে পান, তার মা আর পৃথিবীতে নেই। সর্বনাশা দেয়াল ভেঙ্গে মাত্র ১১ বছরে লিপ্টনকে এবং পাঁচ বছর বয়সে তাসনিমা আক্তার সামিয়াকে মা হারা হতে হয়েছে।

মায়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর বাবার বুকে মুখ গুঁজে রেখেছিল সামিয়া। মাঝে মাঝে শুধু অস্ফূট কণ্ঠে মা, মা বলে ডাকছিল। আর লিপ্টন কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘আর দুষ্টামি করবোনা, তুমি ফিরে এসো মা।’

দুই শিশুর মা হারানোর আবেগ সংক্রমিত হয় আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শির মধ্যেও। লিপ্টনদের বাসায় তখন কান্নার রোল।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল সোয়া ১০টার দিকে নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ি রেলগেইট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। বৃষ্টিতে রেলওয়ের সীমানা দেয়াল ভেঙ্গে ইটের স্তূপের নিচে পড়ে মারা যান কুসুম আক্তার (৪০) ও সুধীর চক্রবর্তী (৩৫) নামে দু’জন।

কুসুম নগরীর পশ্চিম মাদারবাড়ির যুগী চাঁদ রোডের ওলা পুকুর পাড়ের বাসিন্দা জনৈক মনিরুল হকের স্ত্রী। মনিরুল নগরীর আগ্রাবাদে টেক্সোডাইস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি বায়িং হাউজে কর্মরত আছেন।

কুসুম সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ছেলেকে নিয়ে পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় কলেজিয়েট সরকারি স্কুলের শিক্ষক আবছার উদ্দিন ও আশীষ কুমার শীলের কোচিংয়ে আসেন। ছেলেকে নিরিবিলি হোটেলের পাঁচতলায় কোচিংয়ে দিয়ে তিনি নিচে বসেছিলেন। হঠাৎ দেয়াল ভেঙ্গে তার উপর পড়ে। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

ছেলে লিপ্টন বলেন, নিচে হইচই শুনেছিলাম। আম্মা মারা গেছে একথা আমি জানতাম না। পরে কয়েকজন আংকেল গিয়ে আমাকে বের করে বাসায় নিয়ে আসে।

কাঁদতে কাঁদতে লিপ্টন বলেন, আমি স্কুলে গেলে দুষ্টামি করতাম না। বাসায় দুষ্টামি করতাম। মা বলত, দুষ্টামি করিসনা। সকালে কোচিংয়ে দেয়ার সময়ও দুষ্টামি না করতে বলেছিল।

‘মা, তুমি ফিরে এসো মা, আমি আর দুষ্টামি করবোনা। আমাকে কে কোচিংয়ে নিয়ে যাবে মা’ এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে লিপ্টন।

লিপ্টনের বাবা মনিরুল হক বলেন, বৃষ্টি দেখে কোচিংয়ে না যাবার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু তার মা রাজি হয়নি। এতদিন পরীক্ষার জন্য যেতে পারেনি, স্যার বকা দেবে এসব বলে ছেলেকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সেই বাসায় আর তার আসা হলনা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনিরুল বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। দুই অবুঝ সন্তান নিয়ে আমি কিভাবে বাঁচব?

২০০১ সালে নগরীর অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা কুসুমকে বিয়ে করেন মনিরুল। ছেলে লিপ্টন স্থানীয় খাজা আজমেরি কিন্ডারগার্টেন এন্ড হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। মেয়ে সামিয়াও একই স্কুলের প্লে গ্রুপের ছাত্রী।

১৫ বছরের সংসারে কখনও কুসুমের সঙ্গে তার ঝগড়া পর্যন্ত হয়নি। সংসার আর স্বামী-সন্তানদের প্রতি কুসুমের অসম্ভব মনযোগ ছিল বলে জানান মনিরুল।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সন্তানদের কিভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবে, সবসময় সেই চিন্তা করত। মানুষ আর করা হলো না। সন্তানদের আমার উপর দিয়ে সে চলে গেছে।

‘সামনে ঈদ, তাকে ছাড়া আমরা কিভাবে ঈদ করব, দুই সন্তানকে আমি কিভাবে বুঝাব?’ কাঁদতে কাঁদতে বলেন মনিরুল।

কুসুমের মৃত্যুসংবাদ শুনে এলাকায়ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এলাকার লোকজন দলে দলে এসে তাদের বাসায় ভিড় জমায়।






মন্তব্য চালু নেই