মেইন ম্যেনু

উদারতা

আকিদুল ইসলাম সাদী : ঈদ মানে খুশি৷ ঈদ মানে আনন্দ৷ সকলেই উপভোগ করতে চায় ঈদের আনন্দ৷ বড়-ছোট‚ধনী-গরিব কেউই বঞ্চিত থাকতে চায় না৷ দিন যায়‚ রাত যায়৷ এভাবে বছর ঘুরে ঈদ আসে৷ তার আগমনে মানুষের মাঝে নেমে আসে খুশির জোয়ার৷ সকলের মুখে ফুটে ওটে হাসির রেখা৷ শুরু হয় ঈদ উদযাপনে কেনাকাটার ভীড়৷ সকলে উদ্ব্যত হয় যার যার পছন্দের জিনিস কিনতে। ফলে ভীড় জমে দেশের বিভিন্ন মার্কেটগুলোতে৷ অন্যান্য মার্কেটগুলোর মতোই মাগুরা বেবিপ্লাজা মার্কেটটিতেও জমে উঠেছে উপচেপড়া ভীড়৷ মার্কেটটি দেখতে খুবই চমৎকার। সেটি সাজানো হয়েছে বিভিন্ন শপিং মহল ও কসমেটিকের দোকান দ্বারা৷ শপিং মহলগুলোতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ডিজাইনের কাপড়-চোপড় আর কসমেটিকের দোকানে পাওয়া যায় হরেক রকম কসমেটিক পন্য৷ যেগুলো ক্রেতাদের মন জয় করে নেয় খুবই সহজে৷ মাগুরার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব জিনিস কিনার জন্য মানুষ এসে ভিড় জমায় এই মার্কেটটিতে৷ কেনাকাটা করে নিজেদের পছন্দের জিনিস৷ ছোট বাচ্চারাও পিছে পড়ে না পছন্দের জিনিস কেনা থেকে৷ উপচেপড়া ভিড়কে উপেক্ষা করেই তারা মার্কেটে আসে নিজেদের মনের মতো জিনিস কিনতে৷

অন্যান্য ছোট বাচ্চাদের মতো সাবিহাও মার্কেটে এসেছে৷ সে তার নিজের পছন্দের জিনিস কিনবে৷ উপভোগ করবে ঈদ আনন্দ৷ সাবিহার বয়স ৮ বছর৷ চেহারাটা লাবণ্যময়ী৷ মুখে সর্বদা ফুটে থাকে হাসির রেখা৷ মলিনতাকে সে কখনো প্রশ্রয় দেয় না৷ তার কথাগুলো খুবই গোছালো৷ তোতাপাখির মতো সবার সাথে সে কথা বলে৷ যে কোন মানুষ তার কথায় আকৃষ্ট না হয়ে পারে না৷ সাবিহা মার্কেটে এসেছে বাবার সাথে৷ বাবার হাতকে শক্ত করে ধরে সে বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছে৷ শপিং মহলগুলো যেন ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন সাঁজে সেজেছে৷ রূপ তার অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেকটাই পাল্টানো৷ তার মধ্যে টাঙ্গানো রয়েছে হরেক ডিজাইনে বড় ও ছোট বাচ্চাদের কাপড় চোপড়৷ সেগুলো দেখে ছোট্ট সাবিহার মন খুশিতে ভরে যাচ্ছে৷ একপর্যায় হঠাৎ করে তার দৃষ্টি গেলো মার্কেটের দক্ষিণ গেটের এক কোণে৷

