মেইন ম্যেনু

উড়ে না সূজনের স্বপ্নের বেলুন

যে বয়সে বই কাঁধে স্কুলে যাবার কথা, শিশুপার্কের রঙিন দোলনায় দোল খাওয়ার কথা, মাঠে দস্যিপনা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হেসে খেলে বেড়ানোর কথা, অথচ সেই বয়সেই শিশু সূজনের কাঁধে চাপল সংসারের বোঝা। হাজারো অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিশাল সংসারের ঘানি টানতে হচ্ছে ১০ বছরের এই ছোট্ট শিশুটিকে। রাজধানীর ঢাকার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সবখানেই রং-বেরঙের বেলুন ফেরি করতে দেখা যাবে সূজনকে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের সামনে কোন এক দুপুরে অসম জীবন যুদ্ধে নামা এই শিশুটির সঙ্গে কথা হয় নানান বিষয়ে।

বয়সে শিশু কিন্তু দায়িত্বে অনেক বড় সূজন থাকেন ঢাকার জিঞ্জিরা এলাকায়। সংসারে আছেন মা-বাবা, বড় বোন কল্পনা, ছোট দুই ভাই-বোন রুবেল ও শিউলি। আরও আছেন বৃদ্ধ দাদি। রিকসাচালক বাবা প্যারালাইসড হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাসায়। মা আর বোন রাস্তায় ভাঙ্গারি কুড়িয়ে জীবনযুদ্ধে জেতার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতেও চলে না সংসার। একেক দিন খেয়ে না খেয়ে কোনো মতে দিনগুজরান করতে হয় সূজনদের। এরই মাঝে হাসি-কান্নারা ফিরে ফিরে আসে সূজনের ছোট্টা ঘরটিতে।

এমনি যখন পরিবারের অবস্থা। তখন তার বাবার পরিচিত এক লোকের মাধ্যমে চায়ের দোকানে চাকরি নেন সূজন। কাস্টোমারদের চা-পানি এগিয়ে দেয়ার কাজ। বেতন ৫০০ টাকা। এখানে ৬ মাস কাজ করার পর সুজন কাজ নিলো এলাকার একটি হোটেলে। সেখানে প্রথমে থালাবাসন ধোয়ামোছা করলেও পরে টেবিল পরিস্কার ও পানি টেবিলে দেওয়ার কাজ করতো সে। এখানেও বেতন সেই ৫০০ টাকা, তবে খাওয়া হোটেল মালিকের। এই কাজ করতে গিয়ে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ুয়া সূজনের একপর্যায়ে পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যায়। তখন তার বয়স মাত্র ৯ বছর। এভাবেই কাটে আরও কিছুদিন। কিন্তু হোটেলের কাজ বেশিদিন ভালো লাগে না তার। কোন ভুল করলে মা-বাবার নাম ধরে গালমন্দ, তার উপরে ছিল চড়-থাপ্পর। এছাড়া হাত থেকে গ্লাস পরে ভেঙ্গে গেলে তার জন্য জরিমানাও গুনতে হতো তাকে। বাধ্য হয়ে হোটেলের কাজও ছেড়ে দেয় সুজন।

একদিন এক বেলুন বিক্রেতার সঙ্গে পরিচয় হলো সুজনের। সুজনদের এলাকায়ই তার বাসা। সেই বেলুন বিক্রেতা আগে হেঁটে হেঁটে বেচা-বিক্রি করলেও এখন রাস্তার মোড়ে বসে বেলুন –খেলনাসহ বিভিন্ন রকমারী আইটেম বিক্রি করে। সে বিক্রেতা সেলিম তার দোকান থেকে কিছু বেলুন বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করার জন্য দেয় সুজনকে। প্রতি বেলুনে সুজনের কমিশন ৫টাকা। প্রথমদিনেই সবকটি (১০টি) বেলুন বিক্রি করে সুজন। এতে দুজনেই খুশি। পরদিন থেকে আরো বেশি করে বেলুন নেয় এবং বিকেল পর্যন্ত প্রায় সবকটি বেলুনই বিক্রি হয়ে যায়। সূজনের উৎসাহও বাড়তে থাকে। সংসারের শত চাহিদা সত্ত্বেও সূজন প্রতিদিনই কিছু টাকা জমা করে।

জমানো এই টাকা দিয়ে সুজন নিজেই একদিন নেমে পড়ে বেলুন বিক্রির ব্যবসায়। চকবাজার থেকে পাইকারে বেলুন কিনে এনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেলুন ফেরি করে বেড়ায় সূজন। ফুটা-ফাটা বেলুনও ফেরত নেয় মহাজন। এতে করে তার ব্যবসা এখন অনেক ভালো যাচ্ছে। সংসারে অভাব অনটন খুব একটা নেই বললেই চলে। আগে রাস্তায় রাত কাটালেও এখন বস্তির ভাড়া বাসায় থাকে তার পরিবার।

সূজন জানায়, প্রতিদিন সকাল বেলা জিঞ্জিরা থেকে বের হয়ে চকবাজার গিয়ে বেলুন কিনে আনি। তারপর পুরান ঢাকা, চাঁনখারপুল, হাজারীবাগ, লালবাগ, শাহাবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি, আজিমপুর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহীদ মিনার এসব এলাকাই বেলুন বিক্রি করি। প্রতিটি বেলুন বিক্রি করি ৬০ টাকা করে। বেলুন প্রতি লাভ হয় ১০ টাকা। কোন কোন দিন ৫০-৬০ টা বেলুন ও বিক্রি করি। বিভিন্ন দিবসে লোকজন যখন ঘুরতে বের হয় তখন বিক্রি বেশি হয়। এবারের ঈদেও অনেক বেলুন বিক্রি করেছি। আর পহেলা বৈশাখের দিন সবচেয়ে বেশি বেলুন বিক্রি করি।

সে জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল বেলায় বেলুন বিক্রি করি। সন্ধ্যায় উদ্যান বন্ধ হয়ে গেলে শহীদ মিনার ও চাঁনখারপুল এলাকায় যাই। এছাড়া সারাদিন বিভিন্ন মহল্লা–কলোনীর আশ-পাশে গেলে বেলুন বিক্রি করতে পারি। স্কুল পড়ুয়া ছোট ছোট শিশুরা বেলুন বেশি কেনে বলে জানায় সুজন। এভাবেই আমাদের দেশের ছিন্নমূল শিশুরা কেউ ইট ভাটায়, কেউ হোটেলে, কেউ কারখানায় কাজ করছে। যারা শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের কথা বলেন সে সচেতন মানুষেদের কি কিছুই করার নেই এই অসহায় শিশুদের জন্য? অথচ একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই শিশুরা কিন্তু নিজেদের জন্য হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটছে না। একটি বিশাল পরিবার বা বাবা-মার ভরণপোষণের জন্য তারা বাধ্য হয় এসব করার জন্য। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের কি সত্যিই করার কিছু নেই?বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই