মেইন ম্যেনু

আসাদের ভাগ্য কি গাদ্দাফি-সাদ্দামের মতো হতে যাচ্ছে?

যখনই রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে তারা সিরিয়া ছাড়ছে, বলতে হয় তখনই শুরু হয়ে গেছে প্রেেিসডন্ট বাশার-আল আসাদের বিদায়ের প্রহর গোনা। ইরান ছাড়া আর যে বড় শক্তি আসাদকে সমর্থন করে যাচ্ছিল, সেটি হলো রাশিয়া। তারা সামরিক রসদ ও সরঞ্জামের থলে-বোচকা গুছিয়ে ফেরা শুরু করেছে। তো আসাদকে এখন কে রক্ষা করবে?

বাশার আল-আসাদের দশ দিগন্ত এখন শুধু শত্রু আর শত্রুতায় ভরা। সামরিক বাহিনী ছাড়া আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, লেবাননের হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় আসাদের হয়ে যুদ্ধ করছে। কিন্তু তাদের আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আওতায় তারা। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধানী যে সামরিক জোট বিমান হামলা চালিয়েছে যাচ্ছে, এখন থেকে হিজবুল্লাহও তার টার্গেট হবে। তবে আসাদকে বাঁচবে কে?

মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র আরব দেশ ইরাক, যারা বাশার সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এখন ইরাকের নিজের গলায়ই পানি নেই। আসাদকে পাহারা দেবে কি করে? ২০০৩ সাল থেকে জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছে ইরাক। কাউকে কিছু দেওয়ার মতো শক্তি ও সাহস তাদের নেই। আর যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না আসাদ আর প্রেসিডেন্ট থাকুক, সেখানে ইরাকের কিইবা বলার থাকে।

লৌহমানব সাদ্দাম হুসাইন ইরাকের ক্ষমতায় থাকাকালীন সিরিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলার বিরোধিতা করেছিল সিরিয়া। ইরাক ও সিরিয়ায় কুর্দি অসন্তোষ, সুন্নি বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ার জন্য তৎকালীন বুশ প্রশাসনকে দায়ী করেন বাশার আল-আসাদ। বিষয়টি পরে বাশারের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

২০০০ সালে বাবা হাফেজ আল-আসাদ মারা যাওয়ার পর বাবার স্থলাভিষিক্ত হন বাশার আল-আসাদ। ক্ষমতা নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালোই সম্পর্ক ছিল আসাদ পরিবারের। আসাদ ও তার স্ত্রী আসমা আসাদ মিলে সিরিয়ায় গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়, যখন প্রভাবশালী কয়েকজন গণতন্ত্রপন্থি নেতাকে বন্দি করা হয় এবং কয়েকজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

২০০৯ সালে এসে কাতার ও তুরস্কের মধ্যে পাইপলাইন স্থাপনের কঠোর বিরোধিতা করেন আসাদ। সেই থেকে এ দুই দেশের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক ভালো নেই। সিরিয়ায় পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক ও কাতার আসাদের বিরোধিতা করেছে, তার পতনের জন্য সামরিক আয়োজনে অংশ নিয়েছে।

সিরিয়া তো হঠাৎ করেই আগুনমুখো হয়ে ওঠেনি। সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে সিরীয় সুন্নিরা প্রায় চার দশক আগে যখন হাফেজ আল-আসাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন থেকে সক্রিয় ছিল। ১৯৭০ সালে হাফেজ আল-আসাদ সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭১ সালে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তারপর একহাতে দেশ চালাতে গিয়ে সংঘটিত সুন্নিদের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহের মুখে পড়েন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সিরিয়ায় বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সিরীয় শাখা।

সিরিয়ায় ব্রাদারহুডের দাপট কমে যায়। কিন্তু ছোট ছোট অসংখ্য সুন্নি গোষ্ঠী যারা আধাসামরিক বাহিনী পরিচালনা করে, তারা আরো সংগঠিত হতে থাকে। ব্রাদারহুডের পরিবর্তে সিরিয়ায় গোপন তৎপরতা শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আল-কায়েদা। আল-নুসরাসহ বেশ কিছু সশস্ত্র সংগঠন সিরিয়ায় সরকারবিরোধী তৎপরতা শুরু করে, যারা সরাসরি আল-কায়েদার শাখা। এ ধরনের অসংখ্য গোষ্ঠী এখন সিরিয়ার ছোট ছোট এলাকা দখল করে যে যার মতো স্বেচ্ছাচারিতা চালাচ্ছে।

২০১১ সাল বাশার আল-আসাদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কার বছর। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আরব বসন্তের ঢেউ লাগে সিরিয়ায়। তিউনিসিয়ায় ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া আরব বসন্ত মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আরব দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। একনায়ক, রাজতন্ত্র ও স্বৈরশাসকদের বিদায়ের মন্ত্রে উজ্জীবিত আরব বসন্ত সিরিয়ায় আত্মপ্রকাশ করে বিক্ষোভের মধ্যে। কিন্তু সেই বিক্ষোভ সরকারের দমন-পীড়নে রক্তাক্ত আন্দোলনে রূপ নেয়। রক্তপাতের ধারা বন্ধ করতে পারেননি বাশার আল আসাদ। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ২০১২ সালে জাতিসংঘ এ প্রতিবেদনে বলে, সিরিয়ায় যা হচ্ছে তার ধরন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘর্ষ। যার একদিকে আছে সরকারপন্থি আলাউইত সম্প্রদায়, আলাউইতনিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনী, মিলিশিয়া এবং শিয়া গোষ্ঠীগুলো। অন্যদিকে রয়েছে সরকারবিরোধী সুন্নি সম্প্রদায়। পরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘর্ষে ঢুকে পড়ে আল-কায়েদা। বিক্ষোভের বদলে গাড়িবোমা হামলা, আত্মঘাতী হামলা শুরু হয়। সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে পরিস্থিতি আরো বৈরী হয়ে যায়।

এ মুহূর্তে বাশার আল-আসাদের কয়েক হাজার সেনা ছাড়া কারো সমর্থন নেই। ওদিকে ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে হঠাৎ আবির্ভূত হয় ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠী। এরা আল-কায়েদার চেয়ে ভয়ংকর। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ইরাক সরকারের ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগ নিয়ে দুই দেশের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়ে খেলাফত ঘোষণা করে। আইএস কৌশলগতভাবে সিরিয়া সরকার ও বিরোধীদের শত্রু। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভয়াবহ রক্তপাত ঘটিয়ে চলেছে আইএস।

সিরিয়ায় আইএসের উত্থানের আগে আসাদ বিদ্রোহ দমনে সফলতা-ব্যর্থতার মধ্যে ছিলেন। ওই পর্যন্ত সিরিয়া সরকারের পেছনে কিছু আন্তর্জাতিক শক্তি ছিল। কিন্তু তার বিরোধিতাকারীদের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের অঘোষিত মোড়ল আসাদের ঘোর বিরোধী। সুন্নিপন্থিদের ক্ষমতায় নেওয়ার পক্ষে সৌদি রাজপরিবার। আসাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে মোটা অঙ্কের অর্থ ও বিপুল পরিমাণে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে সৌদি আরব। যদিও এ অভিযোগ তারা অস্বীকার করে। সৌদি আরবের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোও আসাদের বিরোধিতা করে। সে সময় সিরিয়ার পাশে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অ-আরব দেশ শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান। সিরিয়ায় তখন ইরান ও সৌদি আরব প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

