মেইন ম্যেনু

এসএসসির খাতা মূল্যায়ন করছে শিক্ষকদের সন্তানরা!

চলছে এসএসসি পরীক্ষা। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে খাতা মূল্যায়নের কাজ। কারণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফলাফল দিতে মরিয়া কর্তৃপক্ষ। এ কর্মযজ্ঞ সাধন করতে চতুর্মুখি সঙ্কটে পড়েছেন পরীক্ষকরা। একদিকে পরীক্ষক সঙ্কট অন্যদিকে সময় স্বল্পতা, সঙ্গে আছে নামে মাত্র আর্থিক সম্মানি। এছাড়া পাসের হার বাড়ানোর নানারকম অলিখিত নির্দেশনা তো আছেই। এসব কারণে এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন এখন হুমকিতে!

পরীক্ষক সঙ্কট এবং সময় স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল জনবলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত উত্তরপত্র মূল্যায়নের ভার। একজন পরীক্ষক ৩০০ করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন, এমন নির্দেশনা থাকলেও দেয়া হচ্ছে ৫০০ উত্তরপত্র। ক্ষেত্র বিশেষে উত্তরপত্রের সংখ্যা ৭০০ ও ছাড়াচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরীক্ষক বলেন, ‌‘১৭ ফেব্রুয়ারি আমাকে ৫০০ খাতা দেয়া হয়েছে। প্রথম কিস্তি (১০০টি মূল্যায়নকৃত উত্তরপত্র) জমা দিতে হবে ২৩ ফেব্রুয়ারি। বাকিগুলো ৩ মার্চের মধ্যে জমা দিতে হবে।‘

সময়ের হিসাব করে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে ৫০০ খাতা মূল্যায়নের জন্য আমি সময় পেয়েছি ১৫ দিন। খাতা দেখা, নম্বর বসানো, নম্বর যোগ করা, নম্বর তোলা, ওএমআর সিট পূরণসহ একটি খাতা ভালোভাবে সম্পূর্ণ করতে কমপক্ষে ২০ মিনিট সময় লাগে।’

তিনি বলেন, ‘৫০০ খাতা দেখতে আমার কমপক্ষে ১০ হাজার মিনিট লাগবে। ১০ হাজার মিনিটে প্রায় ১৬৭ ঘণ্টা। তাহলে প্রতিদিন আমাকে ১১ ঘণ্টার বেশি সময় খাতা দেখার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। এটা কীভাবে সম্ভব! আমাকে প্রতিটি খাতার জন্য ১৮ টাকা করে আর্থিক সম্মানি দেয়া হবে। তাও এ বছরের সম্মানি পাবো আগামী বছর। প্রতিদিন ১১ ঘণ্টার বেশি শুধু খাতা মূল্যায়নের পিছনে ব্যয় করলে আমি চলবো কীভাবে? আমার তো ব্যক্তিগত কাজও আছে!’

এগুলো পরীক্ষক সঙ্কটের কারণে হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ চাইলে পরীক্ষক সংখ্যা বাড়াতে পারে। যেহেতু সময় কম, বাড়ানোর সুযোগ নেই, সেক্ষেত্রে পরীক্ষক সংখ্যা বাড়ালে উত্তরপত্রের সঠিক মূল্যায়ন হবে।’

খাতা দেখার চাপের কারণে অন্যান্য কাজে ব্যাঘাত ঘটছে উল্লেখ করে এক পরীক্ষক বলেন, ‘কম সময়ের মধ্যে অনেক খাতা দেখতে হয়। এতে দেখা যায় খাতা দেখা ছাড়া অন্যকাজ করা যায় না। এতে কিছুটা সমস্যা হয়-ই।’

এদিকে বোর্ডের নানারকম ধরাবাঁধা বাধ্যবাধকতার কারণে কেউ কেউ চুপচাপ বিষয়টি মেনে নিলেও অনেকই খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবলম্বন করছেন অসদুপায়। বোর্ড থেকে পরীক্ষার উত্তরপত্র নিয়ে নিজেরা মূল্যায়ন করছেন না। ছেলে-মেয়ে বা কাছের লোকজন দিয়ে খাতা মূল্যায়নের কাজ করছেন।

এ বিষয়ে এক আঞ্চলিক প্রধান পরীক্ষক বলেন, ‘খাতার চাপ বেশি পড়ার কারণে কিছু শিক্ষক এমন করে থাকেন। তারা খাতা বাড়িতে নিয়ে এসে ছেলেমেয়ে বা অন্য কাউকে দিয়ে মূল্যায়ন করাচ্ছেন। অথবা কেউ আছে প্রথম দিকে খাতা না দেখে শেষের তিন-চার দিন কোনোরকম দেখে জমা দিয়ে দেন। এগুলো সম্পূর্ণ অনৈতিক, দায়িত্বহীনতা। নিঃসন্দেহে এর কুপ্রভাব বড়সড়ভাবে ভবিষৎ প্রজন্মের উপরেই পড়বে।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খাতা মূল্যায়নের চেয়ে পাস করানো বা ভালো নম্বর দিতে বেশি আগ্রহী পরীক্ষকরা। কারণ পাস বা এ+ পাইলে ক্ষতি নেই। ক্ষতি ফেল করলে। ফেল করলেই জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে পরীক্ষককে। তাই তারা কোনোরকম খাতা দেখে বেশি নম্বর দিতে পারলেই তাদের কর্ম শেষ।

