মেইন ম্যেনু

এবার রংপুরে পৈশাচিক শিশু নির্যাতন! ধামাচাপার চেষ্টা

দেশে শিশু নির্যাতন যেন কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। সংবাদ মাধ্যম এবং প্রশাসনযন্ত্রে এ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল হলেও তা যেন অপরাধীদের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। সিলেটে রাজন হত্যাসহ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্নস্থানে শিশু নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনায় প্রশাসনিক কিছু পদক্ষেপ নেয় হলেও নির্যাতন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ রংপুরের গঙ্গাচড়ায় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রের ওপর নির্যাতনের মাত্রা চলচ্চিত্রকেও হার মানিয়েছেন।

রাকিবুল ইসলাম নামের এই শিশুরকে চুরির অপবাদ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। রশি দিয়ে বাঁধার সাথে যোগ হয়েছে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করা, গরম পানি গায়ে ঢেলে সূর্যের দিকে চোখ দিয়ে রাখার মতো গা শিউরে উঠা সব নির্যাতন করা হয়েছে তার উপর।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি রাকিবুল। ১৮ দিনেও উঠে দাঁড়াতে পারছে না অবুঝ এই শিশুটি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে সবার দিকে তাকাচ্ছে। শুধু তাই নয়, পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেয়া হলেও পুলিশ এবং এলাকার মাতবররা ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে মিমাংসার নাটক বানিয়েছে।

পুলিশ বলছে, কেউ অভিযোগ না করায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। যেভাবে শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়েছে তার উপযুক্ত বিচার হওয়া দরকার। কিন্তু পুলিশের এই কথা আর কাজে হতবাক হয়েছেন রাকিবুলের স্বজনরা। তারা বলছেন, পুলিশ বলছে আইনের কথা আর পুলিশের সামনে বসেই ঘুরে বেড়াচ্ছে নির্যাতনকারীরা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই বাবার ধমক খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিনভর ঘোরাফেরা শেষে আবুলিয়া বাজারে যায় শিশু রাকিবুল ইসলাম। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেয় কাজী তালেব মাস্টারের দোকান বসুনিয়া স্টোরে। ভোরবেলা দাড়োয়ান টের পেয়ে খবর দেয় মালিককে। শুরু হয় চুরির অপবাদে অমানুষিক নির্যাতন।

সকালে এ নিয়ে বসে সালিশ। ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা দোকান থেকে চুরি করেছে বলে দোকানের মালিক তালেব দাবী করলে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় রাকিবুলের বাবা আশরাফের কাছে। নিরুপায় দিনমজুর আশরাফ সাথে সাথেই তালেব কাজির হাতে ছেলে রাকিবুলকে তুলে দিয়ে দয়া ভিক্ষা চান। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে তালেব রাকিবুলকে আবারও বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শুরু করে নির্যাতন।

স্থানীয় দুলু মিয়া জানান, সূর্য উঠার পর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে দফায় দফায় নির্যাতন। এরপর জ্ঞান হাড়িয়ে ফেললে স্থায়ী একটি ফার্মেসিতে প্যারাসিটামল খাইয়ে সুস্থ্য করার চেষ্টা করা হয়। এরপর বেলা ১২টা থেকে তালেব তার বাড়িতে নিয়ে দ্বিতীয় দফার অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। পেছন দিয়ে হাত পা বেধে সূর্যের দিক উপুড় করে রাখা হয় ছোট্ট রাকিবুলকে। এরপর ইনজেকশন দিয়ে শরীর অসাড় করে পায়ের তলা থেকে শুরু করে দু’পায়ে বেদম পিটুনি দেয় তালেবের তিন ছেলে আসাদ, দুখু আর মিঠু।

এসময় সঙ্গা হরিয়ে ফেলে রাকিবুল। পরে বাড়ির পেছনে একটি গাছের সাথে বেধে ৩য় বারের মত নির্যাতন শুরু হলে দয়া হয় এক নারীর। অবুঝ এই শিশুর উপর নির্যাতন দেখতে না পেরে নিজেই শিশুর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে শিশুটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয়রা এসে শিশু রাকিবুলকে উদ্ধার করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দ্বিতীয় বারের মত স্থানীয় মেম্বার বাকেরের মধ্যস্থতায় জরিমানা টাকার বদলে তালেব কাজি ৩০ হাজার টাকা চিকিৎসার জন্য দেয়ার নাটক সাজান। রাকিবুলের উপর দোষ চাপিয়ে সেখান থেকে সটকে পড়েন ওই মেম্বার। এখন তিনিই সব দেনদরবার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এটা স্থানীয় বিষয়, তা মিমাংসা করা হয়েছে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে লাভ কী। প্রয়োজনে আরো ৫ হাজার টাকা রাকিবুলের চিকিৎসার জন্য দেয়া হবে।

রাকিবুলের প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার দিন গুরুতর অসুস্থ রাকিবুলকে প্রথমে রংপুরের গংগাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে অবস্থার আরো অবনতি হলে লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আরো অবনতি ঘটলে রাতেই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় রাকিবুলকে। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।

রাকিবুলের চাচা আতাউর রহমান জানান, আমি থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ এসে রাকিবুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। এরই মধ্যে থানায় আটকও হয় তালেব কাজি। অবস্থা বেগতিক দেখে জোড়পূর্বক রাকিবুলের চাচা আতাউরকে থানায় নিয়ে গেয়ে নাঈম, আমিন ও ফারুক মিমাংসাপত্রে সই করিয়ে নেয়।

থানা থেকে লিখিত অভিযোগটি হয়ে যায় হাওয়া। এর পর পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে রাকিবুলের উপর নির্যাতনকারীদের। বিষয়টি চারদিকে তোলপাড় শুরু হলে পুলিশ নিজেদের বাঁচাতে নিজেই বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। কিন্তু মামলা হলেও থানার বারান্দায় নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে আসামিরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিন বিনারচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র রাকিবুলের পড়ার টেবিল আর বই আগের মতোই আছে। শধু রাকিবুল আছে হাসপাতালের বেডে, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবম্ব মা বোনসহ এলাকাবাসী। রাকিবুলের অবস্থা দেখে ফুসে উঠে এলাকাবাসি। তারা শনিবার বিকালে ওই এলাকায় মানববন্ধন করে শিশু নির্যাতনকারীদের বিচার দারি করেন।

রাকিবুলের বাবা আশরাফ দাবি করেন, আমার ছেলে আর সুস্থ্য হয়ে ঘরে ফিরবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এর বিচার দাবি করছি। আমি আবার আমার ছেলেকে সুস্থ দেখতে চাই। নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

বেসরকারি এনজিওতে শিশু নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী বিলকিস বেগম জানান, রাকিবুলের উপর নির্যাতনের পর বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা পুলিশকে বলেছি সেফ হোমে রাখার জন্য।

রাকিবুলের পরিবারকে সব ধরণের সহযোগিতা দেয়া হবে।

রংপুরের গংগচড়া থানার ওসি এম এ মান্নান জানান কেউ অভিযোগ না করায় পুলিশ নিজেরা বাদি হয়ে মামলা করেছে। আসামি গ্রেপ্তার করছেন না কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে।






মন্তব্য চালু নেই