মেইন ম্যেনু

এক সৌদি পাগলা ঘোড়া

গত বছরের শেষের দিকে জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা(বিএনডি) একটি উল্লেখযোগ্য রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। সেই রিপোর্টটির অর্ধেক পৃষ্ঠা জুরে লিখিত এক বক্তব্যে বলা হয়, ‘সৌদি আরব কোনো প্রকার বিবেচনা ছাড়াই অন্যের ব্যাপারে হস্পক্ষেপের নীতি গ্রহন করেছে।’ জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা এই নীতি গ্রহনের পেছনের ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বাদশাহ সালমানের এই ২৯ বছর বয়সী সন্তানের বিপজ্জনক দূরভিসন্ধির কারণে আজ ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় অন্যের হয়ে লড়াই করতে হচ্ছে সৌদি আরবকে। শুধু তাই নয়, এই দুই দেশের আভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে গোটা আরব বিশ্বে যে আগুন লেগে গেছে তার পেছনেও আছেন এই যুবরাজ।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সচরাচর এধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গণমাধ্যমকে জানায় না। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এবং খুবই কাছের মিত্র সৌদি আরবের এক নেতাকে নিয়ে এমন তথ্য প্রকাশ না করবারই কথা ছিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিএনডি’র এই রিপোর্ট দুই দেশের মিত্রতার মধ্যে একটা অস্বস্তিকর অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোয়েন্দা সংস্থাটিকে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। অবশ্য সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ আসলেই তবে ওই সতর্কবানী দেয়া হয়, যদিও গোয়েন্দা সংস্থাটি উল্টো সতর্কবানী উচ্চারণ করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভয় আর সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে সৌদি আরব নিজেকে একটি অনিশ্চিত অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাবেক এক মন্ত্রী নিজের নাম প্রকাশ না করে জানান, ‘আগে সৌদিরা সাধারণত নিজেদের আভ্যন্তরীন বিষয় নিয়েই থাকতেন। পারতপক্ষে তারা অন্য দেশের দিকে হস্তক্ষেপ করতো না। এমনকি কয়েকটি দেশের সরকারকে উৎখাতের মতো অবস্থা তৈরি হলেও তারা সেই সুযোগ নেয়নি।’গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি’র রিপোর্ট আশ্চর্যজনকভাবে জার্মানির বাইরে কিছুটা প্রভাব তৈরি করতে পারে। ডিসেম্বরের ২ তারিখ রিপোর্টটি প্রকাশ হওয়ার তিন সপ্তাহ আগেই প্যারিসে হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল এবং এখনও ইউরোপবাসী সেই হামলার ভয়াবহতা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এমতাবস্থায় প্রকাশিত এই রিপোর্টটি তাই ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হয়ে যায়।

ব্রিটেনে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিমানবাহিনীর যোগদান প্রশ্নে বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু ওই বিতর্ক চলাকালীন সময়েই ইসলামিক স্টেটপন্থী এক দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়াতে হত্যাকাণ্ড ঘটনা এবং যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীতে চলমান বিতর্কে ভাটা পরে। যার প্রেক্ষিতে আমরা ব্রিটিশ বিমানকে সিরিয়ার মাটিতে টনকে টন বোমা ফেলতেও দেখতে পাই। এরকম প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যখনই কোনো আলোচনা বা তর্ক-বিতর্কের দ্বার উন্মোচন হয় তখনই কোনো একটি বিচ্ছিন্ন হামলাকে কেন্দ্র করে ভেস্তে যায় সকল আলোচনার প্রয়াস। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষক নেয়াম চমস্কি এই যুদ্ধকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ছায়াযুদ্ধ’ নামে।