‘ফেল করলেই কোর্ট-কাচারি’ সেই ঝামেলা এড়াতেই এমনকি করা হয় উল্লেখ করে এক পরীক্ষক বলেন, ‘একটা খাতা সঠিকভাবে দেখে মূল্যায়ন করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। যেহেতু আমরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার মতো সময় পাই না সেক্ষেত্রে বেশি নম্বর দেয়ার প্রতি প্রায় সবারই একটা ঝোঁক থাকে। কারণ আপনি যদি ভালোভাবে খাতা না দেখেন আপনি তো তাকে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবেন না। অনুমান করে বেশি নম্বর দেয়া যায়, ফেল করানো যায় না। কারণ ফেল করালে কোর্ট-কাচারি আছে। সেজন্য পাশ করিয়ে দিলে ঝামেলামুক্ত থাকা যায়।’

এরকম পরিস্থিতিতে পরীক্ষারর্থীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, আমাদের প্রাপ্র্য নম্বর দেয়া হোক। উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হোক। সঠিকভাবে খাতা না দেখে গড়পড়তা শুধু শুধু বেশি নম্বর, বেশি নম্বর পেয়ে প্লাস পাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই।এক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা ভালো পরীক্ষা দিয়েও গড়পড়তা নম্বর পাচ্ছি। তখন আমাদের রেজাল্ট খারাপ আসবে। যে যেমন লিখবে তাকে ঠিক ততোটুকু নম্বর দিতে হবে।

বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘যারা খাতা দেখছেন তারা তো শিক্ষকও। তারা কোচিং সেন্টারও চালাচ্ছেন। ১৫ দিনে ৫০০ খাতা দেখা! বিষয়টি একদিকে অত্যন্ত দুঃখজনক অন্যদিকে খুবই অবিশ্বাস্য। অথচ এটাই বাস্তব!’

অতিরিক্ত নম্বর দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষকদের মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে। বেশি নম্বর না দিলে বা পাস বেশি না করালে আর পরীক্ষক থাকতে পারবেন না। তাদেরকে এ ভয় তাড়া করে। তাই তারা নম্বর বাড়িয়ে দিচ্ছেন। অনেক সময় তো বলা-ই হয় নম্বর বেশি দিতে।’

পরীক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘খুবই দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়াচ্ছে আগামী প্রজন্ম। আমার প্রশ্ন থাকবে, আমরা কাকে ফাঁকি দিচ্ছি। আমরা কাকে ঠকাচ্ছি। এটা তো আমাদের নিজেদেরই ঠকানো হচ্ছে। আমাদের ভবিষ্যৎ যারা তৈরি হচ্ছে তারা ফাঁকা ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা মনে করবে তারা অনেক নম্বর পেয়েছে। আসলে তারা শেখেনি।’

এসব কারণে পরীক্ষার খাতায় ভালো লিখেও মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল থেকে। তেমনি খাতা অবমূল্যায়নে বাড়ছে ডিগ্রিধারী মূর্খ। উচ্চশিক্ষায় গিয়ে এসব ফলাফল অর্জনকারীরা বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়েন। এ বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলো উচ্চশিক্ষার জন্য বড় ধরনের একটা ধস। কারণ যারা উচ্চ শিক্ষিত হবে তাদের ভিত্তিটা ফাঁকা থেকে যাবে।’

পরীক্ষা নয় জোর দিতে হবে পড়াশোনার ওপর- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশেই ফলাফল নিয়ে এতো উচ্ছ্বাস এতো উদযাপন এতো উৎসব দেখা যায়। আমর মনে হয় না এমনটি পৃথিবীর কোথাও আছে। ফলাফল নিয়ে এতো উন্মাদনা, এগুলো ঠিক না। ফলাফল নিয়ে এতো মাতামাতি, উচ্ছ্বাস আনন্দ এটার তো কোনো ভিত্তি নেই। ক্লাসের পড়াটা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, এটা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাসরুমে পড়ানোটা হচ্ছে আসল পড়াশোনা। পরীক্ষার উপরে নয়, গুরুত্ব দিতে হবে পড়াশোনার ওপর। পাবলিক পরীক্ষাকে এতো গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।’

এ পরিস্থিতিকে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমার মনে হয় এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।’

শিক্ষকদের অনাগ্রহের কারণেই পরীক্ষক সঙ্কট হয় দাবি করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বলেন, ‘খাতা হিসাব করে পরীক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেখা গেলো সাড়ে ৩ হাজার খাতা আছে। ১ হাজার শিক্ষককে ডাকা হলো; খাতার পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিজন পরীক্ষক সাড়ে ৩শ করে থাতা পাবেন। কিন্তু দেখা গেলো ১ হাজার পরীক্ষককে আসতে বলেছিলাম আসছে ১শ কম। তখন দেখা যায় ৯শ পরীক্ষকের মধ্যে খাতাগুলো বণ্টন করা হয়।’

সময় স্বল্পতা ও শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ সময় দেয়া হয়েছে একজন নিষ্ঠাবান, সময়ানুবর্তী শিক্ষকের জন্য কোনো ভাবেই সমস্যা হওয়ার কথা না। একজন শিক্ষক যদি মনে করেন তার ব্যস্ততা আছে, তিনি খাতা নিবেন না। তার তো থাতা না নেয়ার স্বাধীনতা আছে।যারা দুষ্টু পরীক্ষক তারা এসব কথা বলেন।’

অন্যকে দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করাকে অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা অন্যকে দিয়ে খাতায় সে ক্রাইম করছে। ইটস অ্যা ক্রাইম। আমরা তথ্য পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।’ এসময় তিনি ২০১৪ সালে ৪ জন পরীক্ষককে ৫ বছরের জন্য কারো তালিকাভুক্ত করা কথা তুলে ধরেন।

উল্লেখ্য, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শেষ হবে ১৪ মার্চ। এ বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৩৩ এবং ছাত্রী ৮ লাখ ৮ হাজার ৫৯০ জন। বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই