মেইন ম্যেনু

একজন টোকাইয়ের জীবনে থার্টি ফাস্ট নাইট কী পরিবর্তন আনবে?

গায়ে তার ছিন্ন বস্ত্র, হাতে ঝোলানো ময়লা চটের ব্যাগ। শীত নিবারণের জন্য পরিধেয় বস্ত্রটি হচ্ছে তার মায়ের হাতে বোনা ছেড়া কাঁথা। ছুটে চলছে ময়লা আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিনের দিকে। সাথে ৭-৮ বছরের একটি মেয়েও ছুটছে। শীতে কাঁপছে।

ওরা ভাইবোন। ওরা টোকাই। হ্যাঁ! আমি টোকাইয়ের কথা বলছি! তাদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন কথা হল। জানা হল তাদের জীবনযাপন। তারা থার্টি ফাস্ট নাইট কি জানে না। তবে মেয়েটা বলল ওটা বড় লোকদের রাত আমাদের না! তারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল।

হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল হাজারো খেটে খাওয়া ব্যস্ত মানুষ। রিকশা চালক, গাড়ির শ্রমিক, স্কুল, কলেজ, গার্মেন্টসগামী ছেলেমেয়ে, অফিসের পথে ছুটে চলা কর্মজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। তাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম আজ রাতই উদযাপিত হবে থার্টি ফাস্ট নাইট। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানাবে দেশবাসী। নববর্ষে নতুনের বার্তা আসবে। আসবে নতুন দিন, নতুন স্বপ্ন! কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৬ মুছে ১৭ করলেই কি আমাদের পরিবর্তন আসবে?

যতই নাচগান, ডিজে পার্টি করি তাতেই কী সারা বছর ভাল কাটবে? যে টোকাই ময়লা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ডাস্টবিনের দিকে ছুটছে, কর্মজীবী পেশাজীবী মানুষ কর্মের সন্ধানে বেড়িয়েছে, যে মুক্তিযোদ্ধা হাতে কয়েকটা বই কিংবা শীতের কাপড় নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছে বিক্রির জন্য তার নতুন বছরে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কতটুকু? তাহলে থার্টি ফাস্ট নাইট কিসের জন্য? এটা কোন নতুনের আহ্বান?

গ্লোবাল ভিলেজের আওতায় আমরা বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতিগুলো উদযাপন করব এটা ঠিক। নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সীমাকে ভুলে যাওয়া কী ঠিক হবে? কিন্তু আমরা ভুলে যাই!

পাশ্চাত্যের দেশগুলো কিংবা বিদেশীদের ভাল কিছু নেই তা নয়। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির যুগে আমরা কি গ্রহণ করছি? এর ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের কথা নিশ্চয়ই সবার জানা আছে। ৩৬৫ দিনে এক বছর। কিন্তু আর মাত্র ১২০-১৩০ দিন পরই শুরু হয় আরেকটি বছর! সেটা হয় আমাদের পহেলা বৈশাখ। তখন আবারও নতুন দিনের নতুনকিছু পাওয়ার আশায় আয়োজন শুরু হয়। তাহলে তো দেখি এসব দিবস উদযাপন আর নতুন দিনের নতুন বার্তা সব ক্যালন্ডারের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। মন চাইলে ৩৬৫ দিনে কয়েকবার করা যাবে।

নাহ্‌ পহেলা বৈশাখে কোন ডিজে পার্টি হবে না, বসবে না কোন মদ্যপানের আসর। হবে না কোন অশালীন কার্যকলাপ। হাজার হাজার টাকা খরচ করে পুলিশ প্রশাসনকে রাস্তায় নামাতে হবে না আজ রাতের মত। দেশীয় সংস্কৃতিতে মাতবে দেশ।

আগে জানতাম শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। এখন দেখি আমরা সবাই অনুকরণপ্রিয়। ভিনদেশী কোন নায়ক ছেঁড়া প্যান্ট পড়ল, কোন নায়িকা কালো চুল বাদামী কিংবা সাদা করল, জামায় কি নতুন কাট দিল, জামা কয় ইঞ্চি ছোট করে পড়ল সাথে সাথেই তা নিয়ে আমাদের হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় ছোটাছুটি। কোন শো-রুমে পাব সেই ছেঁড়া প্যান্ট কিনতেই হবে যেকোন উপায়ে। তাইতো ভ্যালেন্টাইন্স ডে, থার্টি ফাস্ট নাইট ইত্যাদিতে আমরা যতটা মাতি ততটা মাতি না আন্তর্জাতিক মাটি দিবস, ডায়াবেটিকস দিবস, বিজ্ঞান দিবস, মে দিবস ইত্যাদি নিয়ে। আমরা ভাল জিনিসের অনুকরণ করতে পারিনা।

অনুকরণ করে কেন আমাদের দেশে মাদার তেরেশা, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, আইনস্টাইন কিংবা হকিংস জন্ম নেয় না? শুধু চুল দাঁড়িতে রবীন্দ্রনাথ নজরুল জন্ম নেয় কিন্তু কবিতা জন্ম নেয় না!

হ্যাঁ আমি টোকাইয়ের কথা বলছি। ছেঁড়া কাঁথা পরিধেয় টোকাইয়ের থার্টি ফাস্ট নাইটের পর আসা পরিবর্তনের কথা। আমি, আপনি, আপনারা যখন পার্ক অথবা রেস্টুরেন্টে হাজার হাজার টাকা ফুড়িয়ে আতশবাজি করে, ডিজে পার্টি শেষে বিরানীর ঠোঙ্গা, বোতলগুলো ফেলে দিব আর সেগুলো ডাস্টবিনে যাবে তখন সেগুলো কুড়াতে যাওয়া শীতে থরথর করে কাঁপা এক টোকাইয়ের কথা।






মন্তব্য চালু নেই