মেইন ম্যেনু

‘কিরণমালা’ সিরিয়ালের কারণে বাংলাদেশের যত দুর্ঘটনা

ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলো এদেশে বেশ দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে যাচ্ছে বেশ কয়েকবছর ধরে। বিশেষ করে জি বাংলা ও স্টার জলসার ধারাবাহিক নাটকগুলো এদেশের নারী সমাজে বেশ জনপ্রিয়। সংসারের ঝগড়াঝাঁটি ও পুরাণিক কাহিনী নিয়ে ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হচ্ছে এসব চ্যানেলে। এসব সিরিয়ালে আসক্ত হয়ে পড়ছেন দেশের গ্রামাঞ্চলের নারী ও গৃহধূরা।

তবে সেটি যদি শুধু বিনোদন গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে ব্যাপারটি সহনীয় হত। কিন্তু বাস্তব চিত্র তা নয়। ভারতীয় বাংলা ধারাবাহিক এই নাটকগুলোর আসক্তি এদেশের মানুষের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সেটি আবারও প্রমাণ করেন হবিগঞ্জ বাসিন্দারা। গত বুধবার হবিগঞ্জ জেলার ধল গ্রামে ‘কিরণমালা’ সিরিয়াল দেখা নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে পরে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়।

তবে নাটকের এমন আসক্তির ঘটনা নতুন নয়। এর আগে, একই চ্যানেল স্টার জলসায় ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’ সিরিয়ালের পাখি চরিত্রের পোশাক ‘পাখি ড্রেস’কে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। এই পোশাক না পেয়ে আত্মহত্যা থেকে শুরু করে স্বামী-স্ত্রী হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে নতুন সংযোজন বর্তমান ক্রেজ ‘কিরণমালা’। ভারতীয় টিভি চ্যানেল স্টার জলসায় প্রতি সোম থেকে রবিবার রাত ৮টায় কিরণমালা সিরিয়ালটি প্রচারিত হয়। ‘ঠাকুর মা’র ঝুলি থেকে নেয়া সিরিয়ালটির কাহিনী মূলত ‘কিরণমালা’ চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে। এই সিরিয়ালের কারনে এদেশে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

প্রথম ঘটনা গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর বড়দাপ সরকারপাড়া গ্রামে। এদিন কিরণমালা সিরিয়ালটি দেখতে গিয়ে ১৬টি পরিবার নিঃস্ব হয়। জানা যায়, ওইদিন রাত ৮ টা ৪০ মিনিটে বাড়িতে সবাই ‘কিরণমালা’ সিরিয়াল দেখতে বসে। ওদিকে নাটক দেখার সময় চুলার আগুন থেকে রান্নাঘরে আগুন লাগে। এই ঘটনায় বসতবাড়ি-জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর তা আশেপাশের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও মালামাল কিছুই রক্ষা করা যায়নি। পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ৩২০ কেজি চাল, ঢেউটিন প্রদান করা।

এছাড়াও কিরণমালার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। ওই দিন সকাল ৯টায় উপজেলার বাদুড়িয়া গ্রামের সবুর মোল্লার পরিবারের সবাই একত্রে দেখছিলেন কিরণমালা। একই সময় পুকুর পাড়ে খেলা করছিলেন তার ছয় বছরের ছেলে আসাদুর রহমান ও তার চার বছরের চাচাতো বোন মনিরা খাতুন। একপর্যায়ে সবার অগোচরে শিশু দুটি পুকুরে পড়ে যায়। যখন সিরিয়াল শেষ হয় ততক্ষণে পানিতে ডুবে মারা যায় শিশু দুটি। পরিবারের দুই শিশু হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো বাড়িতে।

এবার গত বছরের ঘটনা। কিরণমালা দেখা নিয়ে ২০১৫ সালের নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোড়াবাড়ি এলাকায় চিত্তরঞ্জন সাহার দুই মেয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়। এটা এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে এক পর্যায়ে বড় বোন সঞ্জিতা সাহা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।

মর্মান্তিক ঘটনার এখানেই শেষ নয়। গত শুক্রবার রাত ৮টায় আরেক দুর্ঘটনা ঘটে কুষ্টিয়ার খোকসায়। উপজেলার চকহরিপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের স্ত্রী শোকেলা খাতুন বাড়ির পাশের দোকানে দলবেঁধে কিরণমালা দেখতে যান। স্টার জলসার এই সিরিয়ালের প্রতি এতটাই নেশা ছিল তার যে দুই শিশু কন্যাকে ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেন তিনি। এরই মাঝে ঘটে দুর্ঘটনা। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে তা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। কিরণমালায় মগ্ন থাকা মা খবর পেয়ে যখন বাড়িতে পৌছান, সে সময় ১০ বছরের সায়মা ঘরের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসলেও আগুনে পুড়ে মারা যায় সাত বছরের ছোট মেয়ে ঋতু। প্রতিবেশীরা গুরুতর দগ্ধ সায়মাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

এদিকে, এসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দেশের সাংস্কৃতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, এটা দেশের সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশীয় সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়বে। পরকীয়ার প্রকোপ সহ মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বন্ধনের ভাঙনের ঘটনা ঘটবে এদেশে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন






মন্তব্য চালু নেই