মেইন ম্যেনু

আসলেই কি ‘মা’ ভালবাসা পাচ্ছে?

কবি কাজী কাদের নেওয়াজ নেওয়াজের মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভূবনে নাই। কবির এ কথা চিরসত্য হয়ে আমাদের কাছে প্রতিমুহূর্তে উপস্থিত হয়। নাড়িছেঁড়া বন্ধন অটুট রাখতে তাই সদাস্বচেষ্ট আমরা। বছরের প্রতিটি দিনই মাকে ভালোবাসার হলেও ঘটা করে মায়ের প্রতি প্রেম-ভালোবাসা জানাতে পালন করা হয় ‘মা দিবস’।

পৃথিবীর বেশিরভাগ ভাষাভাষী মানুষ প্রায় একই রকম উচ্চারণে, ‘ম’ ধ্বনিতে তার গর্ভধারিণীকে ডেকে থাকেন। ধর্মীয় বা সামাজিক বা ব্যক্তিবিশেষে মানুষ মাকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আসন। মা হচ্ছেন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী- যিনি গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন। তিনিই অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। মা, মা এবং মা।

শুধু প্রিয় শব্দই নয়, প্রিয় বচনও মা। প্রিয় অনুভূতি মা। প্রিয় ব্যক্তি মা। প্রিয় রান্না মা। প্রিয় আদর মা। প্রিয় স্মৃতি মা। সব প্রিয়র সমন্বয় মা শব্দের মধ্যে। মানুষের সব প্রিয়ই মাকে নিয়ে।

পৃথিবীতে মা একমাত্র ব্যক্তি, যিনি তার সন্তানকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসেন। শুধু মানব সমাজে নয়, পশু-পাখির মধ্যেও আছে মায়ের মমতা। মায়ের ভালোবাসা। সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা। মা মাকড়সার মৃত্যুই হয় তার সন্তানের খাদ্য হয়ে।

দুনিয়ার নানা প্রান্তে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।

মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য, মাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া। যে মা জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, তাকে শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য দিবসটি পালন করা হয়। তবে শুধু বিশেষ দিন নয়; মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রতিটি দিনের। প্রতিটি ক্ষণের। মায়ের জন্য বিশেষ দিন থাকার দরকার আছে কি-না তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে, একটি বিশেষ দিনে না হয়, মাকে একটু বেশিই ভালোবাসি। যারা আজও বলেননি, মা তোমাকে ভালোবাসি, তারা না হয় আজ মাকে ভালোবাসার কথাটি মুখ ফুটে বলুন।

বর্তমানে প্রচলিত মা দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে। শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক স্কুলশিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবলেন। তার সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগে ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা যান।

তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু,

যে মায়ের জন্য এই দিবসটি পালিত হচ্ছে, আসলেই কি দেশে মায়েরা সন্তানের দ্বারা সেই ভালবাসা বা অধিকার পাচ্ছে? প্রশ্নটি থেকেই যায়। যদি সেই ভালবাসা পেয়েই থাকে তাহলে আজ সারা বিশ্বে কেন বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন?

শাহেদা বেগম এবং হযরত আলীও তাদের জীবন ভালোই চলছিল। হযরত আলী এমএলএসএস পদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরি করতেন। সাত-আট বছর আগে অবসরে গেছেন তিনি। অবসরে যা পেয়েছিলেন তা সব তিন ছেলের পেছনে ব্যয় করেছেন।

বড় ছেলে মো. সেলিম একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। মেজ ছেলে মো. শামীম বাসচালক। ছোট ছেলে মো. শাহীন ব্যবসা করেন। কেউই বাবা-মায়ের খোঁজ রাখেন না। ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এরপরই যার যার মতো করে আলাদা হয়ে চলে গেছেন। আর খোঁজ নেন না মা-বাবার। অসহায় মা-বাবা কোথায় থাকবেন? কি খাবেন? সেই খোঁজ আর রাখেন না তিন সন্তান।

বাধ্য হয়ে ঢাকার নিম্ন আদালতে ভরণপোষণের দাবি জানিয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন এই দম্পতি। তবে তাতেও মেলেনি ভাত। মামলা চলছে দেড় বছর ধরে; কিন্তু ভরণপোষণ তারা পাচ্ছেন না।এটি শুধু একটি ঘটনা। ২০১৩ সালে বাবা-মায়ের ভরণ পোষণের আইন পাস হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন আদালতে এরকম অনেক মা-বাবা মামলা করেছেন।

একই বছর এপ্রিলে চাঁদপুরের আদালতে পুত্র ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। শাহরাস্তির আলীপুর গ্রামের বৃদ্ধ মিন্নত আলী মামলায় অভিযোগ করেন, তিনি এবং তার স্ত্রী শামছুন্নাহার দম্পতি প্রায় ৫০ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি ও ফেরি করে ১ ছেলে ও ৪ মেয়েকে লালন-পালন করে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ছেলে নুরুল আমীন প্রতিষ্ঠিত হয়ে উল্টো তাদেরই ভিটেমাটি ছাড়া করেছেন। এরপর মিন্নত আলী আদালতে মামলা করেন।

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন:

মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে সন্তানের বসবাস বাধ্যতামূলক করার বিধান করে সরকার ২০১৩ সালে এ আইন

পাস করে। আইনের ৩ নং ধারায় বলা হয়, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মা-বাবার একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবে।

তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনও বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। তা ছাড়া সন্তান তার মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন।

মা-বাবাকে ভরণপোষণ না দিলে জেল-জরিমানার বিধান রেখে ২০১৩ সালে সরকার এ আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ইসলামী শরিয়তে পিতা-মাতার অধিকার:

প্রত্যোক সন্তনের দায়িত্ব তার পিতা-মাতা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সাথে ভালো ব্যাবহার করা, তাদেরকে কষ্ট না দেওয়া। পিতা-মাতা যদি গরীব হয় তাহলে তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়া।

আরা তাদের মৃত্যুর পরে দায়িত্ব হলো পিতা-মাতার দাফন করা, ঋণ থাকলে তা পরিষধ করা, পিতা-মাতার অত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।






মন্তব্য চালু নেই