মেইন ম্যেনু

এবার গাছের সঙ্গে বেঁধে দুইজনকে নির্যাতনের ভিডিও ফাঁস

সুপারি বাগান। বাগানের দু’টি গাছে পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা হয়েছে সাকিব হোসেন ও আবু সামাকে। তাদের ঘিরে উৎসুক শিশু-কিশোরসহ বেশ কয়েকজন জটলা করছে। চুরির অভিযোগে তাদের ডেকে এনে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।

এদের মধ্যে হালকা সবুজ রঙের টিশার্ট পরা কিশোর সাকিব মাদরাসা ছাত্র। লজ্জায় তার মাথা নুইয়ে পড়ছে। আর সামা আকাশের দিকে চেয়ে বলছেন, ‘হে আল্লাহ, বিনা অপরাধে এরা এসব করতাছে, মারতাছে। তুমি এর বিচার কইরো আল্লাহ।’

এ সময় কয়েকটি শিশুকে মলিন মুখে তাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এরপর হলুদ রঙের টিশার্ট পরা এক যুবককে একগোছা কঞ্চি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

এরপর একটি কঞ্চি নিয়ে গাঢ় সবুজ রঙের টিশার্ট পড়া আবুল কাশেম নামে এক তরুণকে দেখা যায় একবার সাকিবকে ও একবার সামাকে পিটাচ্ছেন। আর বলেছেন, ‘স্বীকার কর, স্বীকার কর।’

এর আগে সামা তার মরা বাবা-মা ও দুই ছেলের নামে কসম কেটে বলতে থাকেন তিনি নির্দোষ।

এটি একটি নির্যাতনের ভিডিও’র অংশ বিশেষ। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মাছগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ মালিপাড়া গ্রামে নির্যাতনের এই ভিডিওচিত্রটি ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সিলেটের শিশু রাজনের নির্যাতনের ভিডিও ঠিক একইভাবে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

Capture

নাটোরের এ নির্যাতনের ভিডিওটি ফেসবুকে আসার পরই টনক নড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। অভিযুক্তদের আটক করতে মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। যদিও কাউকে আটক করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) শ্যামল কুমার মুখার্জী জানান, এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে জড়িতদের আটকে অভিযান চালানো হচ্ছে। তারা পলাতক থাকায় এখনো কাউকে আটক করা যায়নি।

দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

নির্যাতিতদের পরিবারেরও দাবি দোষীদের দ্রুত আটক করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

শুক্রবার বড়াইগ্রাম উপজেলার মাছগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ মালিপাড়া গ্রামে বুলবুল হোসেনের মুদির দোকানে ও বাড়িতে চুরি হয়। এ চুরির দায়ে রবিবার বিকেলে সৌদি প্রবাসী রবিউল করিমের নির্দেশে একই গ্রামের মিজানুর রহমানের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলে সাকিব হোসেন ও মৃত আমির হোসেনের ছেলে আবু সামাকে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর তাদের ধরে এনে সুপারি গাছের সঙ্গে পিঠমোড়া করে বেঁধে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয়।

এই নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়ার পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। বুধবার এই প্রতিবেদক সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, নির্যাতনের আগে ওই দু’জনের পরিবারকে খবর দিয়ে ডেকে আনা হয় এবং তাদের সামনে নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তারা তাদের উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এলে হুমকি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনকারীদের ভয়ে তারা হাসপাতালে ভর্তি বা থানায় অভিযোগ করতে পারেনি। বর্তমানে তারা বাড়িতে চিকিৎসাধীন।

এ ব্যাপারে নির্যাতিত আবু সামা বলেন, ‘আমাকে অন্যায়ভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। আবার রবিউলের লোকেরা হুমকি দিচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হলে বা থানায় অভিযোগ করলে প্রাণে মেরে ফেলা হবে।’

গুনাই হাকিম ফাজিল মাদরাসার অস্টম শ্রেণীর ছাত্র সাকিব হোসেন জানায়, তাকে ডেকে নিয়ে সুপারি গাছের সঙ্গে বেঁধে কঞ্চি দিয়ে বেধড়ক পিটানো হয়েছে। সে নির্দোষ। অন্যায়ভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। সে দোষীদের বিচার ও শাস্তি চায়।

সাকিব হোসেনের মা হাসিনা বেগম জানান, তার ছেলে নির্দোষ। তিনিও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।

নির্যাতিত সামার স্ত্রী রেহেনা বেগম জানান, তাকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে তার সামনে তার স্বামীকে নির্যাতন করা হয়। এ সময় তিনি স্বামীকে নির্যাতন না করার জন্য আকুতি-মিনতি করলেও তারা কোনো কথা শোনেনি।

মাছগাঁও ইউনিয়ন ওর্য়াড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সোবহান জানান, চুরির অভিযোগে নেছামুদ্দিন হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলামের নির্দেশে মোকলেছুর রহমানের ছেলে সাইদুল ইসলাম তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়েছে।

এ ব্যাপারে রবিউল করিম বলেন, ‘এভাবেই আমাদের সামাজিক বিচার করা হয়। আমি থাকায় তাদের বেশি মারধর করা হয়নি। এখন আবার মানবিক কারণে আমিই তাদের চিকিৎসা করাচ্ছি। আর আমিতো একা নই; মহিদুল, শাহজাহান, শফিকুলসহ অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন সেই বিচারে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করি। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে আপোস-রফা করার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইউসুফ আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়ভাবে আপোস-রফার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্ভব না হলে পরে থানায় অভিযোগ করতে বলেছেন।’






মন্তব্য চালু নেই