মেইন ম্যেনু

কাউন্সিলে অধিবেশনে যা বললেন খালেদা জিয়া (পুরো বক্তব্য)

বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসনের পুরো বক্তব্য আওয়ার নিউজ বিডি’র পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:-

বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় কাউন্সিলর ও ডেলিগেটবৃন্দ,

২০ দলীয় জোট ও অন্যান্য দলের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ,

আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ,

ডিস্টিংগুইশ্ড গেস্ট্স ফ্রম অ্যাব্রড,

এক্সেলেন্সিজ,

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আসসালামু আলাইকুম।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে আমি আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই কাউন্সিল আয়োজন করতে এবং আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পেরে আমি প্রথমেই মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।স্বাধীনতার মাস মার্চে এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মির স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমি সেই শহীদদেরকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।এনপি’র জাতীয় কাউন্সিল থেকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নিকট প্রতিবেশী ভারতসহ যে সকল দেশ ও বন্ধুপ্রতিম জনগণ সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছিলেন, আমি তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ মরহুম জাতীয় নেতাদের অবদানের কথা স্মরণ করছি। তাঁরা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিলেন।

মহান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের বীর অধিনায়ক, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের স্থপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও আদর্শের দিশারী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

বিএনপি’র দীর্ঘ সংগ্রামের পথে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত ও নিহত হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করেছেন, সীমাহীন হয়রানির শিকার হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নানাভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমি তাদের প্রতিও আন্তরিক সমবেদনা ও সম্মান জ্ঞাপন করছি।

বিএনপি’র সকল স্তরের নেতা-কর্মীর প্রতি আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে আবারো আমার প্রতি অকুন্ঠ আস্থা ও সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

জাতীয় জীবনের এক চরম সংকট সন্ধিক্ষণে এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।দেশে গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদ নেই। সত্যিকারের বৈধ সরকার নেই। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। সুশাসন নেই। সুবিচার ও ন্যায়বিচার নেই।

নারীর সম্ভ্রম ও মানবাধিকার আজ বিপন্ন। শিশুরা পর্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা নেই। আছে শুধু স্বেচ্ছাচার, অনাচার, দুঃশাসন, দুর্নীতি আর চরম নৈরাজ্য। জাতি হিসেবে আমাদের বর্তমান আজ সংকট কবলিত, আর ভবিষ্যৎ অন্ধকার ও অনিশ্চিত।

আমাদের এই কাউন্সিল থেকে জাতীয় জীবনের সেই জমাটবাধা অন্ধকার দূর করে আলোর আভাস আনতে হবে।

জাতিকে আজ বিশৃক্সখল, বিভক্ত, হতাশ ও দিশেহারা করে ফেলা হয়েছে। এই জাতিকে আবারো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সকল স্তরে শৃক্সখলা ফেরাতে হবে। সঞ্চারিত করতে হবে নতুন আশাবাদ। জনগণকে দিতে হবে পথের দিশা। এ কাউন্সিল থেকে আসতে হবে সেই পথ-নির্দেশনা।

বিএনপি’র পরম গৌরবের বিষয় হচ্ছে, শহীদ জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছিলেন। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত করেছিলেন। জনগণের মৌলিক-মানবিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। বিশৃক্সখল ও হতাশ জাতিকে মহান স্বাধীনতার মূল্যবোধে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য এবং উৎপাদন ও উন্নয়নে গতি সঞ্চার করে দেশকে কর্মমুখর করে তুলেছিলেন।

তিনিই নারী ও যুব শক্তিসহ সক্ষম প্রতিটি নাগরিকের শ্রম ও মেধাকে জাতীয় অগ্রগতির ধারায় সম্পৃক্ত করেছিলেন।

কেবল অতীত নিয়ে পড়ে না থেকে তিনি নিরলস শ্রমে জাতীয় সমস্যা মোকাবিলা করে সম্মুখপ্রসারী ইতিবাচক রাজনীতির ধারা তৈরি করেছিলেন। এটাই আমাদের পথ।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

দুনিয়া এখন বদলে গেছে। একুশ শতকে এসে জাতিসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। ঐক্য, শৃক্সখলা, মেধা, যোগ্যতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মাধ্যমে চলমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে যে যার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি কেবল ঐক্য, শৃক্সখলা এবং সমন্বিত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের অভাবে।

এ অবস্থা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতীতে বিএনপি ভবিষ্যতমুখী ইতিবাচক রাজনীতির ধারার নেতৃত্ব দিয়েছে। এখনও বিএনপি-ই শুধু পারে ইতিবাচক সেই সম্মুখপ্রসারী ধারাকে এগিয়ে নিতে।

এই যে ইতিবাচক ও ভবিষ্যতমুখী রাজনীতি ও পরিকল্পনার কথা আমরা বলছি, এগুলো কেবল কথার কথা নয়। আমরা যা বলি তা বুঝে শুনে বলি এবং বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করি।

