মেইন ম্যেনু

কুড়িল রেল ক্রসিং : যে মৃত্যুফাঁদ কেড়ে নিচ্ছে মেধাবীদের প্রাণ

২০১৪ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখ। সকালে কাজ ছিল পলাশের। বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভির প্রযোজনা সহকারী পলাশ রায় সকালে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু খুব বেশি দূর যেতে পারেননি। যেখান থেকে তার বাসে ওঠার কথা তার কয়েক ধাপ আগেই তিনি মারা যান। কতইবা বয়স পলাশের? মাত্র ৩০ বছরেই পলাশের জীবনপ্রদীপ কেড়ে নেয় ট্রেন। কুড়িল রেল ক্রসিং আর মৃত্যু যেন খুব নিকটবর্তী একটা শব্দ। একটু অসাবধানতার কারণে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হলো সম্ভাবনাময়ী সৃষ্টিশীল একজন পলাশকে।

পলাশের মৃত্যুর খবর বেশ আলোড়িত করেছিল দেশীয় মিডিয়াকে। কিন্তু তারপরও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। এরপর অসংখ্য প্রাণ গেছে এই ক্রসিংয়ে। এই রেল ক্রসিং পার হওয়া খুবই বিপজ্জনক। একবার রেললাইনে পা দিলে আর ট্রেন যদি চলেই আসে তাহলে পেছন দিকে ফিরে আসা মুশকিল। কুড়িল রেল ক্রসিং অতিক্রম করার আগে ভালোভাবে দুই দিকে তাকিয়ে তারপর রেললাইন পার হতে হবে। কিন্তু তারপরও যেকোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে। দুই দিকেরই রেললাইন বাঁক নেওয়ায় হুট করে ট্রেন চলে আসলে আর কোনো সিদ্ধান্ত কাজ করে না।

২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনজন মুসল্লি কুড়িলের ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। একই বছরের মার্চ মাসে ২৫ বছরের এক অজ্ঞাত যুবক মারা যান। জুলাই মাসের ১৬ তারিখেও ট্রেনে কাটা পরে মারা যান এক যুবক। এ বছরের মার্চ মাসে জুবায়ের হোসেন (২৫) নামে এক যুবকের ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যু হয়। দেখা গেছে কুড়িলে ট্রেনে কাটা পড়ে যাওয়া ব্যক্তিরা অধিকাংশই যুবক শ্রেণির। যাদের হাতে হয়তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অপেক্ষা করে। কিন্তু অকালেই চলে যেতে হয় এই মৃত্যু ফাঁদে পড়ে।

সর্বশেষ যে মৃত্যুটি ছুঁয়ে গেছে সম্ভাবনাময়ী তরুণ-তরুণীদের মনে তা হচ্ছে তোহার মৃত্যু। তোহা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে রহিম আফরোজ কম্পানিতে ইন্টার্ন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েক বছর যাবৎ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের বিলবোর্ডের মডেলিং এবং ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাসের বিভিন্ন ফ্যাশন প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় রেল ক্রসিং পার হতে গিয়ে উঠতি মডেল মাইনুল আলম তোহার মৃত্যু হয়। এইতো গত মঙ্গলবার বিকেলে রেল ক্রসিং পার হতে গিয়ে চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় মাথায় ও কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পান তোহা। এরপর স্থানীয়রা তাকে তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে একদিন চিকিৎসার পর অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় তোহাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় ডাক্তাররা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

কুড়িল রেল ক্রসিংয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। ওই ক্রসিংয়ে রেলওয়ের কোনো কর্মচারী না থাকায় ও রেলওয়ে পুলিশের উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ পারাপার হয়। এই রেল ক্রসিং পারাপার ছাড়া বিকল্প পথ নাই। বিস্ময়কর বিষয় হলো এখানে ওভার ব্রিজ নেই। কিছুদিন আগে একটা ওভার ব্রিজ বানানো হয়েছে সেটা একটু দূরে কিন্তু সেটা শুধু রাস্তা অতিক্রমের জন্য রেল ক্রসিং-এর জন্য নয়।

কুড়িল ক্রসিংসংলগ্ন চা দোকানদার ছাত্র হিমেল জানান, এখানে ফ্লাইওভার হওয়ার পর রেললাইনের দুই পাশে লোহার পাত দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। এ ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫ হাজার মানুষ পার‍পার হন। ফলে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। খিলগাঁও এলাকার ব্যবসায়ী ফরহাদ রেজা বলেন, গাড়ি চলাচলের জন্য এখানে ফ্লাইওভার করা হয়েছে। এখন মানুষ পারাপারের জন্য ওভারব্রিজ করা জরুরি।

এই মৃত্যু মিছিলকে উপেক্ষার উপায়? কর্তৃপক্ষের বক্তব্য শুনে হয় না, মৃত্যুকে ঠেকানো সম্ভব হবে। কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ বলেন, রেল ক্রসিংয়ের বিষয়টি দেখবে রেলওয়ে বিভাগ। এখানে আমাদের করণীয় কিছু নেই। এই রেল ক্রসিং দিয়ের তো আমিও মাঝে মাঝে হেঁটে রাস্তা অতিক্রম করি, হয়তো একদিন আমি ট্রেনের ধাক্কায় মারা যাব, কারো করণীয় থাকবে না। -কালের কন্ঠ






মন্তব্য চালু নেই