মেইন ম্যেনু

জন্মদিনে বিশেষ সাক্ষাতকার

এরাই আমাকে জামায়াত বানিয়েছে : আল মাহমুদ

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। ১১ জুলাই এই কবি ৮১ বছরে পা দিচ্ছেন। তার ব্যক্তি ও কবি জীবনের নানান চিন্তা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তার স্বাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন গোলাম রাব্বানী ও দীপান্বিতা ইতি।

অলস দুপুর। রোদের ঘ্রাণ মেখে শরীরে আমরা হাজির হই মগবাজারের গৌমতী আয়েশা ভিলায়। এ বাড়ির এক ফ্লাটে থাকেন কবি আল মাহমুদ। আলো আঁধারের মাঝে কবির ঘুম ঘরেই বসে চলে আড্ডা। বিছানার মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে বসেন কবি। কথা চলে আমাদের…

কেমন আছেন?
আল মাহমুদ: ভালো আছি…

শুনলাম আজ সন্ধ্যায় একটা দাওয়াতে যাবেন…
আল মাহমুদ: আমার গাড়িও নাই, লোকজনও নাই। তাই ইচ্ছা করলেই কোথাও যেতে পারি না। অনেক দাওয়াত থাকে কিন্তু যাওয়া হয় না।

এই আশি বছরেও একটা গাড়ি কিনতে পারলেন না।
আল মাহমুদ: আরে ভাই কি বলবো আর সে দু:খের কথা। করতে পারিনি। ছেলে মেয়েদের কারণে হলো না। শুধু টাকা চায়। দিয়েছি টাকা। কিন্তু তারা তো আর কেউ আমার সঙ্গে থাকলো না।

দেশের প্রধান কবি এবং সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে সরকার কি আপনাকে একটা গাড়ি দিতে পারে না…
আল মাহমুদ: [একটু ভাবলেন চোখ তুলে] সে তো আর আমি জানি না। সরকার তো আমার বশ না।

শোনা যায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে আপনাকে একটি বাড়ি দিয়েছিলেন উপহার…
আল মাহমুদ: এরশাদ সাহেব আমাকে কোনো বাড়ি টারি দেয় নাই। বনানীতে আমাকে একটা জমি দিয়েছিলো। আমি বাড়ি করেছিলাম সেখানে। বাড়িটা করেছিলাম লোন করে। এদিকে ছেলে মেয়েরা পড়াশোনার জন্য সব বিদেশে গেল। তাদের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতে টাকা লাগে না ভাই? ফোন দিয়েই বলে আব্বা টাকা পাঠাও, আব্বা টাকা পাঠাও। এক কোটি ষাট লাখ টাকায় বাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। আমি একটা মানুষ কবি, আমার সোর্স অব ইনকাম কি?

লেখা…
আল মাহমুদ: এত টাকা কোথায় পাবো, বাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। তোমরা কি জানতে চাও বলো?

আপনি তো আশি পার করে ৮১ বছরে পা দিচ্ছেন। আপনি কি সকালের আকাশ হতে পারবেন না এ বয়সে?
আল মাহমুদ: এই যে কথা আছে না যে, একটা পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে। আরেকটা পৃথিবীর দাবি। আদায় করতে লাগবে সকালের আকাশের মত বয়স।

আপনার কি সকালের আকাশ হবার মত বয়স নেই?
আল মাহমুদ: না নেই।

কেনো?
আল মাহমুদ : বয়স হয়েছে না। বয়স তো শরীরে চিহ্ন রেখে যায়।

আপনি কি নিজেকে ওল্ড ভাবেন?
আল মাহমুদ: সত্যি কথা বলতে কি এক সময় সেটা অনুভব করি নাই। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছি। পৃথিবীর সবগুলো বড় শহরের ফুটপাত দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। প্যারিস, নিউইয়র্ক, লন্ডন সব বড় শহর।

