মেইন ম্যেনু

কেরানীগঞ্জ নতুন কারাগার

কাজ অসমাপ্ত রেখেই উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত

কাজ অসমাপ্ত রেখেই কেরানীগঞ্জের নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্মাণ প্রকল্পের পাঁচ বছরের মেয়াদ দুই দফায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ বছরে। ২০১০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। আর এসময়ে ব্যয় ৮৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৬ কোটি টাকা। অবশ্য নকশা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার বন্দি ধারণ ক্ষমতার একটি পুরুষ জেল ও ২শ শয্যার হাসপাতাল। তারপরও ১০ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি দুই-তৃতীয়াংশও। তাই নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া নিয়েও সংশয়ে সংশ্লিষ্টরা।

বুড়িগঙ্গার নদীর পাশে কেরাণীগঞ্জের তেঘরিয়ায় নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ঢাকা মহানগরীর পাশে প্রায় ২শ একর জমিতে নির্মাণাধীন সাড়ে ৪ হাজার বন্দি ধারণক্ষমতার এ কারাগার হবে অত্যাধুনিক ও প্রযুক্তি সুবিধা সম্বলিত। যা দক্ষিণ এশিয়ার মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নানা প্রতিবন্ধকতার পর প্রথম দফায় এ কারাগারে পুরুষ জেল নির্মিত হচ্ছে। এটি চলতি বছরের শেষের দিকে সরকারের উদ্বোধনের প্রত্যাশা থাকলেও কাজ শেষ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে আগামী ডিসেম্বরে এ কারাগার উদ্বোধনের আশা করছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি বলেন, ‘কারাগারের নির্মাণ কাজ কিছু বাকি আছে ঠিক। নারী জেলও নির্মাণ হবে। তবে শিগগিরই উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা চানখারপুলের নাজিমউদ্দীন রোডে অবস্থিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মিত হয় ব্রিটিশ সরকারের আমলে ১৭৬৫ সালে। ২ হাজার ৬৬০ বন্দি ধারণ ক্ষমতার এ কারাগারটি ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা ও নিরিবিলি পরিবেশে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় সরকার। এলক্ষ্যে প্রায় ৩১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালের জুলাই থেকে পাঁচ বছর মেয়াদী ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরাণীগঞ্জ নির্মাণ প্রকল্প’ হাতে নেয়া হয়। তবে এক বছর পরে ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অর্থনৈতিক নির্বাহী পরিষদে (একনেকে) অনুমোদন পায়। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

প্রকল্পের আওতায় দু’টি পুরুষ জেল, একটি নারী জেল এবং ২শ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয় নকশায়। ঝিলমিল প্রকল্প থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-মাওয়া রাস্তার পাশে তেঘরিয়ায় ১৯৪ দশমিক ৪১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে এ জমির অধিকাংশই ছিল ১৪ থেকে ১৮ ফুট গভীর খাদ। প্রকল্প অনুমোদনের পরের বছর সেপ্টেম্বরে পরিপত্র (জিও) জারি করে সরকার। এরপর শুরু হয় সীমানা নির্ধারণ ও মাটি ভরাটের কাজ। এরইমধ্যে জমির কয়েকজন মালিক হাইকোর্টে ৬টি রিট করলে নির্মাণ কাজের স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। এই মামলা ও রি-সিডিউলের কারণে ঝুলে যায় প্রকল্পের কাজ।২০১০ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। পরিকল্পনা কমিশন সংশোধিত ডিপিপি অক্টোবরে অনুমোদন করে। এতে প্রকল্প নকশা থেকে পুরুষ জেল-২ এবং হাসপাতাল বাদ দেয়া হয়। মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। আর প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৩৩৭ কোটি ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। বন্দি ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ৫৯০জন। এরই মধ্যে ২০১১ সালে গণপূর্ত বিভাগ পুনঃপ্রকল্প দর নির্ধারণ করে। সময় মত অর্থ ছাড়করণ না হওয়ায় অর্থসঙ্কটসহ নানা জটিলতায় পড়ে এ প্রকল্পটি। ওই বছরেই (২০১১) মে মাসে কারাগারের অবকাঠামো নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন।

কিন্তু অর্থ সঙ্কটসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পের কাজ চলে ঢিমেতালে। এরই মধ্যে বাড়তি সময়ও শেষ হয়ে যায়। একারণে ২০১৩ সালে ডিপিপিতে আবারো সংশোধনী আনা হয়। এ দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪০৬ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা।আর প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর কাশিমপুর কারাগার প্যারেড গ্রাউন্ডে জাতীয় কারা সপ্তাহ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গেল জুনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু জুনেও সম্ভব হয়নি তা।

