মেইন ম্যেনু

সোনার বন্ধকী ব্যবসা

একটি কাগজ সাক্ষী ভরি ভরি সোনার!

জরুরি টাকা দরকার? চলে যান জুয়েলারি দোকানে। মা-বোন-স্ত্রীর গয়না বন্ধক দিয়ে সেখানে পাবেন স্বর্ণমূল্যের ৫০ বা ৭৫% নগদ টাকা। তো, টাকা শোধ করে গয়না ফেরত নিতে হবে না? ডকুমেন্ট কী। ডকু বা সাক্ষী হিসেবে জুয়েলারি দোকানটি আপনাকে দিচ্ছে এক টুকরো কাগজ, তাতে লেখা গয়নার পরিমাণ, সুদহার আর যত টাকা আপনি নিয়েছেন। ব্যস, চলছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসা!

ঠিক এভাবেই চলছে স্বর্ণ বন্ধক রেখে নগদ ঋণের ব্যবসা। বন্ধকী স্বর্ণের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম ধরা হয়। আর মাসে শতকরা ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত সুদ নেয়া হয়। তবে বিপত্তি সেখানে নয়, যদি সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করতে পারলে আপনার গচ্ছিত স্বর্ণ হাপিস হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা বলবেন, ‘গলিয়ে ফেলেছি’!

সরেজমিনে রাজধানীর তাঁতীবাজার ও পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ শহরে স্বর্ণের বন্ধকী প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ ‍নিয়ে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণ গচ্ছিত রেখে সাদা কাগজে গ্রাহকের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করে ঋণ দেয়া হয়।

শুধু তাই-ই নয়, গ্রাহকদের দেয়া হয় না কোনো ধরনের নিরাপত্তা রশিদ। শুধু একটি কার্ড বা সাদা কাগজে সোনা ও ঋণের পরিমাণ এবং সুদের হার লিখে দেয়া হচ্ছে।

বন্ধকী ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মানুযায়ী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কোনো গ্রাহক গচ্ছিত স্বর্ণ ফেরত না নিলে বা সুদ না দিলে তা বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এক মাস সুদ না দিতে পারলে পরের মাসে গ্রাহককে জরিমানা গুণতে হচ্ছে দুই থেকে তিনগুণ। আবার কেউ কেউ জরিমানা দিয়েও গচ্ছিত স্বর্ণ ফেরত পাচ্ছে না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া গ্রাহকদের ভোগান্তির সীমা চরমে পৌঁছেছে।

গ্রাহকরা জানান, কোনো ব্যাংকে গেলে জামানত হিসেবে স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ দেয় না। তা ছাড়া ব্যাংক ঋণ নিতে গেলে অনেক কাগজপত্র লাগে। সেইসঙ্গে সময়ক্ষেপণ তো আছেই। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের ঘুষও দিতে হয়। তাই তাৎক্ষণিক ঝামেলাবিহীন ঋণ নিতে গ্রাহকরা স্বর্ণ বন্ধক দিতে আসে এসব প্রতিষ্ঠানে।

তাঁতীবাজারে সোনা বন্ধক রেখেছে এমন গ্রাহকদের একজন শরীফ হোসেন। হঠাৎ তার টাকা দরকার হয়। তাকে তার স্ত্রী বলে, সোনার গয়না বন্ধক দিয়ে কিছু টা‍কা নিয়ে আসতে। পরে ৩ ভরি সোনার গয়না নিয়ে শরীফ তাঁতীবাজার যান।

তিনি বলেন, ‘বাজারে ঢুকতেই চারদিক থেকে মানুষ ডাকাডাকি শুরু করছে। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম। পরে একটা দোকানে ঢুকলাম এবং সেখানে মাসে শতকরা ৫ টাকা হারে গহনা বন্ধক নিয়ে ১ লাখ ‍টাকা ঋণ নিলাম।’

শরীফ মনে করেন, স্বর্ণ বন্ধক রেখে তাৎক্ষণিক ঋণ পাওয়ায় মানুষের উপকার হয়। তবে সুদের হার কমানো উচিত। এসব ব্যবসায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার অধিবাসী আলেয়া বেগম জানান, তার ছেলে জেলে বন্দি থাকাকালে জামিন ছাড়াও সংসারে টাকার প্রয়োজন হয়। ৭ মাস আগে এ শহরের রাজধানী জুয়েলার্সে ২ ভরি স্বর্ণ বন্ধক রেখে মাসিক ১০০ টাকায় ৬ টাকা সুদে ৫০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু সুদের টাকা ঠিকমতো দিতে না পারায় স্বর্ণগুলো দিতে তালবাহানা শুরু করে তারা।

আলেয়া বলেন, ‘আমার কাছে এক টুকরো কাগজ আছে। সেখানে সোনার পরিমাণ ও টাকার কথা লেখা আছে। কিন্তু এই কাগজের কোনো মূল্যই নেই। এখন তাদের দয়া হলেই গয়নাগুলো ফেরত দেবে।’

জানা গেছে, বহু বছর ধরে বন্ধক ব্যবসার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এর নেই কোনো ধরনের নীতিমালা। তবে ব্যবসা করতে ট্রেড লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক। তা ছাড়া স্বর্ণ বেচাকেনার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ডিলিং লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু এখানে যারা ব্যবসা করছে তাদের ডিলিং লাইসেন্স থাকলেও বেশিরভাগের মেয়াদ উত্তীর্ণ। এ ছাড়া অনেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই বন্ধকী সুদের ব্যবসা করছে।

বন্ধকী ব্যবসায়ীরা জানান, এক্ষেত্রে তারা আলাদা খাতা সংরক্ষণ করেন। সাদা খাতায় গ্রাহকদের ফোন নম্বর, স্বাক্ষরসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। গ্রাহককে দেয়া হয় সোনার পরিমাণ, টাকা ও সুদের হার সম্বলিত একটি কার্ড। কখনও কখনও রেভিনিউ স্ট্যাম্প যুক্ত করে কার্ডটিকে বন্ধকের দলিল আখ্যায়িত করা হয়।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, কোনো গ্রাহকের বন্ধকী ঋণের বিপরীতে সুদাসল বেশি হয়ে গেলে স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত করার শর্ত থাকে। তবে এর আগে গ্রাহকের সঙ্গে ফোনে বা চিঠি পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। গ্রাহক সাড়া না দিলে তবেই স্বর্ণ গলানো বা বিক্রি করে দেয়া হয়।

তাঁতীবাজার স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পবিত্র চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘এটা আমাদের প্রাচীন ব্যবসা। একজন গ্রাহকের জরুরি না হলে স্বর্ণ বন্ধক দিতে আসে না। আমরা গ্রাহকের প্রয়োজন বুঝে কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই ঋণ দিয়ে থাকি।’

সুদের হার বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিপদে পড়ে বেশিরভাগ গ্রাহক অল্প সময়ের জন্য বন্ধক রাখে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ধক খুব কম। তাই আমরা মাসিক ভিত্তিতে লাভ নিয়ে থাকি।’

পবিত্র ঘোষ আরও জানান, বর্তমানে সোনার দাম কমায় ব্যবসায়ীরা লোকসানে আছেন। ৯৯ শতাংশ গ্রাহক স্বর্ণ নিতে আসছে না। যেখানে ১ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে সেখানে দাম কমায় তা নেমে এসেছে ২৫ লাখ টাকায়।

ডিলিং লাইসেন্স সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাঁতীবাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ সোনার দোকান রয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে ডিলিং লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে যারা এখনো নবায়ন করতে পারেনি তারা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করে ফেলবে।’

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান বলেন, ‘সোনা বন্ধক রেখে ঋণ দেয়া নেয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের নিয়মনীতি নেই। তাই এ ব্যবসার উপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’

আর এসব কারণেই বন্ধক রেখে চড়া সুদ নেয় ব্যবসায়ীরা। তবে বাজুস এটা সমর্থন করে না বলে জানিয়েছেন তিনি।বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই