মেইন ম্যেনু

একজন ইউএনও আসাদ ও তার স্বপ্নগুলো, সবাই এমন হবে কবে?

একটা মুরগির ফার্মে ক্রমাগত লস হচ্ছিলো। মালিক মুরগীদের কাছে গিয়ে বললো, কাল থেকে যদি দুইটা করে ডিম না দেস সবগুলোকে জবাই করে ফেলবো। পরদিন দেখা গেলো সবগুলো দুটো করে ডিম দিয়েছে একটা ছাড়া। মালিক জিজ্ঞেস করলো কিরে তোর ডিম একটা কেন? সে জবাব দিলো, স্যার আমি মুরগী না মোরগ। ভয়ে আমিও একটা দিয়ে ফেলেছি। গল্পটার সারমর্ম পরে বলছি। তার আগে আজকের একটা ঘটনা বলছি।

উপজেলা অফিসে অনেক মানুষের ভীড়। পেছনের দরজায় একজন লোক দুরু দুরু বুকে দাড়িয়ে আছে। একটা অভিযোগ জানাতে এসেছে। কিন্তু কে কি মনে করে তাই ভেবে চারদিকে একবার তাকায় আরেকবার ইউএনও স্যারের দিকে তাকায় (উপজেলা নির্বাহী অফিসার)। এখানে সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন খুব একটা হয় না তা লোকটা ভালো করেই জানে।

ইউএনও লোকটাকে ডাকলেন। বললেন… কি চিনেছিতো আপনাকে। আপনার রান্নাঘরের ওই দিকে ধোয়া উঠছে সে অভিযোগ দিতেইতো এসেছেন।

লোকটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে… জ্বী স্যার।

আমার নলেজে এসেছে এটা। চলে যান, সমস্যা নেই। ওটা আমি দেখছি।

আমি অবাক হলাম। রান্না ঘরের ধুয়ার সাথে ইউএনও অফিসের কি সম্পর্ক মিলাতে পারছিলাম না। বড়জোর এটা গ্যাস অফিসের সাথে সম্পর্কিত। আর ইউএনও-ই বা কিভাবে জানলেন এই লোকের রান্না ঘরে কি প্রবলেম।

যার কথা বলছিলাম, দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসাদ জামান মোহাম্মদ। সব সময় এক হাতে একটা ট্যাব অন্য হাতে একটা স্মার্ট ফোন থাকে। আর নিজে থাকেন গ্রামের চাষা ভূষাদের সাথে জড়িয়ে। আমাকে ডেকেছিলেন একটা ওয়েব সাইটের ব্যাপারে। এই উপজেলার সাধারন মানুষজন যেন ঘরে বসে তাদের জমির খতিয়ান পেতে পারে। এটা হলে জমি জমার হয়রানী আর থাকবে না। ভূমি অফিসে গিয়ে তাদের হয়রানীও হতে হবে না।

আমি বুঝি, সরকারী একজন কর্মকর্তা ওয়েব সাইট সম্পর্কে কি-ই বা জানেন। আমি যতই বোঝাতে চেষ্টা করছি স্যার এটা খুব কঠিন একটা বিষয়। ততই তিনি এর সহজ দিকগুলো আমার সামনে তুলে ধরছেন। পরে দেখি তিনি নিজেই একজন পিএইচপি প্রোগ্রামার। একজন ইউএনও পিএইচপি প্রোগ্রামার তাও বাংলাদেশে… অবাকের আর সীমা রইলো না। এন্ড্রয়েড কি জিনিস? বাংলাদেশের কতজন ইউএনও এর সঠিক জবাব দিতে পারবেন আমি জানিনা। তবে তিনি এন্ড্রয়েড এপস তৈরির ব্যাপারে আমার সাথে আলোচনা করলেন। অনেক ইউএনও সরকার থেকে ট্যাব পেয়ে চালাতে না পেরে তা দিয়ে যে ব্যাড মিন্টন খেলেন তাও শুনেছি।

