মেইন ম্যেনু

ইংরেজির আধিপত্যে বিজ্ঞানের ক্ষয়

ভাষার সাথে মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টির আদি থেকে। মানুষের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সে কথা বলা প্রাণী। অন্য অনেক প্রাণীরও ভাষা আছে, তবে সেটা মানুষের মত এরকম সুগঠিত ভাষা নয়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ভাষাই হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষের অনেক ভাষাই রাজত্ব করে গেছে পৃথিবীতে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীতে ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডে ভাগ হয়ে বসবাস করতেন। কারো সাথে কারো যোগাযোগ ছিল না। যে কারণে জাতিভেদে ভাষা ছিল ভিন্ন। তারপর একসময় এই ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। স্বভাববশত তারা চেয়েছে একে অন্যকে দমিয়ে উপরে থাকতে। যে জাতি যখন রাজত্ব করেছে তখন আসলে তাদের ভাষা রাজত্ব করেছে। যেমন গ্রিক, ল্যাটিন, আরবি, ফারসি থেকে শুরু করে আরও অনেক ভাষা এসেছে এই রাজত্যে। আবার হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে। বিগত প্রায় পাঁচ-ছয়শো বছর যাবত পৃথিবীতে রাজত্ব করছে ইংরেজি ভাষা। বিশ্বব্যাপী ইংরেজ জাতির আধিপত্যের সাথে উত্থান হয়েছিল এই ভাষার। আজকে মানুষের যে বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সেটা কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হয়নি। মানুষ সেই জ্ঞান সংরক্ষণ করেছে, রূপান্তর করেছে বিভিন্ন ভাষায়। অন্য কথায় বলতে গেলে জ্ঞান যার হাতে ছিল, ক্ষমতা ছিল তার হাতে। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে দৌরাত্ব করছে ইংরেজি ভাষা। উচ্চ শিক্ষা এবং গবেষণার সমস্ত তত্ত্ব এখন ইংরেজি ভাষায়। প্রশ্ন হচ্ছে, ইংরেজির এই আধিপত্যের কারণে অন্য ভাষাভাষীর মানুষেরা কি জ্ঞান সঞ্চয়ের বদলে জ্ঞান হারাচ্ছে?

বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক একাডেমিক বৈঠক কিংবা আলোচনা সভার বেশিরভাগই আয়োজিত হয় ইংরেজিতে। যারাই কোনো বিষয়ে গবেষণা করতে চাইবে ইংরেজি ছাড়া গত্যন্তর নাই। সেটা লেখাই হোক, পড়াই হোক কিংবা অন্যকে শেখানোই হোক না কেন। কারণ তাতে করে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ সহজে সহযোগিতা করতে পারছে। কিন্তু তাতে করে এই ফাঁকে অন্য কিছু কি অগোচরে হারিয়ে যাচ্ছে? ইংরেজি না জানা অনেক জ্ঞানীর বিকাশ ও প্রকাশ কি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে? বিশেষ করে ইংরেজি ব্যতীত গবেষণাগুলো কি হারিয়ে যাচ্ছে না?

জার্মান শিক্ষাবিদদের মধ্যে গঠিত একটি প্রচারণা সংঘ বলছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা তখনই সবচেয়ে ভালো ভাবে হয় যখন সেটা বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে করা হয়। যে সমস্ত গবেষকদের প্রথম ভাষা ইংরেজি নয় তাদের ভেতরে সব সময়ই এরকম একটা উদ্বেগ কাজ করে যে, অ্যাংলো-আমেরিকান তত্ত্ব গ্রহণ না করলে হয়তো তাদের গবেষণা কোনো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হবে না। জার্মান ভাষাবিদ রানিয়ের এনরিকের মতে, ১৮৮০ সালে মাত্র ৩৬ শতাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হতো ইংরেজিতে, যেটা কিনা বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮০ সালে দাঁড়িয়েছিল ৬৪ শতাংশে। কিন্তু ইংরেজির বিকাশ থেমে থাকেনি। ২০০০ সাল নাগাদ এই হিসেব দাঁড়িয়েছে ৯৬ শতাংশে। অর্থাৎ পুরোটাই ইংরেজির দখলে। এই সব নামকরা ইংরেজি জার্নালে লেখা প্রকাশের সাথে জড়িত রয়েছে নামকরা সব ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয়। যার পেছনে জড়িয়ে রয়েছে গবেষণার সময় অর্থের জোগান এবং প্রার্থী বাছাইয়ের মত বিষয়গুলো । কাজেই দিনকে দিন আরও বেশি মানুষ ঝুঁকে পড়ছে ইংরেজি ভাষায় এবং এই চক্র অক্ষুণ্ণ থেকে যাচ্ছে।

ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বৃদ্ধির পেছনে আরও কারণ রয়েছে । ইউরোপ ও এশিয়ার অনেকে দেশে শিক্ষাদান করা হচ্ছে ইংরেজি কোর্সের মাধ্যমে। যেমন, নেদারল্যান্ডের মাসট্রিকট বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রীতে ৫৫টি কোর্সই হচ্ছে ইংরেজি ভাষায় এবং মাত্র ৮টি কোর্স ডাচ ভাষায়। গ্রোনিগেন বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্তৃত্ব করছে ইংরেজি ভাষা। এছাড়া ভারত এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা।

জার্মানিতে শিক্ষাবিদদের দ্বারা গঠিত এই প্রচারণা সংঘ (এডিএডব্লিউআইএস) চাচ্ছে জার্মানকে বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে সংরক্ষণ করতে। তারা ইংরেজির আধিপত্যে থাকতে চাচ্ছে না। জার্মানরা জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত জাতি। তারা চাইলে হয়তো এটা করতে পারবেন। এই সংঘের শিক্ষাবিদরা বলেছেন বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্র বিকাশিত হয়েছে যখন তাদের স্থানীয় ভাষায় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংঘের চেয়ারম্যান মোলেকুলার ইমিউনোলোজিস্ট ( অতি ক্ষুদ্র রোগ প্রতিরোধ বিদ্যা) অধ্যাপক র্যা লফ মোকিকাট বলেছেন, ব্যক্তিগত ভাষা হচ্ছে ব্যক্তি বিশেষে যুক্তি প্রদর্শনের ভিন্ন মাত্রা। ঠিক যে ভাবে অনেক লোকের তর্ক থেকে একটা উপসংহারে পৌঁছানো হয়। তিনি বলেন, ‘ইংরেজি ভাষার গবেষণাপত্রগুলোতে এই যুক্তি প্রদর্শনের আলাদা মাত্রা নেই বরং এটা অনেকটা সরল রেখার মত। কিন্তু জার্মান ব্যাকরণে রয়েছে আড়াআড়ি সম্পর্কস্থাপন ব্যবস্থা।’

মানুষ তার চিন্তা প্রকাশের জন্য ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, একইসাথে ভাষাও কিন্তু চিন্তার গঠন করে। অধ্যাপক মোকিকাট বলেন, ‘একাডেমীকরা প্রাত্যহিক কথোপকথনের কোন তর্কে কিংবা সমস্যা সমাধানে প্রায়ই মেটাফোর (রূপক) ব্যবহার করেন। কিন্তু এগুলোকে সরাসরি ইংরেজিতে অনুবাদ করা সম্ভব না। কাজেই চিন্তার গঠন সম্পন্ন হচ্ছে ভাষায়। এই কারণেই বিজ্ঞানের বিকাশে ভাষা একটা মারাত্মক ভূমিকা রাখছে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যালিলিও, নিউটন এবং লাগরেঞ্জের মত বিজ্ঞানীরা তাদের একাডেমীক ভাষা ল্যাটিন পরিত্যাগ করেছিলেন নিজ নিজ স্বদেশী ভাষার জন্য। অথচ ল্যাটিন তখন ছিল এখনকার ইংরেজির মতই সার্বজনীন একটা ভাষা। কাজেই প্রাত্যহিক ভাষা হচ্ছে বিজ্ঞানের একটা মৌলিক উৎস। যে কারণে একটি ভাষার আধিপত্য বিশ্ব বিজ্ঞানকে পিছিয়ে দিতে পারে অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের দিকে।’