পর্যটক হয়ে ঘুরেছেন…
আল মাহমুদ : হ্যাঁ, ঘুরেছি, খেয়েছি, সেখানকার কবিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি।

আপনার মনের বয়স কত ফিল করেন?
আল মাহমুদ: [হাসলেন] মনের বয়স তো হিসাব করা যায় না।

মনের তো বয়স বাড়ে না।
আল মাহমুদ : না বাড়বে না কেনো, মনের বয়সও বাড়ে। কারণ কোন কোন ঘটনায় মন কষ্ট পায়, ধাক্কা খায়। এক একটা বছর পার হয় আর শরীরে ধাক্কা দিয়ে যায়।

ধাক্কাটা কি শরীরে লাগে না মনে…
আল মাহমুদ : মাঝে মধ্যে লাগে মাঝে মধ্যে লাগে না।

আপনি তো ৮০ পার করে ৮১ তে পা দিচ্ছেন…
আল মাহমুদ: আপনার বাড়ি কই?

হবিগঞ্জ, আপনার পাশের জেলা…
আল মাহমুদ : হুম, হবিগঞ্জ আমার দাদুর বাড়ি। আমার দাদু জমিদার ছিলো। একটু অত্যাচারিও ছিলো। যাই হোক। সব জমিদারই অত্যাচারি ছিলো। আমার দাদা ছিলেন আব্দুল ওহাব মোল্লা। মোল্লা হল আমাদের উপাধি। হ্যাঁ বলেন আপনারা কিসের জন্য এসেছেন…

আপনার সঙ্গে গল্প করতেই এসেছি…আপনার কথা শুনতে এসেছি।
আল মাহমুদ: আপনার বাড়ি কোথায় রে ভাই…

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, গিয়েছেন নিয়শ্চই। আমাদের একটা বড় রেল জংশন আছে…পাশেই খোয়াই নদী, সুতাং নদ।
আল মাহমুদ : আমি যাইনি, যেতেও পারি হয়তো…মনে নেই।

আপনি কি এখন নিয়মিত লিখতে পারেন…যতটুকু জানি আপনার চোখে সমস্যা আছে। দেখতে পারেন না ঠিক মত।
আল মাহমুদ: নিজ হাতে এখন আর আমি লিখতে পারি না। আমার একটা নাতনি আছে, যখন টেলিফোন করি সে আসে। আমি বলি সে লিখে দেয়। ও আবার ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী। বাংলা ভাষা ভালো জানে না। আগের মত কাগজে কলমে লিখে যে কাটা কুটি করতাম সেটা পারি না। সেটা করতে হলে একজন লেখককে নিঃসঙ্গ থাকতে হয়। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গ থাকা আমার হয় না। যতদিন আমার বউ ছিলো। সে খুব সহযোগিতা করতো। লেখা পড়া বেশি জানতো না কিন্তু খুব ভালো মনের মানুষ ছিলো। গ্রামের মেয়ে ছিলো আমার আব্বা পছন্দ করে বিয়ে করিয়েছিলেন। আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে। আমার পাঁচ ছেলে তিন মেয়ের পুরো সংসারটা সে একা সামলিয়েছে। এখন মনে হয় যে মানুষটা হঠাৎ মরে গেলো।

তিনি মারা যাবার পর আপনার কি নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিলো…
আল মাহমুদ: হ্যাঁ, শূন্যতা পূরণ হয় কি? পূরণ হয় না। আর সে যদি হয় নিজের স্ত্রী তাহলে তো হয় না। বিয়ে করতে পারে মানুষ একটার পর একটা।