এমন সময় ফোন এলো, যা বুঝলাম কোথাও বর্জ্রপাতে একজন মারা গেছে। সাথে সাথে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে কল করলেন, উপজেলার একজন কর্মচারীকে বললেন তারাতারি ডিসি অফিসে ওই দুস্থ পরিবারের জন্য সহযোগিতা চেয়ে একটা ফ্যাক্স করতে।

বেলা তখন সাড়ে ৫ টা। যত দূর জানি এই রোজায় অফিস টাইম কমার কথা। অন্তত সাড়ে ৫ টা হওয়ার কথা না।

তাঁর কয়েকটা প্ল্যানের কথা শুনে আমি তব্দা খেয়ে গেলাম। চেয়ারম্যানদের কাছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন দেবেন। যেন গম সঠিক লোকের কাছে যায়। উপজেলার প্রতিটি স্কুলের টিচাররা স্কুলে এসে আইডিতে লগিন করে আগে এটেন্ডেন্স দেবেন তা কেন্দ্র থেকে তিনি মনিটর করবেন। জন্ম নিবন্ধনে ডিজিটাল সিস্টেমে স্বচ্ছতা, বাল্য বিবাহ রোধে ডিজিটাল পদক্ষেপ সহ আরো কিছু। গোপনীয়তার স্বার্থে এখানে সবগুলো প্ল্যান বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এগুলো এই উপজেলায় বাস্তবায়ন করা গেলে এখান থেকে সারা দেশে ছাড়িয়ে যাবে।

জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার পর ছাত্রদের অবসর সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য উপজেলার পক্ষ থেকে মান সম্মত কম্পিউটার প্রশিক্ষন। কম্পিউটার প্রশিক্ষন বলতে এমএস ওয়ার্ড আর এক্সেল না। একদম প্রোগ্রামিং পর্যন্ত। যেন এই এলাকার ডিজিটালাইজেশনের দায়িত্ব এখানকার ছেলে মেয়েরাই নিতে পারে।

এখানে অন্যান্য কর্মচারীদের মধ্যে যারা একটু এদিক সেদিক করতেন। ফাইল এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে পাঠাতে ক্রেন লাগাতেন। ইউএনওর ভয়ে তারা এখন মোরগের মতো ডিম পারা শুরু করেছেন।

কিন্তু এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকবেন মুড নিয়ে। একজন সাধারন মানুষ এলে চশমার উপর দিয়ে একবার ভালো করে দেখে নিজের কাজে মন দিবেন। লোকটা সমস্যার কথা জানালে এটা কতটা কঠিন কাজ তা হাড়ে হাড়ে বোঝাবেন। তারপর এখানে এসেছেন কেন বলে ধমক দিয়ে অমুক অফিস তমুক অফিসে পাঠাবেন। লোকটি ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে এক বান্ডিল টাকা গুজে দিয়ে বলবে, স্যার যত লাগে দেব কাজটা করে দেন।

আমি জানিনা, তিনি কোন জনপ্রতিনিধি নন। কিন্তু কোন স্বার্থে এভাবে সাধারন মানুষের সাথে মেশেন। একজন কোট টাই পরা বাবুকে যেভাবে মূল্যায়ন করেন একটা চাষাকেও সামনের চেয়ারে বসতে দেন। মন দিয়ে সমস্যা শোনেন। মিনিটেই সমস্যার সমাধান করে দেন। মাস শেষে বেতনতো ওই একটাই।

এই মানুষগুলো দেখেই আশাবাদী হই। এই দেশে কিচ্ছু হবে না কথাটা মন থেকে ছুড়ে ফেলি। এতো সমস্যার মধ্যেও আশার আলো দেখতে পাই। না হচ্ছে তো… জাস্ট আরো কিছু আসাদ জামান মোহাম্মদ দরকার।

লেখকঃ এস এম নাহিদুর রহমান





মন্তব্য চালু নেই