জাতিসংঘ অভিযোগ তোলে সিরিয়া সরকার বেসামরিক লোক ও বিরোধীদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এ নিয়ে শুরু হয় চরম টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলার হুমকি দেয়। এই মুহূর্তে দৃশ্যপটে আসাদের পক্ষে গলা তোলেন রুশ ফেডারেশনের অধিকর্তা ভøাদিমির পুতিন। রাশিয়ার একান্ত বিরোধিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলায় যায়নি। সিরিয়ার সব রাসায়নিক মজুদ ধ্বংস করা হয় রাশিয়ার ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়। সে যাত্রায় সিরিয়া আক্রমণ না করলেও প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিদায়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র একচুলও নড়েনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা কয়েকবার বলেছেন, আসাদের সময় শেষ। জন কেরি সেই কথা বার বার বলে যাচ্ছেন এবং এখনো বলছেন, সিরিয়ায় বাশারের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাকে বিদায় নিতেই হবে।

সিরিয়ার পাশে তবে থাকছে কে? সোমবার এক ঘোষণায় পুতিন বলেছেন, সিরিয়ায় তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে। কী সেই উদ্দেশ্য তা তিনি বলেননি। না সে দেশ থেকে আইএস বিদায় নিয়েছে, না আসাদ সরকার স্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। তবে রাশিয়ার উদ্দেশ্য পূর্ণ হলো কী করে- আল্লাহ মালুম!

পোড়া মাটি, বধ্যভূমি, ধ্বংসস্তূপ ছাড়া সিরিয়ায় এখন আছেই কি? লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস গত মাসে তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১১ এ পর্যন্ত সিরিয়ায় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬৬ হাজার লোক নিহত হয়েছে। সিরিয়া সেন্টার ফর পলিসি রিচার্স নামে একটি সংস্থা জানিয়েছে, একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ৪ লাখের বেশি। জাতিসংঘের মতে তা আড়াই লাখের বেশি। আর দেশের ভেতরে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে প্রায় ৭৬ লাখ মানুষ। দেশের বাইরে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশন ২০১৫ সালের জুলাই মাসে জানায়, বিদেশে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি।

এই সিরিয়া নিয়ে আসাদ এখন কোথায় যাবেন? তাকে কে সাহায্য করবে? কী হবে তার ভাগ্যে? লিবিয়ার লৌহমানব মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও ইরাকের লৌহমানব সাদ্দাম হুসাইনের মতো পরিণতি হতে যাচ্ছে কি তার? রাশিয়া কি আসাদকে সেই বার্তা দিয়ে দিল?

আসাদের নিয়ন্ত্রণে আছে সিরিয়ার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভূভাগ। তবে এই ভূভাগে সিরিয়ার ৬০ শতাংশ লোক বাস করে। আইএসের হাতে চলে গেছে ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ। আল-নুসরাসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে আছে ২০ শতাংশের মতো অঞ্চল। আর কুর্দিদের দখলে আছে ১১ থেকে ১২ শতাংশ ভূ-অঞ্চল। এখন সিরিয়ায় আসাদের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি?

সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, সিরিয়ায় আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। পশ্চিমা বিশ্বে নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাঁসা রাশিয়া রাশিয়ার হয়তো দম ফুরিয়ে এসেছে। যুদ্ধের মতো বিশাল ব্যয়বহুল খাতে অর্থের জোগান প্রধান বিষয়। আসাদ কি রাশিয়াকে প্রয়োজনীয় বা প্রতিশ্রুত অর্থ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে- যে কারণে পুতিন নাটাই গোটানো শুরু করেছেন? না কি পশ্চিমাদের সঙ্গে কোনো রফা হয়েছে তার? পুতিনের যা-ই হোক না কেন- সিরিয়া থেকে সেনা ও যুদ্ধসরঞ্জাম প্রত্যাহার করে নেওয়া মানে আসাদের জন্য অশনিসংকেত, বিদায়ের পূর্বাভাস। রাশিয়া ছাড়া আসাদের একার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবু বলতে হয়, বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করে শেষ হাসি কে হাসবে?






মন্তব্য চালু নেই