মেইন ম্যেনু

কেমন হয় হিজড়াদের ঈদ?

সমাজে অবহেলিত, স্থান নেই, বিয়ে হয় না, কেউ দাম দেয় না। বাজার-ঘাটে হাত পেতে তুলেই খেতে-পড়তে হয়। কেউ বাসা ভাড়া দেয় না। অন্যের গাল-মন্দ শুনেই চলতে হয়। বলছি তৃতীয় লিঙ্গ গোত্রীয়দের কথা। সম্প্রতি তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার কাজ করছেন অনেকেই। সরকারও তাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আসন্ন ঈদে হিজড়াদের নিজস্ব কোনো আয়োজন নেই। মহল্লাবাসীর আনন্দই ঢাকার ২ লাখ হিজড়াদের আনন্দ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তিলপাপাড়া দক্ষিণ গোড়ানের এক আত্মীয়ের বাসায় একান্ত আলাপকালে ঈদ আয়োজন সম্পর্কে জানান ৪৭ বছর বয়সী হিজড়া ময়না। সবাই তাকে ময়লা খালা বলে চিনেন। কুমিল্লার হোমনা থানার মেয়ে তিনি। জন্মের পর থেকেই তিনি হিজরা হিসেবে পরিচিত।

হিজড়াদের ঈদ প্রস্তুতি কেমন জানতে জন্য প্রথম খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকার হিজড়াদের ভান্ডারী কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল অফিস বন্ধ। সবাই যার যার মত গ্রামের চলে গেছেন। ঈদের পরে সব হিজড়ারা ঢাকামুখী হবেন। কাউকে পাওয়া গেল না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কাউকে পাওয়া না গেলে হিজড়াদের নিয়ে ঈদ উদযাপন কীভাবে লিখবো?

প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর ‘ময়না খালা’ নামে একজনের ঠিকানা মিললো। তার দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী তিলপাড়ার দক্ষিণ গোড়ানের বাসায় গেলাম। পরিচয় জেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো ছবি তোলা যাবে না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার গুরু মায়ের আদেশ, কোনো ছবি তোলা যাবে না।’

ছবি না তোলার প্রতিশ্রুতি দিলে ময়না খালা পরে তার আত্মীয়ের বাসার ছোট একটি রুমে নিয়ে যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই হিজড়ার অপবাদ মাথায় নিয়ে ঢাকায় চলে আছি। গুরু মা বকুল হাজী আমাকে স্থান দেন। আমার গুরু মা হজও করেছেন। তার নির্দেশ-আদেশ নিয়েই এতদিন থেকে হিজড়া হয়ে জীবন জীবিকার জন্য বাজার ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

ময়না খালা অন্যান্য হিজড়াদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি বলেন, ‘রাজধানীর শ্যামপুর, জুরাইন, টঙ্গী, ফকিরাপুল, মাড্ডা, চৌধুরী পাড়া, আফতাব নগরসহ সারা ঢাকা শহড়ে ২ লাখ হিজড়া রয়েছে। এদের নিজস্ব কোন ঈদের আয়োজন নেই। ঈদ উপলক্ষে তাদের ছুটি দেয়া হয়েছে।’ হাতে গোনা কয়েকজন হিজড়া বাদে সবাই গ্রামের বাড়ী মা-বাবার কাছে চলে গেছে বলে ময়না খালা জানান।

আপনি কোথায় ঈদ করবেন জানতে চাইলে ময়না খালা বলেন, ‘হিন্দু, মসুলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের হিজড়া আছে আমাদের এইখানে। ঈদ কি এটাই অনেকেই জানেও না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এদের কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। জীবন জীবিকার কারণে হাট, ঘাট, বাজার, কোন মহিলার বাচ্চা হলে হিজড়ারা আনন্দ উল্লাস করে যা পায় তাই দিয়ে জীবন চলে তাদের।’

আমাদের হিজড়াও চায় অন্যান্যদের মত জীবন সংসার হতে। কিন্তু কোনো উপায় নেই। হিজড়ারা এ দেশের নাগরিক। ভোটার আইডি কার্ডও আছে অনেকের। অথচ কোনো সুবিধা তাদের নেই। বাসা ভাড়া করতে গেলে ভাড়া দেয়া হয় না। কাজ দেয় না, অন্যের গাল-মন্দ শুনেই হিজড়াদের চলতে হচ্ছে।

ময়না খালা আরও বলেন, ‘বাঁধন নামে হিজড়াদের একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান আছে। সেই প্রতিষ্ঠার পক্ষ থেকে সরকারে কাছে তাদের অধিকার বাঁচারমত বাঁচতে চাই এই দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করা হলে, সরকার গুলিস্তানে একটি অফিস করে দিয়েছে। এই পর্যন্তই। এর বেশী সরকার হিজড়াদের নিয়ে কিছুই করে নাই।’

ময়না খালার সঙ্গে আলোচনা শেষ করে রাজধানীর সবুজবাগ থানার বিপরীতমুখী রাস্তায় এল হিজড়া তাহমিনা, সুস্মিতা, সুমি ও সানজিদা নামে ৪ হিজড়ার সঙ্গে দেখা হয়। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেল সুমি ও সানজিদা এবার নিজের পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবে। মা, ভাই-বোনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগ করে নিতে চায় তাহমিনাও।

সুস্মিতা বাবা-মায়ের সঙ্গে আনন্দ করতে চায় আসছে দূর্গা পূজায়। এদের সকলেই এই প্রথম পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ উদযাপন করবে। তাহমিনা জানান, ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আশ্বাসে পরিবার-পরিজন তাদের নিয়ে নতুন করে ভাবছে।






মন্তব্য চালু নেই