মেইন ম্যেনু

উত্তরায় লিফট ছিঁড়ে মৃত্যু: তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সাজানো সংসার

মাইশার অবচেতন মন কি টের পেয়েছিল অমোঘ নিয়তি? ছোট্ট ভাই আর বাবা-মাকে নিয়ে তাদের সাজানো সংসার ল-ভ- হয়ে যাবে আজ ওর শিশুমনে নিয়তি কি এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। এই জন্যই কি সে ইফতার পার্টিতে যেতে চায়নি? এমন অনেক প্রশ্ন মেহবুবা হাসানের মনে।

শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে হতবিহ্বল হয়ে বসে ছিলেন তিনি। ইফতার পার্টিতে যোগ দিতে দশ বছর বয়সের মেয়ে মেহেনাজ হাসান মাইশা, ৮ মাস বয়সের ছেলে মুনতাকিনকে নিয়ে স্বামী মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে উত্তরার ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ার শপিংমলে গিয়েছিলেন তিনি। মেয়ে মাইশা সকালেই মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, সে যাবে না। কিন্তু বাবার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। সেই ইফতার পার্টিতে গিয়েই তাসের ঘরের মতো শেষ হয়ে গেল একটি সুখের সংসার। আলাউদ্দিন টাওয়ার শপিংমলের লিফটের তার ছিঁড়ে সৃষ্ট আগুনে পুড়ে মারা গেছেন মাহমুদুল হাসান। আইসিইউতে চিকিৎসা চলছে মাইশা ও মুনতাকিনের। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

শনিবার বার্ন ইউনিটের আইসিইউর সামনে মাইশার মা মেহবুবা হাসান ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, গায়ে একটি পোকা বসায় মেয়েটা বলে আম্মু ইফতার পার্টিতে যাব না। কিন্তু তারপরও আমরা ইফতারে যাই। এতটুকু মেয়ে যে আগাম সতর্কতা পায় সেটা জানলে ওই মৃত্যুফাঁদে যেতাম না। স্বজনরাও জানান, মাইশা সকাল থেকেই বিষণ্ণ ছিল, ইফতার পার্টিতে যেতে চায়নি।

শুক্রবারের অগ্নিকা-ের পর গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাহমুদুল হাসান। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থশঙ্কর সাহা জানান, তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে মাইশার শরীরের ৫৫ এবং মুনতাকিনের ২৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, চুলসহ শরীরের ওপরের অংশ পুড়ে যাওয়ায় মাইশার অবস্থা ততটা ভালো নয়। মুনতাকিন জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ফুটফুটে শিশুটিকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এদিকে ওইদিন ঘটনাস্থলেই নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন লিফটের তার ছিঁড়ে সৃষ্ট অগ্নিকা- এবং বেসমেন্টের দেয়াল ধসে পড়ার কারণে মাথায় ও কপালে আঘাত পেয়ে মারা যান। দুজন মারা গেছেন আগুনে পুড়ে। প্রত্যেকের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নিহত মাহমুদুল হাসান আবাসন কোম্পানি ট্রপিক্যাল হোমসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) ছিলেন। তার বাবার নাম মোজাম্মেল হক। গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি। মাহমুদুল হাসান পরিবার নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার সেক্টর ১৩-এর ৩ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাড়িতে থাকতেন।

আলাউদ্দিন টাওয়ারের কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর ঠিক রমজানেই এ শপিং কমপ্লেক্সের লিফট তার ছিঁড়ে পড়ে যায়। ওই দুর্ঘটনার পর মার্কেট কর্তৃপক্ষ গাফিলতি না করে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে হয়তো এতবড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

দেখা গেছে, এ শপিং কমপ্লেক্সে দুটি লিফট ও দুটি চলন্ত সিঁড়ি রয়েছে। এর মধ্যে একটি লিফটে দুর্ঘটনা ঘটে। এই টাওয়ারে চারতলার ওপর থাকা আবাসিক ভবনে যাতায়াতের জন্য আলাদা চারটি লিফট আছে। সেগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। বিস্ফোরণের ফলে মার্কেটের একটি লিফটের পাশাপাশি চলন্ত সিঁড়ির বেশ ক্ষতি হয়েছে।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও রাজউকের পরীক্ষা-নিরীক্ষারই পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ফায়ার সার্ভিসও ওই ঘটনার তদন্ত করছে।

এদিকে অনেকে বলছেন, লিফট ছিঁড়ে বিদ্যুতের কেবলসের সঙ্গে একাকার হয়ে গেলে ঘটনাস্থলে এভাবে আগুনের চুল্লি সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। ধারণা করা হচ্ছে, লিফটের নিচে গ্যাসীয় পদার্থ আটকে ছিল। এ কারণেই দ্রুত অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গতকাল ওই মার্কেটে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দুপুরে ব্যবসায়ীদের তালিকা ধরে মাইকিং করে তাদের দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়।






মন্তব্য চালু নেই