চলতি মাসের ২ তারিখ মোট ৪৬জন কয়েদির সঙ্গে শিয়া ধর্মীয় নেতা নিমর আল নিমরেরও শিরশ্ছেদ করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, সৌদি সরকার যাদের শিরশ্ছেদ করেছে তাদের মধ্যে একমাত্র নিমর ছাড়া বাকী সবাই সুন্নি মুসলিম এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাদের শিরশ্ছেদ করা হয়। এবারই প্রথম সৌদি আরব তার নিজের পিঠ বাঁচাতে খুব কৌশলে ইরানকে যুক্ত করলো এই অন্যায্য যুদ্ধে। সুন্নি জাতিগত জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সুন্নি বিশ্বে নতুন নেতৃত্ব দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গত বছর বাদশাহ আবদুল্লাহ মারা যাওয়ার পর ক্ষমতায় বসেন বাদশাহ সালমান এবং তিনি ক্ষমতায় বসায় পর থেকেই ক্রমশ এই সমস্যা ঘণীভূত হতে থাকে।

বিএনডি সৌদি আরব যে সমস্ত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে তারও একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য মতে, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সৌদি আরব দ্য আর্মি অব কনকোয়েস্ট নামের একটি বাহিনীর জন্ম দেয়। এই বাহিনীটি শুরু থেকেই আলকায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং নুসরা ফ্রন্টের অনুগত। আনুগত্যের বাইরে আহরার আল সাম সংস্থাটির আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে এই বাহিনীর। ইদলিব প্রদেশে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি স্থানে তারা সফলতাও পেয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উপর এবং সেনাবাহিনীর উপর বোমা হামলা চালিয়ে যুদ্ধটিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে সৌদি আরব। তবে এমন যুদ্ধকালীন সময়ে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে আল কায়েদা, যাদেরকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে কয়েক বছর ধরেই ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে যুবরাজ মোহাম্মদ সালমানের চালানো এই যুদ্ধাভিযান একটিও সফল হয়নি। কিন্তু নিজেদের গৃহাভ্যন্তরে সমর্থন আদায় করতে তারা সক্ষম হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি আরও সতর্ক করে জানায়, ‘বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুবরাজ সালমান সিংহাসনে বসেছেন সত্যি কিন্তু গোটা রাজতন্ত্র থেকে শুরু করে বৈদেশিক নীতি পর্যন্ত আজ এই যুবরাজের কারণে হুমকির মুখে। যত দিন যাচ্ছে ততই যুবরাজ ক্ষমতার অপব্যবহার করেই যাচ্ছেন। গত সপ্তাহে ইরান ইস্যুতে রিয়াদ নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে। সৌদি আরব ভাবতে পারেনি যে, তেহরানে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে এবং তাদের দূত মাসাদের উপর হামলা হবে এবং ইরানের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এই ঘটনার পরপরই ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব।

কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, সৌদি নেতৃত্ব ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেয়েও অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। যে কারণে রাজনৈতিক তাপমাত্রা আরও কয়েক ধাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই তারা চটজলদি চার ইরানিকে বিচারের আওতায় এনেছে। তাদের মধ্যে একজন গুপ্তচরবৃত্তি এবং তিনজনকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকেই এই চারজন সৌদি আরবের কারাগারে অন্তরীন আছে এবং ঠিক কি কারণে তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল তাও স্পষ্ট নয়। যুবরাজ মোহাম্মদ দ্য ইকোনোমিস্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তা এই অঞ্চলের ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে এবং এর প্রভাব বেশ জোরালোভাবেই বিশ্বের বাকী দেশগুলোর উপরও পরবে। এটা নিশ্চিত যে আমরা এটা হতে দিতে পারি না।’

যুবরাজের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে যে তিনি বিশ্বের শান্তি ও সুরক্ষায় অনেক চিন্তাশীল। কিন্তু এটা পরিস্কার যে, যুবরাজ মোহাম্মদ অনেক বেশি অনভিজ্ঞ এবং নিজের ক্ষমতার বাইরে তিনি বাজি ধরেছেন। অর্থাৎ সৌদি আরবের সাবেক শাসকদের ঠিক উল্টো অবস্থানে অবস্থান করছেন তিনি। আর এর মূল কারণ হলো, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি। ১৯৩০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে সৌদি আরব তাদের রাজতন্ত্র সুসংহত করে আসছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তিকে ভালোভাবে দেখছে না সৌদি আরব।






মন্তব্য চালু নেই