মেইন ম্যেনু

এখনও রাষ্ট্রের কাছে “সম্মানেয় ব্যক্তি” মুজাহিদ!

একাত্তরের খুনি বাহিনী আলবদর কমান্ডার জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে। অথচ রাষ্ট্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ অবদান’ হিসেবে এখনও পুরস্কৃত এই মানবতাবিরোধী অপরাধী। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিশেষ কোটায় তাকে রাজধানীতে দেয়া প্লটটি এখনও বাতিল করেনি সরকার।

আলবদর বাহিনীর আরেক নেতা বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এখনও রাষ্ট্রের চোখে একইভাবে ‘সম্মানেয় ব্যক্তি’। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নিজামী ও মুজাহিদকে কথিত রাষ্ট্রীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বনানী ও উত্তরায় দুটি প্লট দেওয়া হয়। সাঈদীকে প্লট দেয়া হয় পূর্বাচলে।

মুজাহিদের ফাঁসি হওয়ার কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে মুক্তিযুত্থের পক্ষের শক্তির মানুষদের মধ্যে। কিন্তু তার শাস্তি কার্যকর হলেও একাত্তরের ক্ষতের উপশম পুরোপুরি হবে কি? তাদেরকে রাষ্ট্রীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বনানী ও উত্তরায় বরাদ্দ দেয়া দুটি প্লট এখনও গলার কাঁটা হিসেবে বিঁধে আছে রাষ্ট্রে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির মানুষরা।

যুদ্ধাপরাধ প্রমাণের পরও প্লট বাতিল না হওয়ায় ক্ষোভ

চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে প্রশাসন এবং সরকারের ভেতরে প্রশ্ন ওঠলেও জোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় হওয়ার আগে বিষয়টি গোপন থাকে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বিষয়টি। এরপর নানা সমালোচনা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ হলেও নিজামী-মুজাহিদের প্লট বাতিলে সিদ্ধান্তহীন থাকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজামী-মুজাহিদের বিচার শুরু হলে আবারও দাবি ওঠে আলবদর নেতার প্লট বাতিলে। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। বুদ্ধিজীবী হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির আদেশ হয়েছে নিজামীর। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করায় আইনের চোখে তাকে এখনো দণ্ডি হয়ত বলা যায় না। কিন্তু মুজাহিদকে বলা যায় আইনগত ভাবেই।

বুদ্ধিজীবী হত্যায় প্রাণদ-প্রাপ্ত আলবদর নেতা রাষ্ট্রীয় অবদানের জন্য প্লট পাবেন সেটা মানতে পারেন না শহীদ বুদ্ধিজীবী চিকিৎসক আলীম চৌধুরীর মেয়ে চিকিৎসক নুজহাত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের অপরাধীদের রাষ্ট্র কোনোভাবেই পুরস্কৃত করতে পারে না। তারা কী অবদান রেখেছে, উল্টো তো এই রাষ্ট্র আর তার নাগরিকদের ধ্বংসের জন্য কাজ করেছে’। আলবদর নেতারা প্লট পেয়েছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিবারকে কি সরকার তা দিয়েছে? নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু চাই না। আমার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা নেই। কিন্তু আমি মনে করি, যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সময় মতো সহায়তা না পাওয়ায় ওঠে দাঁড়াতে পারেনি তাদের জন্য রাষ্ট্রের অনেক করণীয় আছে’।

শহীদ বুদ্ধিজীবী আলীম চৌধুরীর মেয়ে বলেন, ‘নিজামী-মুজাহিদকে দেওয়া প্লট বাজেয়াপ্ত করতে হবে। কেবল এই দুজনের নয়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত সবার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সে টাকা দিয়ে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারকে পুনর্বাসিত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার কেবল সাজা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। যুদ্ধাপরাধীরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে আর যারা এ দেশের জন্য লড়াই করেছেন তাদের পরিবার ধুঁকে ধুঁকে মরবে এটা হতে পারে না।’

নিজামী-মুজাহিদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের প্লট বাতিলের বিষয়ে সে সময়ের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেছিলেন, চূড়ান্ত রায় হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

আলবদর নেতা মুজাহিদের যেসব অপরাধ প্রমাণ হয়েছে

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষের শক্তিকে দমাতে গঠিত আলবদর বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধে মুজাহিদের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে আপিল বিভাগে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের আগে আগে স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে এ দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আলবদর বাহিনী। এই বাহিনী গঠনের শুরুতে মুজাহিদ ছিলেন দ্বিতীয় প্রধান। পরে নিজামী জামায়াতে যোগ দিলে মুজাহিদই হন বাহিনীটির প্রধান।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পশ্চিম পাকিস্তানে যে গোপন প্রতিবেদন পাঠাত তাতে আলবদর বাহিনীর পক্ষে নিজামী-মুজাহিদের তৎপরতার কথা বিস্তারিত লেখা আছে। এতে দেখা আছে, আলবদর বাহিনী সংগঠনে আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করে দিতে দেশজুড়ে এই দুই নেতা চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ। ঢাকার মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং আলবদরের ক্যাম্পেও নিয়মিত যাতায়াত করতেন মুজাহিদ। মুক্তিযুদ্ধের আগে আগে সেখানে আলবদর বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মুজাহিদ তার কর্মীদের আত্মগোপনে যাওয়ার কথা বলেন। তিনি এও বলেন, সময় ভালো হলে আবারও ফিরে আসবেন তারা। বুদ্ধিজীবী হত্যা ও স্বাধীনতাকামীদের গণহত্যা, নির্যাতনের দায়ে মুজাহিদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেয় ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, অপহরণ করে আটক রাখা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, এসব অপরাধে সহযোগিতা, প্ররোচনা, উসকানি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট সাতটি অভিযোগ এনেছিলেন প্রসিকিউশন। যার পাঁচটিই প্রমাণ হয়েছে। আপিল বিভাগ তার রায়ে বলেন, আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে এই বাহিনীর যত নৃশংসতা আছে তার দায় মুজাহিদের উপরও পড়ে। আর এই বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়েই ফাঁসির আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।

