মেইন ম্যেনু

ইটের গুড়োয় তৈরি ওষুধ!

সন্তান অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয় পিতামাতা। অসুস্থতা সারাতে যা যা করার দরকার তার কোনোটিই বাদ রাখা হয় না। তবু অনেক সময় প্রাণের সন্তানকে রোগমুক্তি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ডাক্তার মহোদয় দিনের পর দিন শুধু ওষুধ পাল্টাতেই থাকেন, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। একটা সময় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে না পেরে হতাশ হয়ে যায় পিতামাতা। আর এরপর যা হয়, তা একটু আন্দাজ করে নিলেই বোঝা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানটি শুধুই কি একটি পরিবারের? রাষ্ট্রের কি কোনো দায় নেই তার সন্তানদের প্রতি?

বিংশ শতাব্দীতে কেমিক্যালজাত ওষুধের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রায় প্রতিটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েই এই কেমিক্যালজাত ওষুধকে প্রমাণ হিসেবে রেখেই তবে চিকিৎসা চালানোর তরিকা নির্ধারণ করা হয়। মেডিসিন মাফিয়াদের ওষুধ বাণিজ্য হতে মুনাফার কথা বাদ দিলেও, তারা আমাদের যে ওষুধ খাওয়াচ্ছে তার কতটুকু সত্যিই ওষুধ তা নিয়ে প্রশ্ন করারও সুযোগ নেই বর্তমানে। মোড়কের মধ্যে থাকা ওষুধ আসলেই কতটুকু জীবনদায়ী, আর কতটুকু প্রাণসংহারী তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার এখনই সময়।

‘আমার মেয়ে নিউমোনিয়ায় অসুস্থ হয়েছিল। সুতরাং স্থানীয় বাজার থেকে কিছু পাউডার ওষুধ কিনে খাওয়াতে বলা হয়েছিল আমার মেয়েকে’। কথাগুলো বলছিলেন শাহজিল মাকসুদ নামের এক বাবা। বাজার থেকে ডাক্তারের বলে দেয়া ওষুধ খাওয়ানোর পরেও রোগ সারছিল না সন্তানের। উপায় না পেয়ে মাকসুদ গেলেন আরেক ডাক্তারের কাছে। সেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর তিনি মাকসুদকে পরামর্শ দিলেন আগের ওষুধ না খাওয়াতে। সেই ডাক্তার মাকসুদকে আরও জানালেন যে ওই ওষুধগুলো রোগ ভালো করার বদলে আরও খারাপ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার(ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় এক মিলিয়ন সংখ্যক মানুষ এই ওষুধ জালিয়াতির কারণে মারা যায়। ২০১২ সালে স্রেফ পাকিস্তানেই ওষুধ জালিয়াতির কারণে ১২০জন মানুষ মারা গিয়েছিল। পাকিস্তানের ওষুধ বাজারে অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে নকল পিল, ক্যাপসুল, ট্যাবলেট এবং সিরাপ। প্রায় প্রতিটি ওষুধেরই নকল পাওয়া যাচ্ছে পাকিস্তানে। আর নকল ওষুধটিও এমনভাবে মোড়ক করা যে, দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা আসল আর কোনটা নকল। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন’র এক অনুসন্ধানী ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, কিভাবে পুরাতন মর্টার এবং বিভিন্ন উপাদান থেকে গুড়ো তৈরি করা হচ্ছে ওষুধ তৈরির জন্য।

পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক এক ওষুধ কারিগর সিএনএনকে জানান যে, বাজারে নকল ওষুধের বিপুল চাহিদা থাকায় তারা যেকোনো ধরণের ওষুধই তৈরি করেন। প্রায় প্রত্যেক ক্যাপসুল বা ট্যাবলেটেই তারা একই উপাদান ব্যবহার করে। এমনকি সিরাপগুলোতেও দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন বাজে তরল পদার্থ। শুধুমাত্র সিরাপগুলোর রং পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করা হয় ভিন্ন ভিন্ন রং। এধরণের নকল ওষুধের কারখানাগুলো মূলত বাজারের কাছাকাছি কোথাও স্থাপিত হয়, যাতে পরিবহনের ঝুঁকি পোহাতে না হয়। আর প্রশাসনকে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা দিয়ে চোখ বুজিয়ে রাখা হচ্ছে।

পাকিস্তানের স্থানীয় বাজারগুলোতে ওষুধ তৈরিতে যে যে উপাদান দরকার তার সবকিছুই প্রায় পাওয়া যায়। বোতল, বক্স, বোতলের মুখ, ক্যাপসুলের খোসা থেকে শুরু করে সবকিছুই সুলভ মুল্যে পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলো এক শ্রেণির ক্রেতা নিয়ম করে কিনে নিয়ে যান এবং এগুলোকে ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে সেই ওষুধগুলোই বিভিন্ন দোকানে দোকানে সরবরাহ করা হয়। মূল ওষুধের দামের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় ওষুধ ব্যবসায়িদের পকেটে থেকে যায় বিপুল পরিমান মুনাফা।

জাবেধ ইকবাল নামের এক ওষুধ বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। তিনি ওই নকল ওষুধ বিক্রি করেন কিন্তু তিনি জানেন না ওই ওষুধগুলোর মধ্যে ঠিক কি দেয়া হচ্ছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন বাজার থেকে কেনা ওষুধ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সকল ওষুধগুলোর মধ্যে দেয়া উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইদুর মারা বিষ, ইটের গুড়ো, ধুলো এবং রংসহ বিভিন্ন উপাদান।

২০১০ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক জাতীয় সংসদে এক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন যে, পাকিস্তানে ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশই নকল। ওই বক্তব্যের পর পাকিস্তান সরকার ‘ড্রাগ রেগুল্যাটরি অথরিটি অব পাকিস্তান’ নামে একটি কমিশন গঠন করে। নকল ওষুধ চক্র ধ্বংস করে দেয়ার জন্য এই কমিশনের জন্ম হয়। কিন্তু তারপরেও কমেনি নকল ওষুধের ব্যবসা। পাকিস্তানের ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তথ্য মোতাবেক, গোটা দেশে লাইসেন্সধারী ফার্মাসির সংখ্যা চার হাজার। অথচ অবৈধ উপায়ে প্রায় এক লাখ ফার্মেসি নিয়মিত ওষুধ বিক্রি করে যাচ্ছে।






মন্তব্য চালু নেই