আমরা কখনো দেশবাসীকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল, বিনামূল্যে সার কিংবা ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার মতো মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করিনা।

বিরোধী দলে থেকেও বিএনপি দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে সৃজনশীল ও গঠনমূলক রাজনীতি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কখনো ক্ষমতাসীনদের অনুক‚ল ও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আমাদেরকে স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ চালাতে দেয়া হয়নি। হত্যা ও গুমসহ সব ধরনের জুলুম-নিপীড়ন ও হামলা-মামলায় আমাদের সকলকে অতিষ্ঠ করে রাখা হয়েছে। এত কিছুর মধ্যে থেকেও দেশের সংকটজনক পরিস্থিতি এবং জনগণের দুর্দশা ও হতাশা আমাদেরকে ব্যথিত করেছে। আমরা চিন্তা করেছি, এমন অবস্থা চলতে পারেনা। জাতিকে পেছনে ঠেলে দেয়ার নষ্ট রাজনীতির আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ আরো ঘোর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে।

তাই আমরা সংকট নিরসন করে দেশ-জাতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করেছি।

দেশের অগ্রসর চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পরিকল্পনাবিদ, গবেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও অঙ্গনে কর্মরত শীর্ষস্থানীয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকেও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। সকলের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সমৃদ্ধ দেশ এবং আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি ইতিমধ্যেই ‘ভিশন-২০৩০’ শিরোনামে একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই যে, অচিরেই এই ভিশন-২০৩০ চ‚ড়ান্ত করা হবে।

এই কাউন্সিলে আমি ভিশন-২০৩০ থেকে এর সংক্ষিপ্ত রূপরেখা বা কিছুটা ধারণা তুলে ধরতে চাই।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সাম্য আজো বাস্তবায়িত হয়নি। সেই লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য বাংলাদেশের সকল ধর্ম-বিশ্বাসের মানুষ, পাহাড় ও সমতলসহ সকল অঞ্চলের মানুষ এবং প্রতিটি নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাক্সখাকে ধারণ করে একটি অংশীদারিত্বমূলক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন, জনকল্যাণমূলক, সহিষ্ণু, শান্তিকামী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা বিএনপি’র লক্ষ্য।

বিএনপি বিশ্বাস করে জনগণই সকল উন্নয়নের চালিকাশক্তি। যে সব বাধা জনগণের মেধা, শ্রম, উদ্যোগ এবং উৎসাহকে দমিয়ে দেয়, সেগুলোকে দূর করে বিএনপি বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

আমরা এমন এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে চাই, যেখানে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। যারা সংখ্যায় কম, দুর্বল কিংবা পিছিয়ে আছে, তাদের মত ও বিশ্বাসকে অমর্যাদা না করার নীতিতে বিএনপি দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

আমরা সকল মত ও পথকে নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন ও পরিপুষ্ট করতে চাই, যাতে বহু বর্ণের চ্ছটায় উদ্ভাসিত একটি বাংলাদেশী সমাজ গড়ে উঠবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ‘রেইনবো নেশনে’ পরিণত হবে।

আমরা ‘ওয়ান ডে ডেমোক্রেসিতে’ বিশ্বাসী নই। জনগণের ক্ষমতাকে কেবল নির্বাচনের দিন বা ভোট দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়না বিএনপি।

জন-আকাক্সখাকে মর্যাদা দিয়ে, তাদেরকে সম্পৃক্ত করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবো আমরা।

সুধীসমাজ, গণমাধ্যম, জনমত জরিপ, জনগণের দৈনন্দিন চাওয়া-পাওয়া, বিশেষজ্ঞ মতামত ও সবধরনের অভিজ্ঞানের নির্যাস গ্রহন করে দেশ পরিচালনাই বিএনপি’র লক্ষ্য।

আমরা গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে পরস্পরের বিকল্প নয়, সম্পূরক মনে করি। গণতন্ত্র, জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছাড়া কোনো উন্নয়ন হতে পারেনা। বরং এতে লুন্ঠন ও দুর্নীতির দ্বার অবারিত হয়। আজ বাংলাদেশে এর প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি।

বাংলাদেশের জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সে রাষ্ট্রের মালিকানা আজ তাদের হাতে নেই। আমরা জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি। তাই তাদের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চাই।

তিনটি ‘গুড’ বা ‘সু’ অর্থাৎ থ্রি.জি-এর সমন্বয় ঘটাতে চাই আমরা। এই থ্রি.জি হলো: গুড পলিসি, গুড গভরনেন্স এবং গুড গভর্নমেন্ট। অর্থাৎ সুনীতি, সুশাসন এবং সু-সরকার।

গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের জন্য নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, আইন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও আধা-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয়করণমুক্ত করা হবে। আইনি ও প্রক্রিয়াগত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এগুলোর দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।

বিএনপি দরিদ্রবান্ধব ও সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বাসী। প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে এবং এর সুফলের সুষম বন্টনের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সমস্যাকে মোকাবেলা করতে চায় বিএনপি।

আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। এরজন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ‘ডবল ডিজিটে’ উন্নীত করার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ভূমির দুষ্প্রাপ্যতার কথা বিবেচনায় রেখে একদিকে ভ‚মির অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করে শিল্প স্থাপন এবং অন্যদিকে ভ‚মির সীমিত ব্যবহারভিত্তিক আধুনিক সেবা খাত গড়ে তোলার উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করবে বিএনপি।

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সবধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও বিচার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন ও পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিংবা দলীয় আনুগত্যের বিষয় বিবেচনায় নেয়া হবে না।

মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সততা ও সৃজনশীলতা হবে সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে যোগ্যতার মাপকাঠি। আইনানুগভাবে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কর্তব্য পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দলীয় ও অবাঞ্ছিত সব হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।

সকল কালাকানুন বাতিল করা হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং আটক অবস্থায় দৈহিক-মানসিক অমানবিক নির্যাতনের অবসান ঘটানো হবে। আটকাবস্থায় মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জন্য তদন্তের ব্যবস্থা থাকবে। সবধরণের নিষ্ঠুর আচরণ থেকে মানুষকে মুক্ত করা হবে।

উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে বিএনপি। নিয়োগের জন্য বাছাই বা সুপারিশকৃতদের ব্যক্তিগততথ্য ও সম্পদবিবরণী জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অখন্ডতা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত, যুগোপযোগী এবং সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে গড়ে তোলা হবে। গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ভিত্তি ও বিন্যাস প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেশবাসী গভীরভাবে উপলব্ধি করছে যে, প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে।

রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুন্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানীগুণী ও মেধাবী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

আমাদের জাতীয় সংসদকে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক। ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোট হচ্ছে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা। এটা নাগরিকদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় প্রকাশের অধিকার। বর্তমান সরকার মুখে জনগণের কথা বললেও সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করে জনগণের সেই ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা সংবিধানে শহীদ জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত গণভোটের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবো।

বিএনপি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী। সেই লক্ষ্যে সকল স্তরে ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা সুচিহ্নিত করে সুশাসনের সহায়ক পরিবেশকে কাক্সিখত মানে উন্নীত করা হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন, দক্ষ সেবা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আধুনিক, যুযোপযোগী, কার্যকর ও দক্ষ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

‘স্থানীয় নেতৃত্বেই টেকসই সমাধান সম্ভব’ এ নীতির ভিত্তিতে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ক্ষমতায়িত করা হবে। ক্ষমতা ও উন্নয়নের ভরকেন্দ্র হবে গ্রামমুখী।

স্থানীয় সরকারের অনুক‚লে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং বৈষম্য নিরসনে জন্য জাতীয় বাজেটের একটি অংশ বরাদ্দ করা হবে। আইন দ্বারা গঠিত একটি স্বাধীন কমিশন সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বরাদ্দকৃত অর্থ বন্টনের ব্যবস্থা করবে।

বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোনো আপোষ করবে না। দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি আইন ও পদ্ধতিগত সংস্কার এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি দুর্নীতি করবে না- কাউকে করতেও দেবে না।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘ন্যায়পাল’ বা ‘ওম্বুড্স্ম্যান’-এর পদ ও কার্যালয় সক্রিয় করা হবে।

গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য অনেক সাংবিধানিক প্রাতিষ্ঠান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

ধ্বংসপ্রায় এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে সাংবিধানিক পদের নিয়োগপদ্ধতি সংস্কার করা হবে। সততা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গণশুনানির ব্যবস্থা থাকবে।

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃক্সখলা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ও তদারকি নিবিড় ও শক্তিশালী করা হবে। সংকীর্ণ দলীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়, যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকসমূহ পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগ দেয়া হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।

বিচার, প্রশাসন, পুলিশ, স্বস্থ্য, বিদ্যুৎ ও খাবার পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাষন, পরিচ্ছন্নতাসেবাসহ সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসমূহের সেবার মান ক্রমান্বয়ে উন্নত করা হবে। সুষ্ঠু সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পাঁচ বছরের মধ্যে সমাধান করা হবে।

ভেজাল প্রতিরোধ, বিশেষ করে খাদ্যে ভেজাল রোধে এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনী ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

সন্ত্রাসী ও জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিএনপি সব সময় সক্রিয়। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক অভিযানে আমরাই বাংলাদেশকে যুক্ত করি। দেশের অভ্যন্তরে গড়ে উঠা জঙ্গীবাদী নাশকতাকে আমরা কঠোর হাতে দমন করেছিলাম। জঙ্গী নেতাদের গ্রেফতার, বিচার ও কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করে জঙ্গীবাদের সামর্থ ও কাঠামো ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হয়েছিল।