আপনি আর বিয়ে করলেন না কেনো?
আল মাহমুদ: আমার ইচ্ছেই করেনি।

আপনার লেখালেখির অনুপ্রেরণা কি আপনার স্ত্রী ছিলেন…
আল মাহমুদ: বললাম তো, সে ছিলো গ্রামের মেয়ে। এসব সে বুঝতো না। সে আমার সাহিত্য তৈরিতে কোনো সহযোগিতা করতে পারতো না। কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসতাম খুবই। দেখতে ভালো ছিলো। লম্বা চওড়া ছিলো। গায়ের রং টকটকা ফর্সা ছিলো। মনে হতো যে ইউরোপিয়ান । বলে না যে দুধের মত সাদা নারী ঐ রকম আরকি। তবে ফ্যাশন ট্যাশন পছন্দ করতো না। গ্রামের মেয়েদের মত শাড়ি পরে থাকতো। আমি মাঝে মধ্যে জোর করে বের করে নিয়ে যেতাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কিন্তু সেখানে সে কারো সঙ্গে কোনো কথা বলতো না।

উনি বেঁচে থাকতে আপনার জন্মদিনে কি করতেন…
আল মাহমুদ: তখন তো জন্মদিন তেমন কোনো উৎসাহের সঙ্গে পালন হতো না। তবে হতো আমাদের বাসায় হতো। আমার স্ত্রী নানা রকম মজার সব রান্না তৈরি করতেন। আমরা পরিবারের সদস্যরা মিলে সেই খাবার খেতাম আনন্দ নিয়ে। দু একজন কাছের বন্ধুদের দাওয়াত দেওয়া হত। এই ছিলো তখনকার জন্মদিনের আয়োজন।

এমনিতে আপনার কবিতা, গল্প আর উপন্যাসে যে নারী চরিত্র পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় আপনি নারী চরিত্রের প্রতি একটু বেশিই দুর্বল ছিলেন মানে বেশি যত্নবান ছিলেন…
আল মাহমুদ: আমার একটা ছোট উপন্যাস আছে যার নাম অর্ধেক মানবী। যার অর্ধেক শরীর মানুষের আর অর্ধেক শরীর অসার। সে চলতে পারতো না, হাঁটতে পারতো না। কিন্তু তার অর্ধেক শরীর ছিলো খুবই সুন্দর। তার যে পেইন, তার যৌনক্ষুধা সব মিলিয়ে লেখাটা তৈরি করেছি। একজন বিদেশী কবি এই ছোট উপন্যাসটাকে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলেন।

পেশাগত জীবনে তো আপনি একজন সংবাদকর্মী ছিলেন। তো আপনার লেখালেখির ক্ষেত্রে কি সংবাদপত্রের জীবন কোনো ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
আল মাহমুদ: না আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। এটার কারণ হলো আমি তো জন্ম থেকেই সংবাদপত্রের মানুষ।

মানে বুঝিনি…
আল মাহমুদ: আমার আব্বা সংবাদপত্রের ম্যানেজার ছিলেন। আমার মা গৃহবধূ ছিলেন। লেখাপড়া তিনি বেশি জানতেন না। কিন্তু অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন দেখতে। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন আপনার মা দেখতে কেমন ছিলেন। আমি তখন বলি যে, আমার মাকে দেখলে ফেরেশতাও লজ্জিত হয়েছে। তিনি এত সুন্দরী ছিলেন।

আপনি কি একাকিত্ব ফিল করেন কি না…
আল মাহমুদ: ভাই এখন আর একাকিত্ব ফিল করি না। কারণ আমি সব সময়ই ব্যস্ত থাকি। মানুষ আসতেই থাকে। তো আমাদের একটা পারিবারিক নিয়ম হলো যদি কেউ আসে তার সঙ্গে আমরা কথা বলি। আমার দশটা কাজ থাকলেও আমি তার সঙ্গে কথা বলি। এটা আমাদের পারিবারিক কালচারের মধ্যে আছে।

আপনার প্রেমের গল্প জানতে চাই…
আল মাহমুদ : আরে শোনো ভাই, প্রেম জিনিসটা যে কি সেটা শিখতে হয়। হৃদয়ের সকল আকুতি এক করে হোয়াট ইজ লাভ শিখতে হয়।

তার মানে আপনাকেও শিখতে হয়েছে।
আল মাহমুদ: নিশ্চয়ই শিখতে হয়েছে। হোমার পড়লেই প্রেম শেখা হয়ে যায়।