সেখানে তার সমবয়সী একটি মেয়েকে দেখতে পেলো৷ মেয়েটি খুবই জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দঁাড়িয়ে আছে৷ মুখটা তার মলিন। পানিতে চোখটা ছলছল করছে। কচি মুখটা তার যেন ঢেকে রয়েছে গভির আমানিশার আঁধারে। সাবিহা তাকে দেখে বাবার হাতটা ছেড়ে দিলো৷ অতপর এক পা দু পা করে হেটে তার নিকট গেলো৷ সাবিহাকে আসতে দেখে মেয়েটি হয়তো বা কিছুটা ভয় পেলো৷ তাই সেখান থেকে সড়ে যেতে উদ্ব্যত হলো। কিন্তু সাবিহা তাকে যেতে দিলো না। বাধা দেয়ার জন্য বললো‚ এই আপু শোন। মেয়েটি তার কথায় থমকে দাঁড়ালো। সাবিহা তার হাতটা ধরে বললো‚ আপু তোমার নাম কী? মেয়েটি বললো‚ সাদিয়া৷ এরপর সাবিহা বললো‚ তুমিও কি আমার মতো নতুন কাপড় কিনতে এসেছ? সাদিয়া বললো‚ না। সাবিহা বললো‚ তাহলে এখানে এভাবে দাড়িয়ে আছ কেন? সাদিয়া বললো‚ এমনি দাঁড়ায় রইসি। সাবিহা বললো‚ জানো। আমি আব্বুর সাথে নতুন কাপড় কিনতে এসেছি। ঐ দেখ আমার আব্বু। তোমার আব্বু আসেনি? তিনি কোথায়? সাদিয়ার চোখ থেকে এবার প্রবাহিত হতে লাগলো অশ্রুধারা। হাজার চেষ্টা করেও সে তা ধরে রাখতে পারলো না৷ অনবরত তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছেই৷ সাবিহা তার এই অবস্থা দেখে গম্ভীর হয়ে গেলো৷ সে বললো‚ আপু তুমি কাঁদছ কেন? কী হয়েছে তোমার?

সাদিয়া কিছুই বলছে না। শুধুই কেঁদে চলছে৷ সাবিহাও তাকে কয়েকবার প্রশ্নটি করলো৷ অবশেষে সাবিহার হাত এড়াতে না পেরে সাদিয়া মুখ খুললো৷ সে বললো‚ আমরা গরিব মানুষ‚ নতুন কাপড় কোথায় পাব। কেডা কিনে দিবে নতুন কাপড়। আমার আব্বা রিকশা চালায়৷ তাই দিয়েতো পেটের খাবারই জোটে না আর নতুন কাপড় তো দূরের কথা। তাও আবার আব্বা কয়দিন আগে একসিডেন্ট করে পাও ভাঙ্গছে৷ এহন আমাগের খাওয়ানের মানুষই নেই। পেটের জালায় আইসি মানুষের কাছে টাহা চাইতে৷ সাদিয়ার ব্যথাভরা কথাগুলো শুনে সাবিহার মুখটা কালো হয়ে গেলো। কে জানি ওর মুখ থেকে হাসিটাও কেড়ে নিলো। আর দুঃখ দিয়ে পূর্ণ করে দিলো কচি অন্তরটা। তোতাপাখির মতো যে সাবিহা কথা বলে‚ তার মুখ থেকে যেন ভাষাও হারায় গেলো৷ সে শুধু বললো‚ আপু তুমি দাড়াও আমি আসছি। যাবে না কিন্তু। এর বেশি আর কিছুই বলতে পরলো না৷ দৌড়ে গেলো বাবার নিকট। সাবিহা যে কখন হাত ছেড়ে দিয়েছে তা খেয়াল করেনি সাবিহার বাবা। সে একটি দোকানে মেয়ের জন্য ফ্রক দেখছিলো৷ এমন সময় সাবিহা বাবার হাত ধরে বললো‚ আব্বু এদিকে এসো। বাবা বললো‚ কোথায় মামণি? সবিহা বললো‚ এসোনা আমার সাথে। কথাটি বলে সে বাবার হাত ধরে টান দিলো৷