এছাড়া ফরিদপুরের রণজিৎ নাথকে আটক ও নির্যাতন, ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগও প্রমাণ হয় মুজাহিদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং দ্বিতীয় অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে জামায়াত নেতার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যার ঘটনার অভিযোগও প্রমাণ হয়েছে মুজাহিদের বিরুদ্ধে। তবে ট্রাইব্যুনাল তাকে এই অভিযোগে প্রাণদণ্ড দিলেও আপিল বিভাগ দেয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

বহুতল বাড়ি উঠেছে নিজামী-মুজাহিদের সরকারি প্লটে

জোট সরকারের শেষ বছরে এসে ২০০৫ সালে এসে রাজধানীর দুই অভিজাত এলাকায় প্লট বাগিয়ে নেন নিজামী ও মুজাহিদ। রাজউক জানায়, ঢাকায় নিজের নামে কোনো জায়গা নেই এমন যুক্তি দেখিয়ে প্লট বরাদ্দ দিতে রাজউকের কাছে আবেদন করেন সে সময়ের মন্ত্রী দুই আলবদর নেতা।

২০০৫ সালের ২৫ অক্টোবর রাজউকের ১৬২তম বোর্ড সভায় তাদের নামে পাঁচ কাঠার করে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৬ সালের ১৬ মার্চ দুজনকেই বরাদ্দপত্র বুঝিয়ে দেয় রাজউক। এর মধ্যে নিজামীকে দেওয়া হয় বনানীর জে ব্লকের ১৮ নম্বর রোডের ৬০ নম্বর প্লট। আর মুজাহিদ পেয়েছেন উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর রোডের ৫ নম্বর প্লটটি। দুটির পরিধিই পাঁচ কাঠার।

রাজউক জানিয়েছে, ভূমি বরাদ্দ বিধিমালার ১৯৬৯ (সংশোধিত) ১৩/ক ধারাবলে তাদের প্লট দেওয়া হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট ব্যক্তি যার রাজধানীতে থাকার জায়গা নেই, তাকেই প্লট বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এ ধারায় রাজউকের প্লট পাওয়ার যোগ্য। বরাদ্দ পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ে বনানী লেকে নিজামীর প্লটে সাততলা ভবন উঠে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিশন নাহার। প্রতিটি তলায় আছে ১৮১০ বর্গফুটের দুটি করে ফ্ল্যাট। এই ভবনের ছয়তলায় থাকেন নিজামীর পরিবার। মিশন ডেভেলপার নামে জামায়াতপন্থি একটি কোম্পানির তৈরি বাড়িতে আছে ১২টি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে ছয়টি পেয়েছেন নিজামী, ছয়টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য কম করে হলেও দুই কোটি টাকা। এভাবে মন্ত্রী থেকে কমপক্ষে ১২ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন নিজামী।

উত্তরায় মুজাহিদের ছয়তলা ভবনটির নাম ‘মিশন তামান্না’। অর্ধেক ভাগাভাগির শর্তে সেই মিশন ডেভেলপার গড়ে তুলেছে প্লটটি। এই বাড়ির পাঁচটি ফ্ল্যাটের মালিক মুজাহিদ। এই ভবনের তৃতীয় তলায় থাকেন মুজাহিদের পরিবার। মিশন ডেভেলপারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিচতলায় গাড়ি পার্কিংসহ অন্য পাঁচটি ফ্লোরে রয়েছে দুটি করে মোট ১০টি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ১৪৬২ বর্গফুট। এই এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম দেড় কোটি টাকার বেশি।

যোগাযোগ করা হলে রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যে ধারায় তাদের প্লট দেওয়া হয়েছে, তাতে ধারাটির অপব্যবহার হয়েছে। কিন্তু আমাদের পক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্লট দুটির বরাদ্দ বাতিল করা সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা এলে বাতিল করতে পারব। এর আগেও এভাবে বরাদ্দ দেওয়া প্লট বাতিলের নজির আছে এবং সেটা সরকারই করেছে।’

রাজউকের কর্মকর্তারা জানান, দুই আলবদর নেতাকে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্লট বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আলোচনা ওঠার পর সে সময় প্রতিক্রিয়া হয় রাজউকে। কিন্তু সরকারের বিশেষ নির্দেশনা থাকায় সংস্থাটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এর বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেনি।ঢাকাটাইমস






মন্তব্য চালু নেই