মেইন ম্যেনু

ইউরোপে অভিবাসীদের আহাজারি

বৃহস্পতিবার সকালে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত একটি ছবি রীতিমতো সব খবরকে ছাপিয়ে আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছে। সিরিয়ার এক শরণার্থী শিশুর মৃতদেহ ভেসে এসে উপুড় হয়ে পড়ে আছে তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে। ছবিটি সারা দুনিয়ার সচেতন মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখনো ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

সিরিয়া, আফগানিস্তান ও আফ্রিকার কয়েকটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষকে কাঁটতারের বেড়া দিয়ে সীমান্তে আটকে রেখেছে হাঙ্গেরি। অভিবাসীরা যাতে জার্মানি কিংবা অস্ট্রিয়া যেতে না পারে সেজন্য আর্ন্তজাতিক রেলস্টেশন বন্ধ করে রেখেছে দেশটি। ফ্রান্সের কেলাসে আটকে পড়া মানুষগুলো যাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ব্রিটেন যেতে না পারে সেজন্য তাদের ওপর রীতিমতো সহিংস আচরণ করছে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী।

সীমান্তের কাঁটাতার ধরে আহাজারি করছে অভিবাসীরা। কোনো দেশ তার সীমান্ত খুলতে চাইছে না।

এতক্ষণ যা বললাম, তা হচ্ছে ঘটনার সর্বশেষ চিত্র। এবার এসব চিত্রের পেছনের দৃশ্যগুলোর দিকে তাকান যাক।

কারো এক হাতে বাক্স-পেটরা, আরেক হাতে শিশু সন্তান। আবার কেউ হুইল চেয়ারে ভাঙা পা নিয়ে বসে আছেন, রেললাইনের পাশ দিয়ে সেই চেয়ার ঠেলছে স্বজন। কোনোক্রমে সীমান্ত পর্যন্ত গেলে হয়তো হাফ ছেড়ে বাঁচা যাবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই আরেক হতাশার চিত্র। বিশাল কাঁটাতারের বেড়া। হাত-পা কাটুক সমস্য নেই, হাঁচড়েপাঁচড়ে হলেও সেই কাঁটতারের বেড়ার মধ্য দিয়ে দেহটাকে গলিয়ে দিয়ে হাঙ্গেরি প্রবেশের চেষ্টা।প্রথমে শক্তসমার্থ কেউ গিয়ে সীমান্তের কাঁটারতার কেটে পথ তৈরি করছে। তারপর যাচ্ছে ছোটরা, মা ও অন্য স্বজনরা। যারা পার হতে পারছেন, হাঙ্গেরি থেকে ইউরোপের আরো উন্নত কোনো দেশে পাড়ি দিচ্ছেন তারা। কিন্তু বুদাপেস্টের রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর আবার নতুন সমস্যা। সেখানেও বাধা। চারপাশে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী। সেই বেষ্টনীর মধ্যে ঢুকে আটকা পড়ে আছে কয়েক হাজার অভিবাসী।

স্থলভাগে আসার আগের চিত্রটি আরো ভয়ঙ্কর। রাবার কিংবা কাঠের নৌকায় গাদাগাদি করে লিবিয়া উপকূল থেকে পাড়ি জমাচ্ছে হাজার হাজার অভিবাসী। ধারণক্ষমতার চেয়ে নৌকায় বেশি মানুষ উঠছে। এসব নৌকার কোনোটি ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাচ্ছে আবার কোনোটির পাটাতনে গাদাগাদি করে থাকা মানুষ দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হয়তো গ্রীস বা ইতালির উপকূল থেকে কোনো জাহাজ গিয়ে তাদের উদ্ধার করছে।

গত কয়েক দিন ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর শিরোনাম হিসেবে উঠে এসেছে এসব খবর। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব চিত্রই দেখাচ্ছে। ইউরোপের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন চলে এসেছে অভিবাসী সংকট। তবে আলোচনার বিষয়টি টেবিলেই থেকে যাচ্ছে। হাজারো মানুষের মৃত্যুর খবরেও রীতিমতো নির্বিকার ভাব দেখাচ্ছেন অধিকাংশ পশ্চিমা নেতা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্ত পর্যবেক্ষক সংস্থা ফ্রনটেক্স জানিয়েছে, চলতি বছরে এরই মধ্যে তিন লাখ ৪০ হাজারের বেশি অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে পা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে গত বছরের প্রথম নয় মাসে ৩ হাজার ৭২ অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। ২৭ আগস্ট লিবিয়া উপকূল থেকে দূরে ভূমধ্যসাগরে ৫০০ জন ডুবে গেছে। ১৯ এপ্রিল ল্যাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে জাহাজ ডুবে অন্তত ৮০০ জন প্রাণ হারায়। ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৩০০ জন উত্তাল সাগরে ডুবে যায়। পূর্ব আফ্রিকা দিয়ে পার হতে গিয়ে অন্তত ২৫১ জন মারা গেছে। চলতি সপ্তাহে অস্ট্রিয়ায় লরির ভেতর থেকে ৭১ জন অভিবাসীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এরা সবাই ছিল সিরিয়া থেকে আসা। সবশেষ বুধবার তুরস্ক থেকে ছোট নৌকায় গ্রিসে যাওয়ার পথে ১২ জন অভিবাসনী মারা গেছে।

অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে চলতি সপ্তাহে সীমান্তে ১৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া দিতে শুরু করেছে হাঙ্গেরি। এর আগে গ্রিস থেকে আসা কয়েক হাজার অভিবাসীকে মেসিডোনিয়া সীমান্তে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সীমান্তে জড়ো হওয়া অভিবাসীদের তাড়াতে রীতিমতো লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছিল দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। তবে অভিবাসীদের অনড় অবস্থান এবং আর্ন্তজাতিক সমালোচনার মুখে সীমান্ত খুলে দেয় মেসিডোনিয়া।

সবশেষ খবর অনুযায়ী, একসঙ্গে ৫০ জন অভিবাসীকে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে হাঙ্গেরির কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর গত সপ্তাহে জানায়, আগামী মাসগুলোতে প্রতিদিন মেসিডোনিয়া সীমান্ত পাড়ি দেবে প্রায় ৩ হাজার মানুষ। আর এদের অধিকাংশই আসবে সিরিয়া থেকে।

এবার আসা যাক হাঙ্গেরি প্রসঙ্গে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রেনে করে জার্মানি ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নত দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের প্রধান রেলস্টেশনটিতে কয়েক হাজার অভিবাসী জড়ো হয়। ১০০ ইউরো খরচ করে এরা ট্রেনের টিকিটও কেনে। তবে এরা যাতে ট্রেনে উঠতে না পারে, সেজন্য মঙ্গলবার স্টেশনটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে পুরো স্টেশনটি ঘিরে রেখেছে শতাধিক পুলিশ।

অভিবাসীদের বিরুদ্ধে শুধু হাঙ্গেরিই নয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। গত মাসে ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী ক্যালিয়াস শহরে উপস্থিত হয়েছিল কয়েক হাজার অভিবাসী। ইউরো টানেল দিয়ে এসব অভিবাসী ইংল্যান্ডে যেতে চেয়েছিল। তবে তাদের ক্যালিয়াসেই আটকে দেওয়া হয়। এক সুদানি অভিবাসী পুলিশের চোখ এড়িয়ে দৌড়ে টানেল পার হওয়ার চেষ্টা করার সময় ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয়। অবস্থা দেখে ব্রিটেনের বিরোধী দল ইউকিপের এক নেতা সেখানে সেনা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ব্রিটেনে আর কোনো অভিবাসীর আশ্রয় হবে না। এমনকি যারা অভিবাসীদের আশ্রয় দেবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইন করার ঘোষণা দিয়েছে ক্যামেরন সরকার।

ব্রিটেনের অভিবাসন মন্ত্রী জেমস ব্রোকেনশায়ার গত মাসে বলেছেন, ‘কেউ যদি অবৈধভাবে এখানে আসেন, আমরা তার কাজ বন্ধ করে দেব, বাড়ি ভাড়া নেওয়া, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং গাড়ির লাইসেন্স নিতেও বাধা দেবে৷’

তিনি আরো জানিয়েছেন, ‘অবৈধভাবে কেউ ব্রিটেনে এসে চাকরি নিলে তাকে ছয়মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে, তার নিয়োগদাতারও লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’

তবে এদিক দিয়ে আশার বাণী শোনাচ্ছে জার্মানি। বুধবার দেশটিতে প্রতি ঘণ্টায় ১০০ জনেরও বেশি অভিবাসী প্রবেশ করেছে। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ঘণ্টায় গড়ে ১০৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে নিবন্ধন করানো হয়েছে। ট্রেনে চড়ে এসব মানুষ মিউনিখে আসছে। গত সপ্তাহে অভিবাসীদের স্বাগত জানিয়েছে ড্রেসডেন শহরের বাসিন্দারা।

অভিবাসী সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য গত জুলাইয়ে সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে বৈঠক করেছিল। এতে ইউরোপের ২৮টি দেশের মধ্যে অভিবাসীদের ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যারকেল ইউরোপীয় নেতাদের অভিবাসী ইস্যুতে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

অভিবাসীদের নিয়ে সংকটের চিত্রটি প্রকট হওয়ায় ১৪ সেপ্টেম্বর আবারও ব্রাসেলসে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইইউভুক্ত দেশগুলো স্বরাষ্ট্র ও বিচারমন্ত্রীরা। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের বৈঠকে হয়তো অভিবাসী ইস্যুতে আশাব্যঞ্জক সমাধানে আসতে পারবেন ইইউ নেতারা।






মন্তব্য চালু নেই