মেইন ম্যেনু

ঈদে মাংস-পোলাও চাই না তাদের, নেশাই যে সব : ‘মামা এহ্যান থেইক্যা যান’

ঈদের কোনো আনন্দ উৎসব তাদেরকে স্পর্শ করেনি। তাদের নেই কোনো স্নেহ বোলানো পরশ। আনন্দ ও হাসি ফোটানোর আপন কেউ নেই তাদের। তবে আছে অন্য দিনের মতো ময়লার বাঘাড়ে কিছু খোঁজাখুজি। ময়লার ভেতর থেকে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস বিক্রির নেশা। বিক্রির অর্থ দিয়ে নেশায় বুথ হওয়া বা দুমোটো খাবার যোগানের আশা। এমনিভাবে রাজধানীর পথ শিশুদের ঈদ আনন্দের সময় কেটে গেলো।

ঈদের দিন শনিবার ও পররদিন রোববার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল ময়লার ডাম্পিং স্টেশন, সায়েদাবাদ, টিটিপাড়া, কমলাপুর এলাকায় পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই দেখা যায়।

ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদে চাই নতুন জুতো। চাই নতুন পোশাকে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু পথশিশুরা এসব চিন্তাও করতে পারে না। জীর্ণশীর্ণ পোশাকে অন্যদিনের মতো ঈদের দিনটিও তাদের কেটে গেলো অনাদরে, অবহেলায়।

ঈদের দিন দুপুরে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনের কাছে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি পথশিশু একসঙ্গে বসে আছে। তাদের কাছে যেতেই মিরাজ নামের এক পথশিশু বলে, ‘মামা এহ্যান থেইক্যা যান। ড্যান্ডি (এক ধরনের নেশা) খাইতাছে হগলে।’

ঈদ কেমন কাটছে, নতুন জামা পেয়েছে কি না জানতে চাইলে সে বলে, ‘আমাগো তো বাপ-মা নাই। কে আমাগো নতুন কাপুড় দিবো। কাপুড় দিয়া কি অইবো। আমারা বোতল টুকাই, যা পাই বিক্রি কইরা সবাই ভাগ কইরা নেই। কোনো কোনো সময় এক সাথে কয়েকজন মিল্যা ড্যান্ডি খাই।’

তার মতো একই কথা জানালো মুন্না নামের আরেক পথশিশু। এ সময় ময়লার বাগাড়ে কয়েকজন শিশুকে কিছু খোঁজাখুজি করতে দেখা গেছে।

এদিকে কমলাপুর রেলস্টেশন গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকজন পথশিশু বৃষ্টিতে গা ভেজাচ্ছে। তাদের একজনকে কাছে ডাকতেই সবাই একসঙ্গে এলো। একজন বলে ওঠলো, ‘অই আইজ ঈদের দিন ভাই মনে অয় আমাগো টাহা দিবো।’ এরপর সবাই বলে উঠলো, ‘ভাই আমাগো টাহা দেন।’ কারো চুখে মুখে কালির ছাপ। এ যেন বৃষ্টির পানিতেও পরিষ্কার হয়নি।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় ২৫ পথশিশু একসঙ্গে জড়ো হলো। তাদের কারো শরীরে নতুন জামা ছিল না, জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। কিন্তু আশানুরূপ কিছু না পেয়ে তারা ছুটাছুটি করে দুই তিনজন একসঙ্গে চলে গেলো। পাশেই ৬ শিশু বসে একসঙ্গে বিড়ি ফুকাচ্ছে। কাছে যেতে বিশ্রি গন্ধ। এতো তীব্র গন্ধ যে তাদের কাছে গিয়ে কথা বলার মতো পরিবেশ নেই। তাদের পাশেই একটি ভাঙা ঝুঁপড়ির নিচে তিন-চারজন ঘুমাচ্ছে।

কমল নামের একজন জানায়, তারা বিড়ির ভেতর গাঁজা ঢুকিয়ে ফুকাচ্ছে। আর যারা ঘুমিয়ে আছে তারা নেশা টেনেই ঘুমাচ্ছে। এই হলো পথশিশুদের ঈদের আনন্দ।

এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশের ৭৫ ভাগ পথশিশুর বাসই রাজধানীতে। এরমধ্যে শতকরা ৫৩ ভাগ ছেলে আর ৪৭ ভাগ মেয়ে। নোংরা পরিবেশ আর অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ৮৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। অধিকাংশ সময়ই রাস্তা, পার্ক, ট্রেন-বাস স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, সরকারি ভবনের নিচে ঘুমায় এবং প্রতিনিয়তই নাইটগার্ড কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। নোংরা স্থানে চলাফেরা ও ঘুমানোর কারণে চর্মরোগে আক্রান্ত হয় অনেকেই। এই পথশিশুদের একটি বড় অংশ শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পৌঁছার আগেই জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি, পিকেটিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

বিআইডিএস ও ইউনিসেফের এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু। চলতি বছর শেষে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪ জনে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জন।

পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকায় এদের কমপক্ষে ২২৯টি মাদকের স্পট রয়েছে।

অন্য এক জরিপে মাদকাসক্ত শিশুদের মাদক গ্রহণ ও বিক্রিতে ৪৪ শতাংশ, পিকেটিংয়ে ৩৫ শতাংশ, ছিনতাই, নেশাদ্রব্য বিক্রয়কারী এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ পথশিশুর যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

Potho-Shishu-1

পথশিশুদের সহায়তাকারী সংগঠন নবজাগরণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবু হোরায়রার বলেন, ‘দেশে অনেক পথশিশু আছে। ঈদের আগে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু পথশিশুদের নতুন জামা উপহার দিয়েছি। আমরা তো আর সব পথশিশুদের জামা কাপড় দিতে পারিনি। তবে আমাদের মতো সমাজে সচ্ছল মানুষগুলো এগিয়ে এলে পথশিশুদের সঠিক পথে কাজে লাগানো যেতো।’






মন্তব্য চালু নেই