ভবিষ্যতে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ দমনে সেই কঠোরতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমরা একযোগে কাজ করে যাবো।

বিএনপি মনে করে, সন্ত্রাসবাদ সকল রাষ্ট্রের জন্যই হুমকির কারণ। এ কারণে বিএনপি বাংলাদেশের ভূ-খন্ডের মধ্যে কোনরকম সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাকে বরদাশ্ত করবে না। বাংলাদেশের মাটি থেকে অপর কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাও মেনে নেবে না।

বিএনপি জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গঠন এবং জনগণের অংশগ্রহনে সন্ত্রাসবাদকে নিরুৎসাহিত ও নির্মূল করার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকৌশল হিসাবে দারিদ্র দূরীকরণ, বেকার সমস্যার সমাধান, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধর্মগ্রন্থসমূহের মূল্যবান বাণীর ব্যাপক প্রচার এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করা হবে।

বাংলাদেশের মতো একটি সীমিত সম্পদের ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শিক্ষা, প্রযুক্তির প্রসার ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাকে কর্মমুখী ও ব্যাবহারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে। এজন্য সকল পর্যায়ের শিক্ষার গুণগত মান ও বিজ্ঞান শিক্ষায় অনগ্রসরতা দূর করার নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি। ‘শুধু ধনীদের জন্য শিক্ষা নয়’, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে কাজ করতে সক্ষম বয়সের মানুষের হার বাড়ছে। বাড়তে থাকা এই অনুপাতকে আগামী কয়েক দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান করার সুযোগ হিসাবে গ্রহন করা হবে। এ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাবার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এক দশকের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করা হবে।

উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষা হবে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে সমৃদ্ধ। গুরুত্ব দেওয়া হবে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার উপর। গড়ে তোলা হবে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়।

মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। তাদের কারিকুলামে পেশাভিত্তিক ও বৃত্তিমূলক বিভিন্ন বিষয়কে অন্তভর্‚ক্ত করা হবে। এই সংস্কারের আওতায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও আইটি এবং ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, যাতে মাদ্রাসা শিক্ষিতরা উৎপাদনশীল কাজ, চাকরি, অন্যান্য পেশা ও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়ে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাগরিকদের মেধা ও শ্রম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগের জন্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিসহ অন্যান্য বিদেশী ভাষা শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করা হবে। চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা সৃষ্টির জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষ অগ্রাধিকার লাভ করবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত।

বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের সুবিধার্থে মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে।

মেয়েদের জন্য স্নাতক এবং ছেলেদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হবে।

শিক্ষা স¤প্রসারণের জন্য জাতীয় টিভিতে পৃথক একটি চ্যানেল চালু করা হবে।

শিক্ষার সকল পর্যায়ে সুযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাধাসমূহ এবং ছেলে ও মেয়েদের বৈষম্য দূর করা হবে।

প্রতিবন্ধীদের উপযুক্ত শিক্ষা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি-র ক্ষেত্রে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে তাল মিলিয়ে চলায় সক্ষম করার লক্ষ্যে এবং প্রযুক্তি ও কৃৎকৌশলের বিষয়ে মানব সম্পদের উৎকর্ষ সাধন এবং অবকাঠামোগত সুবিধা স¤প্রসারণ করা হবে আমাদের লক্ষ্য।

সুষম ও নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে গোটা কৃষি খাতকে পুনর্বিন্যস্ত ও বিকশিত করা হবে। কৃষিতে অনিরাপদ এবং ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার বন্ধ করা হবে।

প্রয়োজনে ভতর্‚কি দিয়ে কৃষি উপকরণ সুলভ ও সহজলভ্য করা হবে। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের জন্য শষ্যবীমা কর্মসূচি চালু করা হবে।

অদক্ষ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানব-সম্পদে পরিণত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও ন্যায্য মজুরী নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু করার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এর আওতায় সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমার প্রচলন করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল নাগরিকের চিকিৎসার জন্য জিপি ও রেফারেল সিস্টেম চালু করা হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে বিএনপি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

বিএনপি অন্য কোনো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সমস্য সৃষ্টি করতে চায় না। একইভাবে বিএনপি আশা করে যে, অন্য কোনো রাষ্ট্রও বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।

বিএনপি প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সৎপ্রতিবেশীসুলভ সোহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

জাতীয় স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়াতে কানেকটিভিটি স্থাপন, সম্প্রসারণ ও জোরদার করতে বলিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

যুব, নারী ও শিশুদের কল্যাণে শহীদ জিয়াউর রহমান পৃথক মন্ত্রণালয় স্থাপন করেছিলেন। তাদের জীবন বিকাশের চাহিদার নিরিখে যথোপযুক্ত উন্নয়ন-কৌশল গ্রহণ করা হবে। জাতীয় উন্নয়নে যুব ও নারী সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নারী, শিশু এবং প্রবীণদের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

