মেইন ম্যেনু

ইসলামী ছাত্রী সংস্থা নিষিদ্ধের পথে

নারীদের মাঝে জঙ্গিবাদ বিস্তারের দায়ে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংগঠনটির কর্মীরা কোমলমতি ছাত্রী ও সরলমনা ধর্মভীরু মহিলাদের জিহাদে অংশগ্রহণের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছে এমন প্রমাণ সরকারের হাতে পৌঁছেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় চিঠি দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধী নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামীর প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজও বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হুসাইন শুক্রবার বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রী সংস্থা এবং একটি ইসলামিক স্কুলের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বন্ধের কাজটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করাব।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা (নিষিদ্ধ করা) আমাদের মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটা রাজনৈতিকভাবে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

ইসলামী ছাত্রী সংস্থা জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রী ফ্রন্ট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশে এই সংগঠনটি দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের মাঝে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী। গুলশান, মেরুল বাড্ডাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই স্কুলের শাখা আছে। শুক্রবার শামসুন্নাহার নিজামীসহ ছাত্রী সংস্থার ৫ নেতাকর্মীকে ওই স্কুলেরই মেরুল বাড্ডা শাখা থেকে আটক করা হয়েছে। এর আগে ২৩ ও ২৪ জুলাই রাজধানীর ইডেন কলেজ থেকে জঙ্গি সন্দেহে ছাত্রী সংস্থার ৫ জনকে গ্রেফতার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ছাত্রী সংস্থা এবং আইআইএসসি’র ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে ছাত্রী সংস্থা কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যে চিঠি দেয়ার কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ের চারটি অধিশাখা থেকে দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দেয়া হবে।

এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) হেলালউদ্দিন শুক্রবার বলেন, ‘ছাত্রী সংস্থার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গ্রহণসহ সব বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আমরা চিঠি পাঠাক। এছাড়া ইতিমধ্যেই সার্বিক জঙ্গিবাদের ব্যাপারে প্রক্টরিয়াল বডিকে সতর্ক রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ এদিকে মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজও (আইআইএসসি) বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ঢাকা বোর্ডে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাতে এই স্কুল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই স্কুলটির ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন জমা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রায় ১০-১২ বছর আগে শামসুন্নাহার নিজামী আইআইএসসি প্রতিষ্ঠা করেন। গুলশানের ১ নম্বর সার্কেলে ৯ নম্বর সড়কের ১৮ নম্বর বাড়িতে এর কার্যক্রম শুরু হয়। একই এলাকার ১৫ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়িতে স্কুলের ছাত্রী শাখা আছে। পরবর্তীকালে মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টে ৮ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি শাখা খোলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শামসুন্নাহার নিজামী স্কুলটিতে নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রায় সবাই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। বর্তমান সরকারের সময়ে গুলশানের মতো কূটনৈতিক এলাকায় জামায়াত-শিবিরের পরিচালিত স্কুলের অনুমোদন দেয়া এবং তা অব্যাহতভাবে পরিচালনার বিষয়টি জনমনে সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) জাকির হোসেন ভূঞা শুক্রবার বিকালে টেলিফোনে বলেন, ‘প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এ স্কুলের অনুমোদনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো তথ্য নেই। তাই এটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে কিনা সে তথ্য চেয়ে বৃহস্পতিবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’

ছাত্রী সংস্থা নিষিদ্ধের সুপারিশ : সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রমের ওপর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন তৈরি করে। সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠানো হয়। ওই প্রতিবেদনের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ আগস্ট একটি আদেশ জারি করে। তাতে দেশের মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতে ছাত্রী সংস্থা কোনো তৎপরতা চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। জানা গেছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে চারজন অতিরিক্ত সচিব আলাদাভাবে নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এ ব্যাপরে দু’জন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছাত্রী সংস্থাকে নিষিদ্ধ করাসহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। নিষিদ্ধের কাজটি রাজনৈতিক। এটি করার এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।’ ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী সংস্থা জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ছাত্রী সংস্থাটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা যাতে গ্রামগঞ্জে সাধারণ নারীদের মধ্যে জঙ্গি মতবাদ ছড়িয়ে দিতে না পারে সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে পুলিশকে অনুরোধ জানানো হবে। একই সঙ্গে এই সংগঠনকে যাতে নিষিদ্ধ করা হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হবে।’

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছাত্রী সংস্থার ব্যাপারে তিনটি মন্তব্য করে বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘সংস্থার মূল উদ্দেশ্য হল কোমলমতি ছাত্রী ও সরলমনা ধর্মভীরু মহিলাদের জিহাদে অংশগ্রহণসহ প্রচলিত সংবিধানের বাইরে সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির হীন লক্ষ্যে তাদের (নারী) জিহাদি মনোভাবাপন্ন করে তৈরি করে মাঠে নামানো। কর্মীরা গ্রামগঞ্জে ও সারা দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভের উপায় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের নামে প্রতারণামূলক প্রলোভন দিয়ে সংগঠনে যোগ দিতে সরলমনা নারীদের উদ্বুদ্ধ করছে। বর্তমান সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাতে পারছে না বিধায় মূল দল জামায়াতে ইসলামীর অর্থায়নে তাদেরই নারী টিম হিসেবে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার চেষ্টা করছে।

বন্ধ হচ্ছে নিজামীর স্ত্রীর স্কুল  * প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে  * ছাত্রী ও ধর্মভীরু মহিলাদের প্রতি জিহাদের ডাক

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছাত্রী সংস্থা নিষিদ্ধ ও কর্মীদের আটকসহ তিনটি সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশের বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে গ্রামগঞ্জ ও স্কুল, কলেজভিত্তিক ইসলামী নারী সংস্থার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা স্থানীয় প্রশাসনকে জোর সুপারিশ করা যেতে পারে। ছাত্রী সংস্থার কর্মীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থায় যোগদানকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করারও সুপারিশ রয়েছে এতে।

প্রসঙ্গত, রাজশাহী অঞ্চলে ছাত্রী সংস্থার ব্যাপক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি করা হয়। এতে নিপা খাতুন, বুলবুলি বেগম, হাসনাহেনা হাসি ও ফাতেমা খাতুন নামে চার কর্মীর পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়, সিরাতুন্নবী পালনসহ নানা ধর্মীয় কর্মসূচির আড়ালে এরা লিফলেট বিতরণসহ জিহাদের দাওয়াত দিচ্ছে। সারা দেশেই ছাত্রী সংস্থা এই একই স্টাইলে তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতোই এটির দেশব্যাপী অপতৎপরতা আছে। জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, বিভিন্ন প্রশাসনিক থানা, জেলা ও মহানগরে ছাত্রী সংস্থার কমিটি আছে। এমনকি ছাত্রশিবিরের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ইউনিট এবং অধিকাংশ কলেজে ছাত্রী সংস্থার তৎপরতা চলে। সরাসরি জামায়াতে ইসলামী এই সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ করে। জামায়াতের আর্থিক সহায়তা এবং বুদ্ধিতে সংগঠন পরিচালিত হয়। মাঝে মধ্যে এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা ধরা পড়ে। গত কয়েক বছরে জামায়াতে ইসলামীর বড় মগবাজারের অফিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, ইডেন কলেজ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। গত সপ্তাহে রাজধানীতে আটক জেএমবির চার নারী জঙ্গিও এক সময়ে এই ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কর্মী ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।খবর যুগান্তরের।






মন্তব্য চালু নেই