মেইন ম্যেনু

কমলা বিক্রেতা থেকে মাফিয়া ডন

হোয়াকুইন গুজমান। মাদক উৎপাদন ও চোরাচালানকারী, অপহরণকারী, খুনি, ধর্ষক এমন কোনো দুর্ধর্ষ শব্দ নেই, যা তার নামের আগে বসানো যায় না। এই মুহূর্তে তাকে মেক্সিকোর ক্যান্সার বলা যায়। তার কারণে আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক মানুষ মাদকের মরণ ছোবলে ঝরে যাচ্ছে সুন্দর জীবন থেকে। গুজমান এখন মাফিয়া। কিন্তু একদিনে তিনি এখানে আসেননি।

গুজম্যানের কর্মকাণ্ডে ভয়ংকরী মাত্রা বোঝাতে তার নামের আগে যুক্ত হয়েছে মাদকসম্রাট, মাদকরাজ, আন্ডারগ্রাউন্ড ডন, মাফিয়া, গণমানুষের শত্রু এবং আরো অনেক কিছু। ক্ষেত্রবিশেষে মনে হয়, এসব শব্দের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম গুজমানের অপরাধ আড়াল করে তার বিশালত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি। সে অন্য কথা। মূল কথা হলো- যার দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার জুটত না, তিনি কীভাবে মাদকজগতের শিরোমণি হয়ে উঠলেন?

জম্মের পর থেকে গুজমানের জীবন কেটেছে চরম কষ্টে। তাদের পরিবারে একে তো অভাবের কষাঘাত, তারপর আবার ভাইবোন সংখ্যা সব মিলিয়ে ১০ জন। তার বাবা ছিল মাতাল। ছোট্টটি থাকা অবস্থায় গুজমানকে ছোটখাটো ভুলে বেদম পেটাতো তার বাবা। কিন্তু তার মা ছিল মমতাময়ী। মা তাকে অনুপ্রেরণা দিতেন, স্বপ্ন দেখাতেন, একদিন তারও সুখী হবে।

পুরো নাম হোয়াকুইন আর্চিভালডো গুজমান লোয়েরা। মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলঘেঁষা সিনালোয়া রাজ্যের বাদিরাগুয়াতো শহরের অদূরে লা টুনা গ্রামের এক গরিব পরিবারে ১৯৫৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে তার জন্মতারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে বলেন, ১৯৫৭ সালের ৪ এপ্রিলে জন্ম হয় গুজমানের। এমিলো গুজমান বস্তিলোস এবং মারিয়া কনসুয়েলো লোয়েরা পেরেজ তার বাবা-মা। ১০ ভাইবোনের মধ্যে গুজমান ছিলেন সপ্তম। দুই বোনা ও চার ভাই তার ছোট। বড় তিন ভাই সম্ভবত রোগে ভুগে মারা যায়। বেপরোয়া উগ্রমেজাজি বাবার অত্যাচার সহ্য করতে হতো তাদের।

গুজমানের বাবার গবাদিপশু পালন করতেন। এতে যা আয় হতো, তা দিয়ে তার বছর চলতো না। তার ওপর বাবা ছিলেন মদপায়ী। হাতে যা অর্থকড়ি আসতো, পানশালায় গিয়ে তা উড়িয়ে আসেতন তিনি। অভাবের তাড়নায় ফেরি করে কমলা বেচা শুরু করেন। তখন তার বয়স ছয় বা সাত বছর ছিল। কমলার ঝাঁকা মাথায় নিয়ে রোজ বেরিয়ে পড়তেন তিনি। এ কাজ করতে গিয়ে স্কুল ছাড়তে হয় তার। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে খাতা-কলম শিকেয় তুলে এক সময় গাঁজার গাছ লাগানো শুরু করলেন। কমলা বিক্রির পাশাপাশি চলতে লাগল গাঁজা বিক্রি। ভালো মুনাফা দেখে এক সময় অবৈধ উপার্জনের দিকেই পুরোটা ঝুঁকে গেলেন। অপরাধের পথে যাত্রা শুরু হলো গুজমানের।

এরপর নিষিদ্ধ আফিম চাষ শুরু করেন। একে একে দুই, দুইয়ে দুইয়ে চার। গুজমানের বয়স যখন ১৫ বছর, তখন তিনি মাদকচক্র গড়ে তোলেন। আফিম, গাজা, চরস, হেরোইন, কোকেইন, প্যাথেড্রিনসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য সরবরাহ শুরু করেন এই চক্রের সাহায্যে। হাতে অর্থ আসায় বাবার হুমুকদারি থেকে মুক্ত হয়ে মাদকরাজ্য গড়ে তোলেন গুজমান।

মানবতার শত্রু গুজমান গড়ে তোলেন সিনালোয়া কার্টেল। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মাদক নেটওয়ার্ক এটি। ২০০৩ সালে তার প্রধান প্রতিপক্ষ মাদক মহারাজ খ্যাত ওসিয়েল কার্ডিনাসের মৃত্যুর পর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদক মাফিয়া হয়ে ওঠেন গুজমান। তার অপরাধী রাজ্যের প্রভাব পড়ে বিশ্বজুড়ে। যার প্রমাণ মিলেছে ফোর্বস ম্যাগাজিনের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় পরপর তিন বার গুজমানের নাম উঠে আসায়। প্রভাবাশীদের তালিকায় ২০০৯ সালে ৪১তম, ২০১০ সালে ৬০তম এবং ২০১১ সালে ৫৫তম অবস্থানে ছিলেন তিনি। ফোর্বস ম্যাগাজিনে গুজমানের বর্ণনায় বলা হয়, ‘সর্বকালের দানবীয় মাদক সম্রাট’।

শুধু অর্থের জন্য, সেই অর্থ যা মানুষের মধ্যে থেকে ভোগ করা যায় না, তা রোজগার করা কি খুবই দরকার? রোজগার বললে সৎপথে উপার্জনকারীদের অপমাণ করা হয়। গুজমান অর্থ আয় করেননি, অর্থের বিনিময়ে মাদক ছড়িয়ে মানুষের রক্ত চুষে নিয়েছেন। সুস্থবুদ্ধি ও সুন্দর জীবনের বিরুদ্ধে মরণ নেশার ব্যবসা করে মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন মাফিয়া ডন গুজমান। এমন অপরাধীর প্রতি ঘৃণা জানাই আমরা।

কিন্তু এমন হলে কেমন হতো, যদি আমরা আজ লিখতে পারতাম, ম্যাক্সিকোর সামান্য কমলা ব্যবসায়ী এখন বিশ্বের কমলা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। কয়েক ডলার থেকে এখন কোটি কোটি ডলারের মালিক হয়েছেন। তখন শিরোনামটা হয়তো এমনও হতে পারত ‘কমলার ফেরিওয়ালা থেকে শীর্ষ ধনী’।

উল্লেখ্য, জেলে ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার সাত মাসের মাথায় গুজমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে তিন বার পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন তিনি। তার উপযুক্ত শাস্তি হোক।



(পরের সংবাদ) »



মন্তব্য চালু নেই