পরিবেশ দূষণ রোধে জনসচেনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সুন্দরবনসহ জাতীয় ঐতিহ্যসমূহ সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে বিশ্বজনমত ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে বিএনপি সক্রিয় ভূমিকা নেবে।

আন্তর্জাতিক উৎসসমূহ থেকে পানি সম্পদের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ এবং পানি সম্পদের সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপযুক্ত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ ও প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

কাক্সিখত ডবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির জন্য বিএনপি যথোপযুক্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ লক্ষে দেশের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত সকলপ্রকার জ্বালানী ও সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে রেল ও নৌপথকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে। সড়ক, রেল ও নৌপথের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে সারাদেশে সমন্বিত বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জেলা ও উপজেলা শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে মহানগরীগুলোতে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করে নগরায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হবে।

দেশের দ্রুত বর্ধনশীল এবং নৈরাজ্যপূর্ণ নগরায়নকে সুশৃক্সখল এবং ডবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বিত করতে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রনয়ণ করা হবে। যানজট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আবাসন খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দেশব্যাপী সকল নাগরিকের বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ও সমন্বিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক, বস্তিবাসী ও দরিদ্র গ্রামীণ জনগণের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ উৎসাহিত করা হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিএনপি’র অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে।

যারা উন্নত দেশগুলোতে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে অধিকতর জ্ঞান, দক্ষতা, নৈপুণ্য ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাদেরকে ফিরে এসে দেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করা হবে। তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

তৈরী পোষাক শিল্প এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিটেন্স আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এর সূচনা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমরা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও সবধরণের সমর্থন দিয়ে তৈরী পোষাক শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠন করে আমরা প্রবাসীদের সমস্যাদি সমাধান ও কল্যাণের ব্যবস্থা করেছি। আগামীতেও তৈরী পোষাক শিল্প ও প্রবাসীদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারী খাতকে সম্পৃক্ত ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কৃতিত্ব বিএনপির। বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। বিরাজমান বাধাগুলো দূর করে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে উৎপাদন ও সেবাখাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যাকাত ফান্ডের সু-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে যাকাতকে দারিদ্র বিমোচন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের উপায় হিসাবে কাজে লাগানো হবে।

ওয়াক্ফ সম্পত্তির পরিচালনা ও ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। একইভাবে দেবোত্তর সম্পত্তিসমূহ হিন্দু শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য হিন্দু স¤প্রদায়ের সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করা হবে।

হজ্ব ব্যবস্থাপনায় বিরাজমান নৈরাজ্য ও দুর্নীতির অবসান ঘটানো হবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে এবং তাদের মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ হবে জাতীয় ঐক্য ও প্রেরণা সৃষ্টির উৎস।

জাতীয় প্রণোদনা সৃষ্টির মাধ্যম হিসাবে জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং খেলাধুলা প্রসারের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

মাদকের মারণ ছোবল থেকে কিশোর ও যুব সমাজকে রক্ষা করার জন্য জনগণকে সচেতন করার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

মাদক আমদানি, উৎপাদন এবং বাংলাদেশে এসবের বেআইনী প্রবেশ রোধে কঠোর বিধি-নিষেধ প্রয়োগ করা হবে। হতাশা ও অন্যান্য মনস্তাত্বিক কারণে নেশায় আসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য মনস্তাত্বিক সমর্থনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিএনপি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনীতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটাতে চায়। জাতির সকল অংশ তথা ধর্মীয়, আঞ্চলিক ও নৃ-গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণী ও গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সুসংহত জাতি গঠন করাই বিএনপি’র লক্ষ্য।

বিএনপি চায় বিভক্ত হয়ে পড়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। তাই সকল মতাদর্শের ঐক্যতান রচনার জন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার সেতুবন্ধ রচনাই হবে বিএনপি’র প্রয়াস।

প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সৃজনশীল, ইতিবাচক ও ভবিষ্যতমুখী এক নতুন ধারার সরকার ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। এজন্য নতুন এক সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে বিএনপি উদ্যোগ নেবে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আমি এতক্ষণ যা বললাম তা আমাদের ভিশন-২০৩০ এর সার কথা। এই ভিশনে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিবরণ থাকবে। ভিশনটি চ‚ড়ান্ত হলে তা আপনাদের মাধ্যমেই দেশবাসীর সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য পেশ করা হবে। এই ভিশনের আলোকেই আগামীতে আমাদের দলের নির্বাচনী ইশতেহার রচিত হবে।

আপনারা জানেন যে, লাখো শহীদের পবিত্র রক্তে অর্জিত মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ যখন দুর্নীতি, নিপীড়ন, সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিশৃক্সখলা ও একদলীয় স্বৈরশাসনের নাগপাশে আবদ্ধ, দেশের অবস্থা যখন বিপর্যস্ত, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন – ঠিক তখন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সৈনিক-জনগণের সম্মিলিত এক মহান বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়।

তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশ একদলীয় বাকশালী শাসনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়।

তিনি ১৯৭৮ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী ও উদার গণতান্ত্রিক ব্যক্তি-গোষ্ঠীর সমš^য়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির মূলমন্ত্রে তিনি দেশ ও মানুষকে সুসংগঠিত করেন। জগৎসভায় বাংলাদেশকে অধিষ্ঠিত করেন সম্মানজনক বিশেষ আসনে। অথচ কুচক্রীরা এই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার শাহাদাতের পর আবারও দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে এবং জাতির ঘাড়ে স্বৈরশাসন চেপে বসে। তখনও বিএনপিকে ধ্বংস করে দেয়ার সব অপচেষ্টাই করা হয়েছিল, কিন্তু বিএনপিকে শেষ করা যায়নি। কখনও যাবে না ইনশাআল্লাহ্।

সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আমাদের কাছে গণতান্ত্রিক শাসনের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৩৭ বছরে বিএনপি তা প্রমাণ করেছে। ১৯৭৫-এ একদলীয় শাসনের পর বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন বিএনপিই ফিরিয়ে আনে। এরশাদের স্বৈরশাসনের অধীনে কোনো নির্বাচনেই বিএনপি অংশ নেয়নি।

মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের জরুরি সরকারকেও জরুরি অবস্থা তুলে নির্বাচন দিতে বাধ্য করে বিএনপিই। অবশ্য এর সুফল ভোগ করে আওয়ামী লীগ। তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য গণতন্ত্রের পথে না থেকে অতীতের স্বৈরশাসকদের পদাংক অনুসরণ করে বর্তমানে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে।

এই স্বেচ্ছাচারি ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বিএনপি আন্দোলন করছে।

সেই আন্দোলনগুলোতে সারাদেশে আমাদের তৃণমূলের নেতা-কর্মী, ছাত্র-তরুণ ও মেয়েরাও অংশ নিয়েছে।

আন্দোলন আপনারাই করেছেন এবং সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলে দেখিয়ে দিয়েছেন, গ্রামে-শহরে কোথাও শাসক দলের কোনো গণভিত্তি নেই।

আমাদের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। এই আন্দোলনে জনগণের স্বত:স্ফ‚র্ত সমর্থন দেখে শাসকেরা ভীত হয়ে এক নোংরা পথ বেছে নেয়। এই আন্দোলনে তারাই নাশকতা ও অন্তঃর্ঘাত সৃষ্টি করে।

আর বিএনপি, ২০ দলসহ আন্দোলনকারী অন্যান্য দল এবং আন্দোলনে সমর্থনদানকারী সাধারণ মানুষকে এরজন্য দায়ী করে। ব্যাপক মিথ্যা প্রচার ও হামলা-মামলা চালিয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়।

দেশজুড়ে এখনো সেই ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে। অসংখ্য পরিবারে স্বজন হারানো কান্নার রোল এখনো থামেনি। আপনারা অনেকেই দৈহিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও চরম নির্যাতীত হয়েছেন। অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বাড়িঘরে ঘুমাতে পারেননা। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ নেতা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের তরুণ কর্মী-সমর্থক পর্যন্ত প্রায় সকলেই অসংখ্য মামলায় জর্জরিত।

এই চরম দুঃখের দিন কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ্। কারণ, এই জুলুম ও অস্থিরতা বাংলাদেশ বহন করতে অক্ষম।

সারা দেশে শুধু আমার নেতা-কর্মীরা নন- তাদের পাশাপাশি আমি নিজেও চরম দুঃখ কষ্ট সয়ে, হামলা, বাড়ি ও অফিস অবরোধ, মিথ্যা মামলা মোকাবেলা করে আপনাদের মাঝেই রয়েছি এবং থাকবো ইনশাআল্লাহ্।

আমি পরিবারের সদস্যদের থেকে বিছিন্ন। আমার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো বিদেশ-বিভূঁইয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে। দীর্ঘ ৭ বছর পর সে আমার কাছে লাশ হয়ে ফিরেছে।

আমার বড় ছেলে তারেক রহমানকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। চরম নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে এখনও দূরদেশে সে চিকিৎসাধীন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এসব দুঃখ বেদনাকে বুকে চেপে আমি এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের কল্যাণে সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই কঠিন সংগ্রামে আল্লাহর রহমত এবং আপনাদের সহযোগিতাই আমার পাথেয়।

বিএনপির জন্য এটা কঠিন সময় হলেও অতীতের মতোই বিএনপি আবারো জেগে উঠেছে। গ্রিক উপকথার সেই ফিনিক্স পাখির মতো ভস্মস্ত‚প থেকেই বার বার আপন শক্তিতে বলিয়ান হয়ে নতুন উদ্যমে জেগে ওঠে বিএনপি।

প্রিয় ভাই-বোনেরা

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করা, হামলা-মামলায় বিরোধী রাজনীতিকদের হেনস্তা করা এবং আদালত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পন্থাকে কাজে লাগিয়ে শহীদ জিয়ার স্মৃতিকে মুছে ফেলার অপচেষ্টাই শুধু করা হচ্ছে না। জবাবদিহিতাহীন স্বেচ্ছাচারী শাসনে দেশ ও জনগণের অবস্থাও আজ শোচনীয়।

বর্তমান শাসকেরা মানুষের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করে না। জনগণের রায়ের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। ভোট ছাড়া নিজেরা ক্ষমতাসীন হয়ে তারা সকল পর্যায়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই প্রহসনে পরিণত করেছে। এতকিছু সত্বেও জনগণের বিপুল ভোটে বিরোধীদল থেকে অনেকেই স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। বিজয়ী এই সিটি ও পৌর মেয়র এবং উপজেলা চেয়ারম্যানসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তারা মিথ্যা মামলা দিয়ে অপসারণ করে অনুগত লোকদের বসিয়ে দিচ্ছে।

সন্ত্রাস-দুর্নীতি-লুটপাট আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শেয়ার বাজার লুঠ হয়েছে। ব্যাংকগুলো লুন্ঠিত হচ্ছে। এখন বিদেশী হ্যাকাররা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ লুন্ঠনের প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছে।

এই অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের আমলে ব্যাংক, এটিএম বুথ, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও জনগণের অর্থ নিরাপদ নয়।

দেশে এখন কর্মসংস্থান নেই। শিল্প, উৎপাদন, দেশী-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির। দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে সীমিত আয়ের মানুষ জর্জরিত। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে দিশেহারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গনগুলো সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের দখল, চাঁদাবাজী ও লুটপাটের অভয়ারণ্য। সম্মানিত নাগরিকেরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ তো দূরের কথা, অন্যায়-অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলারও সুযোগ নেই।

খুন-খারাবি-রক্তপাত চলছে প্রতিনিয়ত। বিদেশী নাগরিক ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের থাবা বিস্তৃত হবার আশংকা করছে বিদেশী বন্ধুরা। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সবকিছু অস্বীকার করে কিংবা নির্বিকার থেকে দায় সারছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার আজ পুরোপুরি ভূলুন্ঠিত ও বিপন্ন।

দুর্নীতি, অনাচার ও অপশাসনে লিপ্ত ক্ষমতাসীন সরকার নানা অপকৌশলে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করছে। সাংবাদিক, কলামিষ্ট, সম্পাদক কেউই আজ নিরাপদ নন। মামলা-হামলা এমন কি হত্যারও শিকার হচ্ছেন তারা। সাংবাদিক সাগর-রুনীর হত্যাকান্ডের কোনো বিচার হয়নি। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাসহ বহু সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করে রাখা হয়েছে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি। সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদকে মিথ্যা মামলায় আটক করে রাখা হয়েছে। জোর করে জাতীয় প্রেসক্লাব দখল করে নেয়া হয়েছে।

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জাতির প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দেশ এক অকার্যকর রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই অন্ধকার থেকে আমাদেরকে আলোর দিকে মুখ ফেরাতে হবে। তারজন্য গণতন্ত্র আনতে হবে। জবাবদিহিতামূলক সরকার আনতে হবে। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমরা কি কেবলই ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করবো? আমরা কি কেবল এক পক্ষ আরেক পক্ষকে হেনস্তা ও ধ্বংস করে দিতে চাইবো? রাজনীতি তো দেশের জন্য, মানুষের জন্য। সেই দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে মানুষের উপর জবরদস্তির শাসন চালিয়ে কী লাভ? এই দূষিত রাজনীতির চক্র থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আমাদের যাদের বয়স হয়েছে তারা হয়তো আর খুব বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। এরপর তরুণেরা এসে নেতৃত্ব দেবে। আমরা তাদের জন্য কেমন দেশ ও সমাজ রেখে যাচ্ছি? কী আদর্শ ও শিক্ষা আমরা রেখে যাচ্ছি তাদের জন্য? হানাহানি, হিংসা, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র মিথ্যাচার, দমন-পীড়ন কি কখনো রাজনীতি হতে পারে?

