মেইন ম্যেনু

রেজিস্ট্রেশন জটিলতা

আল্লাহর ঘরে যাওয়া হলো না ১৫০০ হজযাত্রীর

‘মৃত্যুর আগে অন্তত একবার আল্লাহর ঘরে যাবো, সালাম জানাবো নবীজির রওজায়। সেই স্বপ্ন নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটছিল। হজে যাওয়ার সব প্রস্তুতিও শেষ করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এবার আমার হজে যাওয়া হচ্ছে না, আর ক’দিন বাঁচবো, আর কখনো যাওয়া হবে কি না তাও জানি না।’

রেজিস্ট্রেশন জটিলতায় চট্টগ্রাম থেকে হজে যেতে না পারা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর নুরুল হুদা এভাবেই নিজের হতাশার কথা জানান। প্রফেসর নুরুল হুদার মতো রেজিস্ট্রেশন জটিলতায় এবার চট্টগ্রাম থেকে হজে যেতে পারছেন না প্রায় ১৫শ হজযাত্রী।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক এই চেয়ারম্যান জানান, নগরীর মুরাদপুরের আল-সাফা এয়ার ট্রাভেলের অধীনে এবার তার হজে যাওয়ার কথা ছিল। মুয়াল্লিমের টাকাও দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষ থেকে সরকার নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন পূরণ করতে না পারায় এবার তার হজে যাওয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল-সাফা এয়ার ট্রাভেলের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুর রহিম বলেন, ‘ইতোপূর্বে মোয়াল্লেম ফি জমা দিয়ে হাজিদের রেজিস্ট্রেশন করানো হতো। কিন্তু এবার আকষ্মিকভাবে ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মিজানুর রহমান সাক্ষরিত এক পত্রে গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম শুরু হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়। অথচ ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে রেজিস্ট্রেশনের কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে বলে জানতে পারি। ফলে আমার এজেন্সির অধীনে ৪৮ হাজির কারও এবার হজে যাওয়া হচ্ছে না।’

আরেক ভূক্তভোগী মাওলানা নুরুল আলম মুনিরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে সোমবার প্রথম হজ ফ্লাইট ছেড়ে যাচ্ছে, অথচ আমার যাওয়া হচ্ছে না। জীবনে এমন কষ্টের দিন আমার আর কখনো আসেনি। হজের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন ছেলেখেলা হতে পারে, তা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না!’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশ’ (হাব) চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান হাজী আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্য মতে চট্টগ্রাম থেকে এবার ১২০০ জন হজে যেতে পারছেন না। এর মধ্যে পাঁচটি এজেন্সি তাদের কোনো হাজির রেজিস্ট্রেশন করাতে পারেনি। এজেন্সিগুলো হলো- এয়ার চ্যানেল ট্রাভেল এজেন্সি, ইউনাইটেড হজ গ্রুপ, আল কুদ্দুস ইন্টার ন্যাশনাল, রিফা ট্রাভেল এজেন্সি ও নিশান এয়ার ট্রাভেল।’ তবে এর বাইরেও আরো কয়েকটি এজেন্সি রয়েছে বলে জানা গেছে।

তিনি আরো জানান, র্নিদিষ্ট সময়ের আগে রেজিস্ট্রেশন কোটা পূরণ হয়ে যাওয়ায় কিছু এজেন্সি তাদের যাত্রীদের রেজিস্ট্রেশন করাতে পারেনি। হাবের চেষ্টায় সরকারের পক্ষ থেকে কোটা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ নেয় হয়েছিল। কিন্তু সৌদি সরকার বিষয়টি অনুমোদন না করায় তা সম্ভব হয়নি।

হজযাত্রী কল্যাণ সংস্থার তথ্য মতে, এবার অপরিকল্পিত রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের কারণে চট্টগ্রামের ৩৫টি হজ এজেন্সির প্রায় ১৫শ হজযাত্রী সৌদি আরবে যেতে পারছেন না।

হজযাত্রী কল্যাণ সংস্থা চেয়ারম্যান এইচএম মুজিবুল হক শুক্কুর বলেন, ‘১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর ২০ ফেব্রুয়ারি ছিল শুক্রবার এবং পরেরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। অথচ ২২ ফেব্রুয়ারি এজেন্সি মালিকরা অফিসে এসে জানতে পারেন বেসরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৯১ হাজার ৭৫৮টি কোটার সবই পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সারাদেশের ৩৫০টি এজেন্টের অধীনে নিবন্ধিত ২০ হাজার হজযাত্রী রেজিস্ট্রেশন থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ মোয়াল্লেমদের ড্রাফট জমা দেয়ার শেষ সময়সীমা ছিল ১ মার্চ।’

নগরীর চকবাজার এলাকার আল-হেরা হজ গ্রুপের স্বত্ত্বাধিকারী মোরশেদুল আলম জানান, এবার তার প্রতিষ্ঠানের অধীনে ৭০ হজযাত্রীর হজে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সবার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে না পারায় ২০ জন যেতে পারছেন না। অথচ ইতোমধ্যে সৌদি আরবে ৭০ জন হাজির জন্য ঘর ভাড়া ও খাবারের জন্য টাকা পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এতে তার প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকশান গুণতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে এই সঙ্কট নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৫ হাজার ভুয়া হজযাত্রীর সন্ধান পেয়েছে। যার মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ হজযাত্রীকে পর পর তিনবার পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য পাঠালেও তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এই রেজিস্ট্রেশন সঙ্কট মূলত কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু কিছু এজেন্সি ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত হজযাত্রী রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। তারা এখন রিপ্লেসমেন্ট বাণিজ্যে নেমেছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও এজেন্সি মালিকের জোগসাজশে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে এই রিপ্লেসমেন্ট বাণিজ্য চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার রাত ৯টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ৪১৭ যাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।






মন্তব্য চালু নেই