সাহিত্যে যৌনতাকে আপনি কিভাবে দেখতে চান…
আল মাহমুদ: শুধু সাহিত্য নয়, যৌনতা সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে। এটা অতি প্রাচীন একটা রিতি। প্রেম বা যৌনতা মানুষকে যেমন ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে তেমনি আবার প্রেম তাজমহলও গড়ে। তেমনি সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারে, রাষ্ট্র ধ্বংস করতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দঅনেক কবির নামেই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে…
আল মাহমুদ : আমার নামেও তাহলে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। আমার ভক্তরা হয়তো করেছে।

এর মাঝে তো আপনার সঙ্গে একটি মেয়ের ছবি দিয়ে কিছু লোক দুষ্টুমি করেছে ফেসবুকে…
আল মাহমুদ: হ্যাঁ শুনেছি আমি বিষয়টি। এটা দুষ্টামি না বোকামি করেছে তারা। যে মেয়েটাকে নিয়ে এ কাজটি করেছে সে মেয়েটি এতো ইনোসেন্ট। বিষয়টি শুনেই আমার লজ্জা লেগেছে।

এবারের জন্মদিনের পরিকল্পনা কি আপনার?
আল মাহমুদ: আমি তো বাসাতেই এবারের জন্মদিনটা পালন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কিছু ভক্তরা প্রেস ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সেখানে আমাকে যেতে হবে। কিন্তু আমি তো গরিব মানুষ ভাই। ওরাই টাকা জোগাড় করে অনুষ্ঠান করছে। কি আর করার যেতে হবে।

আপনার রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে জানতে চাই…
আল মাহমুদ: হ্যাঁ, সেটা অবশ্য আছে। আমি কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মে বিশ্বাস করি। যদিও আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে সেটা করি না। আমি কিছু চাইলেই আল্লাহর কাছে চাই। লোকে বলে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ কি শুনতে পায়? কিন্তু আমার কেনো যেন মনে হয় তিনি কথা বলেন।

এটা তো আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস। প্রত্যেকেরই তার ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে। জানতে চাচ্ছিলাম আপনার রাজনৈতিক অবস্থানের জায়গা। একটা বির্তক তো অনেক পুরাতন। সেটা হলো আপনি নাকি বাংলাদশে জামায়াতে ইসলামকে সমর্থন করেন…
আল মাহমুদ: দেখেন আমি কোনো দিন এবং অতিতেও জামায়াত পন্থী ছিলাম না। এরা আমাকে জামায়াত বানিয়েছে। এবং যারা বানিয়েছে তারা তো দৈত্য বানিয়েছে। এখন দৈত্য তারা সামাল দিতে পারে না। জামাতী কাউকে আমি চিনতামই না। কিন্তু আমার যারা ক্ষতি করতে চেয়েছিলো তারা এটা করেছিলো। আর আপনাকে আমার বলতে কোনো দ্বিধা নাই, তারা কিন্তু নাই। আমি কিন্তু আছি। কারণ আমি তো সাহিত্য করি। আমি কবিতা লিখি, গল্প উপন্যাস লিখি, আমাকে তো গুলি করে মারা যায় না। গুলি করে মারলেও আমি সাহিত্যে থাকবো। না মারলেও থাকবো।

কবিদের মধ্যে এক ধরণের রাজনৈতিক চর্চা সব সময় দেখা যায়। সরকারি দলের সমর্থনে যে কবিরা থাকবেন তারা এক ধরনের সুযোগ সুবিধা পান, আর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলে তার কোনো মূল্যায়নই হয় না। কবিদের রাজনীতি নিয়ে আপনার চিন্তা কি?
আল মাহমুদ: এসব রাজনীতি। আমি একজন কবি আমি রাজনৈতিক নেতা নই। আমি সোজা সরল মানুষ। আপনি যদি আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন আমিও আপনাকে হৃদয় দিয়েই ভালোবাসবো। আপনার সঙ্গে আমার বিনিময় হবে।

