মেইন ম্যেনু

কমিটির আকার দ্বিগুণ, তবুও বিএনপিতে বাড়ছে ক্ষোভ-হতাশা

ত্যাগী নেতাদের যথার্থ মূল্যায়ন করতেই কাউন্সিলের প্রায় সাড়ে চার মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। নতুন কমিটির আকার হয়েছে আগের কমিটির প্রায় দ্বিগুণ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি দু’বার সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে শূন্যহাতে ঘরে ফিরেছে। দলটির নেতাকর্মীদের আশা ছিল ওই আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন দলে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর অনেকেই মনে করছেন যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রায় দ্বিগুণ আকৃতির কমিটি দিয়েও পদপ্রত্যাশীদের সন্তুষ্ট করতে পারেননি দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

এদিকে কমিটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মোসাদ্দেক আলী ফালুর পদত্যাগসহ নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনায় নির্বাক হয়ে গেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। শীর্ষ পদে থাকা নেতাদের অসন্তুষ্টি ও অনেক নেতার প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় বর্তমানে দলটিতে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে।

অনেকে মনে করছেন কমিটি বিতর্কিত হয়েছে। তাদের আশঙ্কা দলের ‘হেভিওয়েট’ অনেক নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে দৃশ্যপটের বাইরে চলে যাবেন।

কমিটি ঘোষণার পর পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বহুল প্রতিক্ষীত কমিটি ঘোষণা করা হলেও উচ্ছ্বাস নেই নেতাকর্মীদের মাঝে। কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় নিষ্ক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি অনেকে আবার রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

শনিবার কমিটি ঘোষণার পর সোমবার দুপুর পর্যন্ত নয়াপল্টনে কোনো আনন্দ মিছিল হতে দেখা যায়নি। কমিটিতে পদ পাওয়া ৫৯৪ নেতার মধ্যে ১৫ জন নেতাও নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাননি।

এমনকি কমিটি ঘোষণার পরদিন রোববার চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন নেতাসহ সব মিলিয়ে মোটামুটি ৩০ জন নেতা দেখা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশালাকৃতির কমিটি করেও নেতাকর্মীদের সন্তুষ্ট করতে পারেননি চেয়ারপারসন।

কমিটি ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রদলের শীর্ষ এক নেতা বলেন, রোববার বিকেলে পার্টি অফিসে গিয়ে অনেক কষ্ট পেয়েছি। ভেবেছিলাম দীর্ঘদিন পর নতুন নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হবে নয়াপল্টন কার্যালয়। আনন্দ মিছিল হবে, মিষ্টি বিতরণ হবে। কিন্তু এর কিছুই দেখলাম না। মনে হচ্ছিল নয়াপল্টন কার্যালয় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদ্য ঘোষিত কমিটিতে সদস্য পদ পেয়েছেন এমন এক নেতা বলেন, গুলশান ও নয়াপল্টনের শক্তিশালী দুটি সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে বিএনপি। সরকার হার্ড লাইনে থেকে বিএনপিকে যতটা ক্ষতি করেছে, পকেট কমিটি দেয়ে ওই দুই সিন্ডিকেট দলের আরো বেশি ক্ষতি করেছেন।

নতুন নির্বাহী কমিটিতে সম্পাদক পদ পেয়েছেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটি কতটা চমৎকার বা ভালো হয়েছে একটা কর্মসূচি ঘোষণা করতেই সন্দেহ দূর হবে, সেই প্রতিক্ষায় রইলাম।

এদিকে নতুন কমিটি ঘোষণার পর বিএনপিতে ক্ষোভ-হতাশা বাড়ছে। তাৎক্ষণিকভাবে এই ক্ষোভের বড় কোনো বহিঃপ্রকাশ না ঘটলেও কোনো কোনো নেতা রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকার চিন্তা করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সেনা প্রধান ও বিএনপি সর্বোচ্চ নীতি র্নিধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, কমিটি নিয়ে অনেক অভিযোগ, ক্ষোভ, উষ্মা, অপ্রাপ্তি আছে। অনেক অযোগ্য লোককে কমিটিতে আনা হয়েছে। আবার অনেক যোগ্য লোককে বাদ দেওয়া হয়েছে বা প্রত্যাশিত পদ দেওয়া হয়নি। অনেকে অসম্মানিত বোধ করেছেন।

এদিকে দলের সিনিয়র অপর একজন নেতা বলেন, নতুন কমিটিতে নেতাদের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে। অনেকে আবার মনে করছেন, তাদের ঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। অনেক নেতার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ, ভাইও কমিটিতে পদ পেয়েছেন। এটাকে ‘চরম অগণতান্ত্রিক’ বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা।

জানতে চাইলে আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, কমিটি ঘোষণার পর থেকেই নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে ফোন করছেন। অনেকে দেখা করছেন। সবাই আশাহত ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। তিনি নিজেও কিছুটা আশাহত হয়েছেন।

রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে নোমান বলেন, ‘অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন, এবার আত্মসম্মানের বিষয় চলে এসেছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করিনি।’

এদিকে কেবল জ্যেষ্ঠ নয়, মাঝারি পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও কমিটি নিয়ে ক্ষোভ লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের একজন আগের কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক শামীমুর রহমান। নতুন কমিটিতে তাকে সহ-প্রচার সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে। কমিটি ঘোষণার পরই তিনি নিজের নাম প্রত্যাহার করার আবেদন করেন। তার আগে কমিটি ঘোষণার দিনই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী (ফালু)।

এছাড়া বিএনপির নারী নেত্রীদের অনেকে কমিটি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এদের মধ্যে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সাবেক সাংসদ নিলুফার চৌধুরী, সৈয়দা আশিফা আশরাফি (পাপিয়া), রেহানা আক্তার উল্লেখযোগ্য।

জানতে চাইলে নতুন কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী বলেন, ‘পদ-পদবি বড় কথা না। কিন্তু জুনিয়রকে আমার সিনিয়র করে দেওয়া হলে ইজি হতে পারব না। অপমানবোধ নিয়ে তো ভালো কাজ করা যায় না।’

স্থায়ী কমিটির আরেক প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, কমিটি ভালো হয়েছে। হয়তো অনেকের মনে কষ্ট আছে যে প্রত্যাশিত পদ পাননি। নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হবে, যাতে তাদের সক্রিয় রাখা যায়, সম্মানিত করা যায়।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি একটা বিশাল রাজনৈতিক দল। এর সদস্য সংখ্যা সারা দেশে পাঁচ লাখেরও উপরে। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে কাউন্সিলররা বেগম খালেদা জিয়াকে কার্যনির্বাহী কমিটি করার ক্ষমতা দিয়েছেন। সেই ক্ষমতাবলে তিনি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি নিয়ে আগামী তিন বছর বিএনপি তার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই যখন রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটি হয় তখন দেখা যায় যোগ্য মানুষও পদবঞ্চিত হচ্ছেন। এত বেশি যোগ্য লোক থাকে সবাইকে স্থান দেয়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে বিএনপিতে সবাইকে স্থান দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে যাদের উনি দায়িত্ব দিয়েছেন তারা আগামী তিন বছর কাজগুলো সুচারুভাবে পালন করবেন।খবর জাগো নিউজের।






মন্তব্য চালু নেই