কারা অধিদপ্তর ও প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, ১৮ফুট উচ্চতার সীমানা প্রাচীর (পেরিমিটার ওয়াল) ঘেরা এ নতুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যে প্রথম দফায় নির্মিত হচ্ছে পুরুষ জেল। এ জেলে প্রতি বন্দির কক্ষের প্রসস্থতা হবে ৩৬ বর্গফুট। ১২টি ভবনে থাকছে বিভিন্ন ধরনের বন্দিদের ওয়ার্ড। এরমধ্যে ছয়তলা ছয়টি ভবনে বিচারাধীন বন্দি ওয়ার্ড, দুটি ভবনে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ওয়ার্ড এবং চারতলা চারটি ভবনে শীর্ষ সন্ত্রাসী, দুর্ধর্ষ অপরাধী, জঙ্গি অর্থাৎ বিপদজ্জনক বন্দির সেল। প্রথম আটটি ভবনে ৫শ করে এবং বিপদজ্জন বন্দি সেলে ৪শ করে বন্দি থাকবে। এ বিপদজ্জনক বন্দি সেলের পাশেই করা হচ্ছে ফাঁসির মঞ্চ। আর শ্রেণিপ্রাপ্ত (ডিভিশন) বন্দির জন্য ৬০টি বিশেষ কক্ষ থাকছে।

এছাড়া থাকছে ১শ কিশোরবন্দি ব্যারাক ও ৩০ জন মানসিক ভারসাম্যহীন বন্দি ওয়ার্ড। পাশপাশি নির্মাণ হচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের জন্য জেল স্কুল এবং লাইব্রেরি। প্রতিটি কারা ভবন আবার পৃথকীকরণ (সেগ্রিগেশন) দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। গোটা কারাগারে থাকবে চারটি অবজারভেশন টাওয়ার। কারাগারের পুরো দৃশ্য দেখতে বা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য এ অবজারভেশন টাওয়ারে কারারক্ষী নিয়োজিত থাকবে। সেন্ট্রি বক্স ও গার্ড হাউজও থাকছে কারাগারে। এছাড়া স্বজনদের সঙ্গে বন্দিদের সাক্ষাতের জন্য থাকবে একটি ইন্টারভিউ ব্লক। সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের কাজের জন্য থাকবে ওয়ার্ক সেড।

কারা অভ্যন্তরে কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের জন্য একশ পরিবার বসবাসে একশ ইউনিটের আবাসিক ভবন, ব্যাচেলর চারশ কারারক্ষীর জন্য ব্যারাক নির্মাণ হচ্ছে।কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনোদনে অফিসার্স ক্লাব, কর্মচারীদের জন্য স্টাফ ক্লাব, মসজিদ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সভার জন্য মিলনায়তও রয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ১২ ফুট প্রশস্তের আরসিসি রাস্তা।

প্রধান ফটকের সামনেই করা হচ্ছে প্রশাসনিক ভবন। আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কারাগারের ভেতরে বনায়নও করা হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবর্তে বন্দিরে চিকিৎসার জন্য করা হয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র (এমআইইউনিট)। সুপেয় পানির জন্য স্থাপন করা হয়েছে দুটি গভীর নলকূপ। বিদ্যুতের সাবস্টেশন ভবন করা হবে একটি।

আর ২৭০ জন বন্দির ধারণক্ষমতার নারী ওয়ার্ড নির্মাণ করা হচ্ছে। এ জেলে থাকবে ১৮০ জন ধারণ ক্ষমতার বিচারধীন বন্দি ওয়ার্ড ও ২০ জন ধারণক্ষমতার সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ওয়ার্ড। এছাড়া ৪০ জন কিশোরীবন্দি ওয়ার্ড, ২০ জন মানসিক ভারসাম্যহীনবন্দি ওয়ার্ড ও ১০ জন শ্রেণীপ্রাপ্ত (ডিভিশন) বন্দির কক্ষ। এ জেলের বন্দিদের জন্য একটি ইন্টারভিউ ব্লক থাকবে। আর থাকবে একটি প্রশাসনিক ভবন। প্রকল্প কর্মকর্তাদের দাবি, পুরুষ জেলের নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ এবং নারী জেলের ১০-১৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দি ২ হাজার ৮২৬ এর স্থালে বর্তমানে রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৭৯৭ জন (১৩ অক্টোবর)। যা ধারণ ক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুনের বেশি। নতুন কারাগারটি উদ্ধোধনের পর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৪ হাজার পুরুষকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে। এর মধ্যে নারী ও বাকীসব বন্দিদের নেয়া হবে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক জায়গা ফাঁকা রেখেই উন্নত দেশের কারাগারের মতো আধুনিক ব্যবস্থাসমৃদ্ধ নতুন কারাগারটি তৈরি করা হচ্ছে। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের মতই এটিকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। তারা বলছেন, দ্রুত নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

নতুন কারাগারের ব্যাপারে সম্প্রতি ডিআইজি প্রিজন ইফতেখার উদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘নতুন কারাগারটি আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে উদ্বোধন করা হবে। আর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেহেতু তিনি উদ্বোধন করবেন তাই তার সুবিধা অনুযায়ী উদ্ধোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই