মেইন ম্যেনু

কেন ‘সন্ত্রাস’র পথ বেছে নিচ্ছে কাশ্মীরি তরুণরা?

বিশ্বের সবচে অস্থিতিশীল অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ এশিয়ার ভারত অধিকৃত কাশ্মীর। সংঘর্ষ, সংঘাত, ভারতীয় বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো এসব এই অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি নিয়মিত ঘটনা। জনপ্রিয় স্বাধীনতাকামী নেতা বুরহান ওয়ানির (২২) মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে কাশ্মীরে আবারো ঘটে গেল ভয়াবহ সহিংসতা। সংঘর্ষে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৬ জন। সর্বশেষ ওই এলাকার গণমাধ্যমও বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার।

অন্যান্য আন্দোলনের মতো ওয়ানির মৃত্যুর পরও রাস্তায় নেমে এসেছে কাশ্মীরের তরুণ সমাজ। ওই এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই তারা। নিজেদের কথাগুলো তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, ইন্টারনেট এবং টেলিফোন সেবা বন্ধ করে দেয়াসহ নানা বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন অব্যহত রেখেছে কাশ্মীরি তরুণেরা।

প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণরা কেন নিজেদের জীবন বাজি রেখে চালিয়ে যাচ্ছে আন্দোলন। এই প্রশ্নের উত্তর জানিয়েছেন কাশ্মীরের বিভিন্ন পেশার কয়েকজন তরুণ।

সামির আহমেদ ভাট

২৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বলেন, ‘আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে তাদের প্রতি পাথর ছুড়তে। তারা আমাদের উস্কে দিচ্ছে। যতক্ষণ তারা আমাদের উপর তাদের নৃশংসতা বন্ধ না করবে আমি পাথর ছুড়ে যাবো।’

হতাশাগ্রস্ত এই তরুণ আরো বলেন, ‘আজ আমি যাদের সঙ্গে আছি, আমি জানি না কাল তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শহিদ হয়ে যাবে কি না। তারা কেন আমাদের গুলি করে? দেশের অন্য জায়গায় আন্দোলন হলে জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। আর কাশ্মীরে ব্যবহার করা হয় বুলেট।

গত কয়েক দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে চোখ হারিয়েছে বেশকিছু কাশ্মীরি তরুণ। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছে শত শত লোক।

ফারজানা সাইদ

সাংবাদিকতায় যুক্ত ২৬ বছরের এই তরুণী। তিনি জানান, নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহতদের নিয়ে তিনি একটি গল্প তৈরি করেছেন। কিন্তু বর্তমানে যা পরিস্থিতি তাতে হাসপাতালে যাওয়া কঠিন। টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নিয়েই তৈরি করতে হচ্ছে রিপোর্ট। এছাড়া আর কোনো পথ নেই।

ফারজানা বলেন, ‘জনগণের মূল সমস্যার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। আমরা সব সময়ই কাশ্মীর ইস্যুতে একটি বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের সুযোগ দেয়া হয়নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের মূল সমস্যা অনুধাবনের চেষ্টা করছে না। এটাই সব সমস্যার প্রধান কারণ।

আকিব হোসেন

প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সরকারি হাসপাতালে যেতে হয় তরুণ চিকিৎসক আকিবকে। রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ হওয়ায় গাড়ির অবস্থা বারোটা বাজে। তবুও সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে হয় ২৫ বছরের আকিবকে।

তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরে যা হচ্ছে তা সাধারণ কোনো আন্দোলন নয়। আমরা একটা রাজনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত। জনগণের আত্মপ্রত্যয়ই এর মূল উৎস। বুরহান ওয়ানি ছিল আমাদের একটি নতুন আশা। সে ছিল আমাদের একজন গেরিলা আইকন। আমাদের আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। তরুণরা আবারো বন্দুকের দিকে ঝুঁকছে।’

এসার বাতুল

কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন ২৮ বছরের তরুণী এসার বাতুল। তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়তই কাশ্মীরি তরুণীদের উদ্দেশ্য করে নানা অশ্লীল মন্তব্য করে। তাদের নানাভাবে বিরক্ত করে। এসবের প্রতিবাদ করা যায় না। কারণ সৈন্যদের হাতে থাকে বন্দুক।

বুরহান ওয়ানি সম্পর্কে এসার বলেন, ‘বুরহান পাকিস্তানের সমর্থনের বাইরে গিয়েই ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। কারণ সে একজন কাশ্মীরি। সে কখনো সীমান্ত পাড়ি দেয়নি। পাকিস্তানের প্রশিক্ষণও নেয়নি। প্রত্যেকে তাকে নিজের সন্তান মনে করতো। এজন্যই তার হত্যাকাণ্ডে সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।’

সালমান সাগর

কাশ্মীরের তরুণ রাজনীতিবিদ সালমান সাগর (৩৬)। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু বুরহান ওয়ানির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। আরো অনেক ইস্যুই এর সঙ্গে জড়িত। বর্তমান সরকার আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। দুঃখজনক হলেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি জানান, এক দশকে এই প্রথম এত লোক মারা গেল। তরুণরা একটি রাজনৈতিক সমাধান চাচ্ছে। শিক্ষিত তরুণরা স্বাধীনতার পথ বেঁছে নিচ্ছে। বুরহানও একটি শিক্ষিত পরিবার থেকে এসেছিল। শুধু একটি সমাধানের আশায় তরুণরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে। এটাকেই তারা একমাত্র সমাধান মনে করছে।

মুশতাকুল হক আহমাদ সিকান্দার

কাশ্মীরের এই লেখক ও স্বাধীনতাকর্মী জানান, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং পুলিশের নির্মমতার মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের তরুণদের সম্মান ধূল্যিসাৎ করে দেয়া হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত এবং সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে না। কোনো উপায় না পেয়েই তরুণরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে। তারা শান্তিপূর্ণভাবেই সমস্যার সমাধান চায়। কিন্তু তা হচ্ছে না।






মন্তব্য চালু নেই