রাজনীতির নামে এসব অপকৌশল দেশ, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

কোনো মত, পথ ও দলকে কখনো নিশ্চিহ্ন করা যায় না। সে ধরনের অপচেষ্টার পরিণাম কারো জন্য কখনো শুভ হয়না। তাই আমি সকলকে বলবো, সে চেষ্টা না করে সংযমী ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হোন।

শুধু আমরা নই, প্রায় সকলেই বাংলাদেশে একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকার চায়। এর জন্য যত দ্রুত সম্ভব সকলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। সে ধরনের একটি নির্বাচনের জন্য আমরা একটি সংলাপের আহবান জানিয়ে আসছি। কিভাবে সকলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে, সে ব্যাপারে সকলের আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা সমাধানে পৌঁছাতে চাই। তাহলেই দ্ব›দ্ব-সংঘাত থাকবে না। আন্দোলনেরও কোনো প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা আলোচনা অস্বীকার করে শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের পথ খোলা রেখে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছেনা। আমি তাদেরকে আবারও সংলাপের আহবান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা ও না থাকার মধ্যে বেহেশ্ত ও দোজখের মতো দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। স্বর্গচ্যুত হয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগের ভয়ে তাই অনেকে ক্ষমতা ছাড়তে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে সব রকমের অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে।

এই পটভূমিতে আমি সকলকে আশ্বাস দিতে চাই, আগামীতে জনগণের সমর্থনে আল্লাহ্র মেহেরবানীতে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কাউকেই অহেতুক হেনস্তার শিকার হতে হবে না। আমরা কারো প্রতি অবিচার করবো না।

আমি কেবল এই আশ্বাসটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইনা। সরকার ও বিরোধী দলকে মর্যাদা ও অধিকারের দিক থেকে আমরা যাতে আরো কাছাকাছি আনতে পারি, তার জন্য আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে একটা পন্থা ও প্রক্রিয়াও উদ্ভাবন করতে হবে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে সব পক্ষ নিজ নিজ সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে অবাধে দায়িত্ব পালন করতে পারে। তা না হলে গণতন্ত্রকে কার্যকর ও বিকশিত করা সম্ভব হবে না।

আমরা কেবল ক্ষমতার যাবার উদ্দেশ্যে একটি নির্বাচন বা সংলাপ চাইছি না। আমাদের উদ্দেশ্য :

ক্সদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা;

ক্সজনগণের সম্মতির ভিত্তিতে একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা;

ক্সজনগণ ভোটের যে অধিকার হারিয়েছে, তা ফিরিয়ে আনা;

ক্সকারা দেশ পরিচালনা করবে তা নির্ধারণের অধিকার জনগণকে দেয়া;

ক্সরাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; এবং

ক্সঅস্থিরতা ও সংকট থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্থিতিশীল ও সমঝোতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা।

দেশের মালিক জনগণ। তাদের উপর আস্থা রেখে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো আজ সময়ের দাবি এবং এতে সকলেরই মঙ্গল।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠন ও বদলের একমাত্র শান্তিপূর্ণ পন্থাই হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেললে সরকার বদলের কোনো বৈধ ও শান্তিপূর্ণ পন্থাই আর খোলা থাকেনা। তাতে বলপ্রয়োগ ও অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের পথই প্রশস্ত হয় এবং শক্তি প্রয়োগে বিশ্বাসী, উগ্রবাদী ও চরমপন্থী শক্তির উত্থানই অনিবার্য হয়ে উঠে।

আমি দেশকে তেমন অরাজকতা ও বিশৃক্সখলার দিকে ঠেলে না দেয়ার আহবান জানাই।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

বাংলাদেশের অসহায় ও হতাশ জনগণ আমাদের এই কাউন্সিলের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা দিক-নির্দেশনা ও আলোর দিশা চায়। আমাদের শক্তির উৎস তারাই।

শহীদ জিয়াউর রহমান সমস্যায়-সংকটে জনগণের মধ্যে গিয়ে তাদের কাছে শিক্ষা নিয়ে তা প্রয়োগের কথা বলেছেন। সমস্যা-সংকট-দুঃশাসনে নুয়ে পড়া এ দেশের মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ হলে বজ্রের মতো কঠিন হয়ে আঘাত হানতে জানে।

আপনারা এই কাউন্সিল শেষে দিক-নির্দেশনা নিয়ে সারা দেশে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বেন, তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। তার জন্য নিজেরা আগে ঐক্যবদ্ধ হবেন এবং সংগঠনকেও সুসংবদ্ধ করবেন। তাহলেই আমরা অজেয় শক্তিতে পরিণত হবো।

দেশবাসীর প্রতি আমার আহবান: আপনারা জেগে উঠুন, ঐক্যবদ্ধ হোন। আপনাদের যে অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে তা ছিনিয়ে নিন।

অন্ধকারের পর্দা দুলে উঠেছে। অচিরেই আলো আসবে। ভবিষ্যৎ আমাদেরই ইনশাআল্লাহ্।

যাদের মেধা-শ্রমে-ঘামে এবং উপস্থিতিতে এ অধিবেশন সার্থক হয়েছে, তাদের সকলকে ধন্যবাদ।

দেশ-বিদেশের সম্মানিত অতিথিদের ধন্যবাদ।

আমি এই উদ্বোধনী অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করছি।

আল্লাহ্ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ।






মন্তব্য চালু নেই