আপনকে তো মাঝে মধ্যে অভিনয়ে এবং বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে দেখা যায়…
আল মাহমুদ: এগুলো আগে করেছি। আমি এখনো করবো। আমি গরবি মানুষ তাই না? তাই যে আমাকে পয়সা দিবে আমি তার নাটকে বিজ্ঞাপনে কাজ করবো।

আপনি কি সত্যিই গরিব…
আল মাহমুদ: আমার তো কেউ নাই। ছেলে মেয়েরা যারা আছে সবাই কাছে থাকে না। আমি বর্তমানে থাকি আমার বড় ছেলের বাসায়। সে একটা ছোট চাকরি করে। এক ছেলে বিল্ডিং তৈরি করে। সে আমাকে খুব চেষ্টা করেছিলো তার কাছে নিয়ে যেতে কিন্তু আমার যেতে মন চায়নি।

মৃত্যু নিয়ে আপনার ভাবনা কি?
আল মাহমুদ: আমি তো ভাই মরণ নিয়া চিন্তা করি না। তবে মৃত্যু অবধারিত। জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে…কেউ অমর নাই। তুমি যখন জন্মগ্রহণ করেছো তোমাকে মরতেই হবে, সেটা যুদ্ধে হোক, বিপ্লবে হোক আর অসুখ বিসুখে হোক। মৃত্যু এক অন্ধকার গহ্বর। কিছুই জানো না তুমি। কারণ কেউ তো আর মৃত্যুর গুহা থেকে বের হয়ে আসেনি। সবাই অমর হতে চায়।

আপনিও নিশ্চয়ই চেয়েছেন অমর হতে…
আল মাহমুদ: সবাই অমর হতেই চেয়েছে। কেউ পিরামিড বানিয়েছে, কেউ তাজমহল বানিয়েছে।

এখন আপনার সময় কাটে কিভাবে?
আল মাহমুদ: শারীরিক অবস্থা ভাই খুব একটা ভালো না। আগে তো ঘুরে বেড়াইতাম এখন তো কারো সাহয্য না হলে বেরুতে পারি না।

আপনার আর কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে নানা ধরনের গসিপ শোনা যায়। আপনাদের সম্পর্ক নাকি ভালো ছিল না…
আল মাহমুদ: শামসুর রাহমান হঠাৎ আসতেন আমাদের বাসায়। এসে চুপচাপ একা এক জায়গায় বসে থাকতেন। আমার ওয়াইফকে নাম ধরে ডেকে বলতেন যে নাদিরা আমাকে চা দাও। শামসুর রাহমানের সঙ্গে যে আমার এই সম্পর্ক ছিলো ,এটা তো কেউ ভাই বলে না। আমরা তো আর মারা মারি কাটা কাটি দাঙ্গা হাঙ্গামা করি না। কবিতা লিখি। আমার ভাগ্যটাই খারাপ। সবাই আমার র্দুনাম করেছে।

কবি হিসেবে শামসুর রাহমানকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন…
আল মাহমুদ: সে কবি হিসেবে গ্রেট। মানুষ হিসেবেও ভালো। সব মানুষেরই একটা খারাপ দিক থাকে। তারও হয়তো ছিলো। কিন্তু সেটা আমার জানা নেই।

সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: ওনার লেখা আমার পড়া হয়নি। ওনার সম্পর্কে আমি খুব একটা জানি না। তার সঙ্গে আমার মেলা মেশাও কম হয়েছে। তবে তার ওয়াইফ আনোয়ারা সৈয়দ হককে আমি জানতাম তার বিয়ের আগে থেকেই। এই মহিলা এক অসাধারণ মানুষ। তিনি মানসিক রোগিদের ডাক্তার ছিলেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি।