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইংরেজি জার্নালে গবেষণা প্রকাশের ক্ষেত্রে একাডেমিকদের অ্যাংলো-আমেরিকান তত্ত্ব ও নিয়মের ভেতরে আটকা পড়তে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যারি জেইন কুরি এবং যুক্তরাজ্যের ওপেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেরেসা লিলিস একত্রে গবেষণা করেছেন এই বিষয়ে। তারা দেখেছেন জার্নালে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য কিভাবে দক্ষিণ ও কেন্দ্রীয় ইউরোপের গবেষণাকে প্রভাবিত করেছে। ইংরেজিকে দোররক্ষক হিসেবে রাখায় ইংরেজি তত্ত্বের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মূল গবেষণার বিষয়বস্তু বদলে গেছে।

আন্তর্জাতিক জার্নালগুলো কালে ভবিষ্যতে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার উদ্ধৃতি এবং উল্লেখ গ্রহণ করে। এটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। ভাষাবিদ উইনফ্রেড থেল্মান বলেন, ‘যারা দুর্ভাগ্যক্রমে ইংরেজিতে লেখা প্রকাশ করতে পারেন না তাদেরকে নিজের খরচে বিজ্ঞানের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হচ্ছে নিজের ভাষায়। কারণ নতুন তত্ত্বের নাম এবং সীমানা নির্ধারণ করেন মূলত মার্কিন বিজ্ঞানীরা। তারা ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা গ্রহণ করবেন কেন। শুধুমাত্র ইংরেজি না জানার কারণে আমরা অনেক জ্ঞানীকে প্রকাশ করতে পারছি না। সেই অর্থে আমরা প্রতিনিয়তই হারাচ্ছি অনেক নতুন জ্ঞান।’

একটা ভিনদেশি জার্নালের ভালো একাডেমিক ইংরেজি অনুবাদ করা ব্যয়বহুল। তাছাড়া ইংরেজি ভাষার জার্নালগুলো সেই সমস্ত লেখা প্রকাশ করে না যেটা পূর্বে অন্য ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রাজিলে প্রায় ৬ হাজার বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই পর্তুগীজ ভাষায় লেখা এবং এর মধ্যে খুব সামানই আন্তর্জাতিক জার্নালে স্বীকৃতি পেয়েছে। বেশিরভাগ জার্নালেরই ব্রাজিলের বাইরে কোনো পরিচিত নেই। তাহলে যদি ইংরেজির উত্থান আর সবার জন্য এরকম একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তার সমাধান কি? জার্নালগুলোকে বহুভাষিক করে দেয়া যেতে পারে, যেখানে একই জার্নালের কয়েক ভাষার সংস্করণ থাকবে। যেমন, বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘নেচার’ জাপানি এবং আরবি ভাষায় প্রকাশিত হয়। তাছাড়া ইউরোপের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিকাল কালচারসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে হলে ছাত্রদেরকে কমপক্ষে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে হবে দুই ভাষার উপরে।

ইংরেজি ভাষায় পরিবর্তন আনার কথাও বিবেচনা হয়েছিল বেশ কয়েকবার। বিশেষ করে জার্নাল, গ্রন্থ এবং একাডেমিক আলোচনায় এটা কীভাবে ব্যবহৃত হবে সে ব্যাপারে। ইংরেজির ধরন এবং সুর কিছুটা সাধারণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন রূপকধর্মী (মেটাফোর) ব্যবহার কমিয়ে আনা। কিন্তু মেটাফোর ইংরেজি ভাষার একটি অনন্য প্রয়োগ। এটাকে আলাদা করা মুশকিল। ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা কর্পাস প্রোজেক্ট নামে একটি প্রকল্প করেছিল যেখানে ১০ লাখ শব্দের একটা নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করা হয় শুধুমাত্র একাডেমিকদের জন্য। এটাও খুব ফলদায়ক হতে পারতো সমস্যা সমাধানের জন্য। কিংবা হয়তো একসময় এসব কোনো কিছুরই আর প্রয়োজন পড়বে না। ইংরেজি যে হারে প্রসারিত হচ্ছে তাতে পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা হয়তো সবাই ইংরেজি জানবে সহজাতভাবেই। আমরা চাইলেও এখন আর ইংরেজিকে বাদ দিতে পারছি না। এটাই বাস্তবতা এবং এটাই সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতার সাথে লড়তে হলে সবার আগে যে কাজটি করতে হবে সেটা হচ্ছে, সবাইমিলে সমস্যাটাকে স্বীকার করা।






মন্তব্য চালু নেই