মেইন ম্যেনু

এবার তেল-গ্যাস ছাড়াই চলবে ‘মোটরবাইক’ ॥ তৈরী করলেন একাদশ শ্রেণির ছাত্র মুন্না

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র মুন্না। তেল-গ্যাস ছাড়াই চলা মোটরবাইক উদ্ভাবন করেছে। মুন্না আর মুন্নার বাইক নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন চট্টগ্রাম থেকে নূপুর দেব

পেছনের কথা

‘চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর এলাকায় আমার বাবার একটি মৎস্য খামার আছে। সেখানে যেতে-আসতে পাড়ি দিতে হতো ১৮-২০ কিলোমিটার পথ। বাইসাইকেলে যাওয়া-আসা করতে হতো। কষ্ট হতো, সময়ও লাগত বেশি। সময় আর কষ্ট কমানোর কথা চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ মোটরবাইক তৈরির কথা ভাবলাম। গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে কাজও শুরু করে দিলাম। টানা আড়াই মাস কাজ করার পর গত বছরের ৩০ অক্টোবর উদ্ভাবন করলাম এই মোটর বাইক।’-মোটরবাইক উদ্ভাবনের পেছনের কথা এভাবেই জানাল মুন্না। তার এই উদ্ভাবিত বাইক বেশ সাড়া ফেলেছে।

মুন্নার বাইক

এলাকায় মুন্নার বাইক বলে পরিচিত হলেও, মুন্না নিজে বাইকের নাম দিয়েছে ‘গ্যালাক্সি বাইক’। চলবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস ছাড়া পাওয়ার ইনভাইটার সিস্টেমে। ধোঁয়াও নেই। তাই পরিবেশবান্ধব। এতে রয়েছে পাঁচটি ব্যাটারি ও একটি চার্জার। একবার চার্জ দিলে যাবে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে বাইকের সর্বোচ্চ গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার। আর প্রতি কিলোমিটার যাতায়াতে খরচ হবে মাত্র ৩৫ পয়সা। বাইকের চেসিস, বডি সম্পূর্ণ স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। এ জন্য দীর্ঘ ব্যবহারেও মরিচা পড়বে না। সাধারণ মোটরসাইকেলের মতো সিগন্যাল বাতি, হর্ন, হেডলাইট, ব্রেকলাইট, ড্রাম ব্রেকও কাজ করবে।

গ্যালাক্সি বাইক

মুন্নার মতে তার উদ্ভাবিত গ্যালাক্সিবাইক নিয়ন্ত্রণ করা খুবই সহজ ও নিরাপদ। পরীক্ষামূলকভাবে মোটারবাইকটি চালিয়েছে সে। সে নিজেও চায় তার বাইকটি ছড়িয়ে পড়ুক দেশ-বিদেশে। কিন্তু এ জন্য তো কোনো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা দরকার। কেউ এগিয়ে এসেছে কি না জানতে চাইলে মুন্না জানায়, ‘দু-একটি প্রতিষ্ঠান এসেছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে দরদামে মিলছে না। তবে আমি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের সহযোগিতায় এখন কাজ করে যাচ্ছি। উৎপাদন ও ব্যবহারে যাতে খরচ আরো কমিয়ে আনা যায় সে জন্য গবেষণা করতে আমাকে তাঁরা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।’

গ্যালাক্সিবাইক তৈরির পর সরকারের আইটি মন্ত্রণালয় থেকে মুন্নাকে গবেষণা কাজে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের জানান, আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ইনোভিশন ফান্ড থেকে মুন্নাকে প্রাথমিকভাবে চার লাখ টাকা সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে আরো দেওয়া হবে।’

বর্তমানে বাইকটিতে প্রতি ১৮ মাস পর পর ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হবে।

বাইকের দাম

বাইকটি তৈরি করতে মুন্নার খরচ হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। তবে মুন্না জানায়, হাতে তৈরি করায় এর উৎপাদন খরচ এত। মেশিনে তৈরি করলে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বাইক উৎপাদন করা সম্ভব। বাণিজ্যিক উৎপাদনে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার এগিয়ে এলে দেশের জ্বালানি খরচ কমানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

উদ্ভাবক মুন্না

পুরো নাম মনোয়ারুল ইসলাম মুন্না। বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায়। ওই উপজেলা পরিষদের পশ্চিমে পেশকার বাড়ির মৎস্য খামারি তাজুল ইসলাম ও মনোয়ারা বেগমের বড় ছেলে। ২০১১ সালে চিটাগাং টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ২৪ পেয়ে পাস করে মুন্না। ওই বছর একাদশ শ্রেণিতে সীতাকুণ্ড কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু অভাব-অনটন ও বিভিন্ন সমস্যার কারণে ২০১৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে না পারলেও নানা গবেষণা চলতে থাকে মুন্নার। অনেক নির্ঘুম রাত কেটেছে গবেষণার কাজে। মুন্না জানায়, ‘২০১০ সাল থেকে আমি গবেষণার কাজ শুরু করি। প্রথমে আমি ডিজিটাল মোবাইল পাওয়ার অন-অফ বোর্ড নিয়ে কাজ করেছি। অর্থাৎ মোবাইলের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ, জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা। গত ৫ বছরে আমি ১৮টি বিষয়ে কাজ করেছি। এর মধ্যে মোটরবাইক হচ্ছে আমার ১৮তম গবেষণা।’

মুন্নার স্বপ্ন

প্রাকৃতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে এক মাস ধরে কাজ করছে মুন্না। এ কাজ সফল হলে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হবে না বলে জানায় সে। তার মতে, প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা যাবে।

এই যে এত এত গবেষণা করছে মুন্না, গবেষণায় খরচ হচ্ছে। খরচের টাকা কোথায় পাচ্ছে? মুন্না বলল, ‘মোটরবাইক নিয়ে আরো কাজের জন্য সরকার তো সহযোগিতা করছে। এ কাজ করতে আরো বছরখানেক সময় লাগতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আরো একটি স্বপ্নের প্রজেক্টে অর্থ খরচ হচ্ছে মৎস্য খামারে উপার্জিত আয় থেকে। এসব কাজে মা-বাবা আমাকে উৎসাহ জোগাচ্ছেন।

আরো একটি স্বপ্ন! কী সেই স্বপ্ন? জানা গেল, একটি জেট বিমান তৈরির স্বপ্ন দ্যাখে মুন্না। স্বপ্নের জেট বিমানের ডায়াগ্রাম তৈরির কাজ করছে সে এখন। গ্যালাক্সি বাইকের মতো সে স্বপ্নও একদিন বাস্তব হবে বলে মুন্নার বিশ্বাস।






মন্তব্য চালু নেই