আপনি তো ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন…
আল মাহমুদ: ছিলাম শুধু না এর জন্য আমি জেলও খেটেছি। পালিয়ে বেড়িয়েছি। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় এসে ভিক্ষুকের জীবন যাপন করতে হয়েছে। সেখানে আস্তে আস্তে দাঁড়িয়েছি নিজের প্রতিভার জন্য। আমি একজন দরবেশ মানুষ।

আপনি কি নিজেকে দরবেশ মনে করেন?
আল মাহমুদ: জীবনের দিক থেকে তো তাই। আমার তো কোনো লোভ নাই। লোভ লালসা আমি নিজের ইচ্ছায় ছেড়েছি। না হলে আমি অনেক ধনী হতে পারতাম।

আরো কত বছর বাঁচতে চান?
আল মাহমুদ: বাঁচতে তো চাই দীর্ঘদিন। কিন্তু শারীরিক অবস্থা তো ভালো না।

আশি বছর কি খুব বেশি বয়স…
আল মাহমুদ: একবারেই ফেলে দেবার মত না। আশি বছরে মানুষ বুড়ো হয়।

আপনাকে যদি আমরা আশি বছরের তরুণ বলি তাহলে কি ভুল হবে?
আল মাহমুদ: না আপনারা বলুন অসুবিধা কি? কিন্তু আশি তো আর সোজা কথা না। হেঁটে পার হতেও সময় লাগে। আশি বছর না, আশি দিন হাঁটেন।

তরুণ কবিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
আল মাহমুদ: এখন আর তরুণ কবিদের লেখা পড়তে পারি না। আগে তো আজিজ মার্কেটে যেতাম লিটল ম্যাগ কিনে আনতাম পড়তাম। কিন্তু এখন আর পারি না। অনেক তরুণরাই আমার কাছে আসে। আইসা অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে।

আপনার পরবর্তী জেনারেশেনের কবিদের সম্পর্কে বলুন?
আল মাহমুদ: নাম তো বলতে পারবো না। নাম বলাটা ঠিকও হবে না। অনেকের কবিতাই আমার কাছে ভালো লাগে। তবে আমাদের কবিতায় যে প্রেম ছিলো, ভালোবাসা ছিলো, বিচ্ছেদ ছিলো- আজকালের কবিতায় সেটা খুঁজে পাই না।

সেটা কি সময়ের কারণে না লাইফ স্টাইলের কারণে…
আল মাহমুদ: আরে ভাই চোখ তো নষ্ট হইয়া গেছে। অনুভূতি ভোতা হয়, হয় না? মানুষ তো, নানা রকম অসুবিধা আছে। দেখেন কবিরা অন্ধ হয়েও লেখে। হোমার অন্ধ ছিলো তাতে কি হয়েছে। পৃথিবীর কবিতা তো আর অন্ধ না।

[আমরা আরো কথা বলতে থাকি কবির সঙ্গে। নানান প্রসঙ্গে। সময় বয়ে যায় নিরবে…]

এক নজরে আল মাহমুদ
জন্ম : ১১ জুলাই, ১৯৩৬, মোল্লাবাড়ি, মৌড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
পিতা : আব্দুর রব মীর।
মা : রৌশন আরা বেগম।
স্ত্রী : সৈয়দা নাদিরা বেগম।
পুত্রকন্যা : পাঁচ পুত্র, তিন কন্যা।
পেশা : অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরে নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, না কোন শূন্যতা মানি না প্রভৃতি।
ছোটগল্প : পান কৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ূরীর মুখ প্রভৃতি।
উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, পুরুষ সুন্দর, চেহারার চতুরঙ্গ, আগুনের মেয়ে, নিশিন্দা নারী প্রভৃতি।
শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে।
প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন., আল মাহমুদের প্রবন্ধ সমগ্র।
ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র প্রভৃতি৷
এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদ রচনাবলী।

পুরস্কার
বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরষ্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭),নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক- ২০০৪ প্রভৃতি। সূত্রঃ প্রিয়.কম






মন্তব্য চালু নেই