সাবিহার বাবা মেয়ের হাত এড়াতে না পেরে তার সাথে যেতে লাগলো৷ সাবিহা তঁাকে সাদিয়ার নিকট নিয়ে এলো৷ অতপর সে বাবাকে বললো‚ দেখ বাবা। এই মেয়েটি আমার সমবয়সী৷ এর মুখে থাকার কথা ছিলো হাসি। আমার মতো বাবার সাথে কাপড় কিনতে মার্কেটে আসার কথা ছিলো৷ কিন্তু না। তা হয়নি৷ ওর মুখে হাসি নেই‚ আছে চোখ ভরতী পানি। আর মার্কেটে এসেছে ঠিকই তবে কাপড় কিনতে নয়। বরং পেটের জালায় ভিক্ষা করতে৷ এখানে দাড়িয়ে রয়েছে অসহায়ের মতো৷ বকাঝকা করছে কত মানুষ। অনেকে আবার ভ্রুক্ষেপও করছে না এর দিকে৷ সামনে ঈদ৷ কত আনন্দ করছে আমার মতো ধনীর দুলালীরা৷ কত নতুন কাপড়ও পাচ্ছে তারা৷ অথচ এ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারছে না৷ পারছে না নতুন কাপড়ও কিনতে৷ বাবা। এর বা এদের মতো গরিবদের কী মনে আনন্দ নেই? এর কি নতুন কাপড়ের পরিধানে স্বাদ জাগে না? সাবিহার বাবা তো হতবাক হয়ে শুধু মেয়ের কথাগুলো শুনছে৷ কিছুই বের হচ্ছে না তার মুখ দিয়ে৷ আর সাবিহা বাবাকে দরদমাখা কথাগুলো বলেই চলেছে৷ মনে হচ্ছে ছোট্ট সাবিহা স্কুলে মুখস্থ করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে৷ কেননা‚ এতোটুকু মেয়ের মুখ থেকে এমন কথা সত্যিই অকল্পনীয়। কিন্তু না‚ সাবিহার কথাগুলো কোন প্রশ্নের উত্তর নয়৷ সতি্যই সে বাবাকে কথাগুলো বলছে৷ একপর্যায় সে বললো‚ বাবা তুমি সাদিয়া আপুকে একটা নতুন কাপড় কিনে দাওনা। যাতে সাদিয়া আপুও আমার মতো ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে পারে। সাবিহার বাবা এতক্ষণ মেয়ের কথাগুলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুনছিলো৷ সে মেয়ে কথায় কিছুটা লজ্জাও পেলো৷ অন্যদিকে সাবিহার মতো মেয়ের বাবা হয়ে গর্ববোধ করলো৷ ভাবলো‚ এতোটুকু মেয়ের গরিবের প্রতি কতটা উদারতা। কতটা ভালোবাসা। এমন যদি প্রতিটি ধনী লোকের হতো তাহলে গরিব পেতো ন্যায্য অধিকার। ফুটে উঠতো গরিব বাচ্চাদের মুখে হাসির রেখা। কথাগুলো ভেবে তার চোখের কোণে কিছুটা পানি চলে এলো৷ কিন্তু তা কেউ দেখে ফেলানোর আগেই লুকিয়ে ফেললো৷ সাবিহার মতো মেয়ের বাবা হতে পেরে সে নিজেকে ধন্য মনে করলো। অতপর সে বিমূঢ় ভেঙ্গে বললো‚ মামণি চলো তোমাদের দুজনকেই নতুন কাপড় কিনে দেই৷

তাঁর কথা শুনে ওদের দুজনের মনই খুশিতে নেচে উঠলো৷ দুজনে হাসি মুখে তাঁর সাথে দোকানে গেলো৷ সাবিহার বাবা সাবিহার সাথে সাদিয়াকেও নতুন একটি কাপড় কিনে দিলো৷ সাদিয়া নতুন কাপড় পেয়ে যেন চাঁদ হাতে পেলো৷ খুশিতে উতলা হয়ে উঠলো তার মন৷ অন্যান্য শিশুদের মতোই ফুটে উঠলো তার কচি মুখে হাসির রেখা৷ সাবিহার বাবা সাদিয়ার মুখে হাসি দেখে খুবই আনন্দিত হলো৷ সে মনে মনে ভাবলো‚ এ সমস্ত শিশুদের পাশে যদি আমরা না দাঁড়ায় তাহলে তারা কোথায় যাবে। কিভাবে উন্নত হবে তাদের জীবন যাত্রা৷ প্রত্যেক ধনীদেরই দায়িত্ব-কর্তব্য হলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো৷ সাদিয়ার মতো অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো….






মন্তব্য চালু নেই