মেইন ম্যেনু

“এক হাতে ইফতারি খাই, আরেক হাত দিয়ে বাঁশি বাজাই” এ যেন এক অন্য রকম জীবন

সোনারগাঁও হোটেলের মোড়ে গতকাল রোববার তখনো গাড়ির চাপ। ইফতারের সময় হয়ে গেছে। হন্তদন্ত হয়ে এক ব্যক্তি ট্রাফিক পুলিশ বক্সে গিয়ে জানালেন, যানজটের কারণে বাসায় যেতে পারেননি, ইফতার করার পানি চান।

শুধু পানি নয়, অন্য খাবার দিয়ে ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়েই ইফতার শুরু করলেন ট্রাফিক পুলিশ। ইফতারি দিলেন ছিন্নমূল নারী ও শিশুর হাতেও। তড়িঘড়ি ইফতার শেষ করে ট্রাফিক পুলিশ আবার দৌড়ে গেলেন সড়কে, যানজট নিয়ন্ত্রণে।

পবিত্র রমজান মাসে এভাবে প্রতিদিন ইফতার করতে হয় ট্রাফিক পুলিশদের। কখনো পুলিশ বক্সে দল বেঁধে, কখনো সড়কে দাঁড়িয়ে। এক হাতে ইফতারি খান, খাওয়ান আর আরেক হাতে দেন সংকেত। ‘এভাবে ইফতারি করতে কষ্ট হয় না’ প্রশ্ন করলে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদসংলগ্ন মোড়ে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ হেসে বললেন, ‘এটাই তো আমাদের জীবন। সড়কেই কাজ, সড়কেই ইফতার।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ঢাকা শহরে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের জন্য তাঁরা ১ হাজার ৭০০ প্যাকেট ইফতারি বিতরণ করেন। ১ হাজার ১০০ প্যাকেট দেয় একটি বেসরকারি মুঠোফোন কোম্পানি। ৬০০ প্যাকেট দেওয়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।

কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ জানান, প্রতিটি প্যাকেটে থাকে ছোলা-মুড়ি, একটি জিলাপি, দুটি বেগুনি, দুটি পেঁয়াজু, দুই টুকরো শসা, একটি আলুর চপ ও দুটি খেজুর। সঙ্গে দেওয়া হয় এক বোতল মিনারেল ওয়াটার। কিন্তু থাকে না কোনো জুস কিংবা শরবত। তাই অনেকেই নিজেরা টাকা তুলে বানিয়ে নেন শরবত।

রাজধানীর আসাদগেটের সিগন্যালে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের একজন সদস্য বলেন, ‘খেজুর ছাড়া অন্য কোনো ফল আর জুসটুস থাকলে ভালোই হইত।’

এ ব্যাপারে যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন বলেন, অন্য ফল ও জুস রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

গতকাল বিকেলে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদসংলগ্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল রাজীব হোসেন। কিছুটা ক্লান্ত। বললেন, ‘রোজা রাখছি। একটু টায়ার্ড। এভাবেই কাজের মধ্যেই ইফতার করতে হয়।’

মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে ট্রাফিক পুলিশের একজন সদস্য বললেন, ‘ইফতার দাঁড়াইয়া করব না বইসা করব, তা নির্ভর করে গাড়ির ওপর। গাড়ির চাপ থাকলে দাঁড়াইয়া ইফতারও করি, কাজও করি।’ গাবতলীতে সার্জেন্ট জসিম উদ্দিনও বললেন একই কথা।

খামারবাড়ি মোড়ে সার্জেন্ট জুলহাস উদ্দিন যানজট দেখিয়ে বললেন, ‘দেখেন কেমন যানজট। আরামে পুলিশ বক্সে গিয়া ইফতার করলে তো প্যাঁচ লাইগা যাবে।’ একই এলাকায় কয়েকজন পুলিশ বললেন, ঈদের কেনাকেটার কারণে যানজট আরও বাড়বে। ফলে বাড়বে তাঁদের কষ্টও।’

প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে বেলা দুইটা ও বেলা দুইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই পালায় দায়িত্ব পালন করে ট্রাফিক পুলিশ। বেলা দুইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশদের জন্যই মূলত সরবরাহ করা হয় ইফতারি। এক দিন পরপর একেকজনের ওই সময়ে দায়িত্ব পড়ে। জাতীয় সংসদের সামনে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কনস্টেবল আতিকুর রহমান বলেন, ‘১০-১২ বছর ধরে এই পেশায় আছি। তাইলে ধরে নেন, এ সময়ে জীবনের অর্ধেক ইফতার হইছে রাস্তায় রাস্তায়।’

ফার্মগেট এলাকায় কনস্টেবল বাহাউদ্দিন বলেন, ‘তাইলে আমাদের সঙ্গে ইফতার করে দেখে যান আমরা কেমন ইফতার করি।’ বললেন, ‘আপনি শুধু ইফতারের সময় ফার্মগেট আর বিজয়নগর এলাকায় ঘুরে যাবেন। আমাদের ইফতারটা আরও বুঝতে পারবেন।’

সোনারগাঁও হোটেল মোড়ে যেতে যেতেই ইফতারের সময় হয়ে যায়। পুলিশেরা একে একে হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। কয়েকজন তখনো রাস্তায়। ইফতারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক খাদেমুল হাসতে হাসতে বলেন, ‘প্রায় সময় এক হাতে ইফতারি খাই। আরেক হাত দিয়ে বাঁশি বাজাই।’ বললেন, ‘রাস্তায় ইফতারি করতে কষ্ট লাগে। তবে সবাই মিলে ইফতারি করি, এটাতেই একটা আনন্দ আছে। এটা অন্য রকম একটা জীবন।’






মন্তব্য চালু নেই