মেইন ম্যেনু

কে ছিলেন এই তারিক আজিজ?

ইরাকের কারাগারে মারা গেলেন সাবেক ইরাকি উপ প্রধানমন্ত্রী তারেক আজিজ। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হুসেইনের মন্ত্রী পরিষদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন পরবর্তী সময়ে সাদ্দাম হুসেইন অনুগতদের মধ্যে সর্বশেষ তিনিই একমাত্র বেঁচে ছিলেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাদ্দাম হুসেইন এবং বাথ পার্টির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। যদিও এখনও ইরাক ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাথ পার্টি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

জীবিত থাকা অবস্থায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ইরাকের পক্ষে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তারিক আজিজ। মূলত তার চেষ্টাতেই ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, যদিও ঠিক বিশ বছর পরই যুক্তরাষ্ট্রই সেই সুসম্পর্ক নষ্ট করেছিল। ২০০৩ সালে এই যুক্তরাষ্ট্রই ইরাকে অবৈধভাবে অভিযান চালানোর সময় সাদ্দামের মন্ত্রী সভার ৫৫ জন সদস্যের মধ্যে ৪৩জনকে সবচেয়ে বিপদজনক আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা কিংবা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশের ধারাবাহিকতাতেই মূলত কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই সাদ্দাম হুসেইনের অনুগতদের মধ্যে অনেককেই হত্যা করা হয়েছে।

১৯৩৬ সালে চালদিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে জন্মেছিলেন মিখাইল ইউহান্না। যদিও একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে মিখাইলকে তার সত্যিকারের পরিচয় লুকিয়ে হতে হয়েছিল তারিক আজিজ। বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা করেন, যে কারণে পরবর্তী সময়ে খুব সহজেই ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে বর্হিবিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছিলেন। ১৯৫৭ সালে মূলত তিনি বাথ পার্টিতে যোগদান করেন। এখানে বলে রাখা ভালো, যে বছর তিনি বাথ পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন ঠিক তার এক বছর আগেই ইরাকি সেনাবাহিনীর সফল ক্যুয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সামন্তবাদী শাসনের শেষ হয়। শুরুর দিকে বাথ পার্টির নেতৃত্ব ছিল আসলে শিয়াপন্থীদের হাতে এবং পার্টিটি সেক্যুলারিজম ও আরবের ঐকবদ্ধতার কথা বলতো। আরবের বাইরের কোনো দেশ যাতে আরবকে শাসন করতে না পারে সেজন্য চাই আরব দেশগুলোর একাত্মতা, এই বাস্তবতা প্রথম ফুটে উঠেছিল বাথ পার্টির ইশতেহার ও গঠণতন্ত্রে। যদিও শুরুর দিকে বাথ পার্টি নিজেদের ঘর গোছানোর জন্য যে সময় দরকার ছিল তা না দেয়ায় ধীরে ধীরে বাথ পার্টি হয়ে ওঠে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে ইচ্ছুক সুন্নিদের একটি সংগঠনে।

১৯৬৮ সালে বাথ পার্টির অন্যতম সদস্য হাসান আল বাকেরের নেতৃত্বে এক সফল আভ্যন্তরীন ক্যুয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বাথ পার্টি। ক্ষমতা গ্রহন পরবর্তীতে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহন করেন হাসান আল বাকের এবং নিজের চাচাতো ভাই সাদ্দাম হুসেইনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসান। ঠিক সেই সময় তারিক আজিজ ছিলেন একজন সাংবাদিক ও স্কুল শিক্ষক। বাথ পার্টি ক্ষমতা গ্রহনের পর তাকে পার্টি পত্রিকা আল তাওয়ারার সম্পাদক বানানো হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালে তাকে ইরাকে সর্বোচ্চ রেভ্যুলেশনারি কমাণ্ড কাউন্সিলেও অর্ন্তভূক্ত করা হয়। এর দুই বছর পরেই তাকে উপমন্ত্রী বানানো হয় এবং একই বছর সাদ্দাম হুসেইন প্রেসিডেন্ট হন।
1991-irag

ধারণা করা হয়, ১৯৮০ সালে তারিক আজিজকে হত্যার জন্য যে আক্রমন চালানো হয়েছিল তার পেছনে ইরান জড়িত ছিল। কারণ সেই হামলায় জড়িত ছিল ইরাকি আন্ডারগ্রাউন্ড শিয়া পার্টির কিছু সদস্য। এই হামলার কয়েক মাস পরেই রাষ্ট্রীয়ভাবে শিয়াদের উপর আক্রমন চালানো হয়েছিল, যা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। টানা আট বছরের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তারিক আজিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হোয়াইট হাউসে যান এবং ১৯৮৪ সালের নভেম্বর মাসে তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের সঙ্গে আলোচনা করেন।

ধারণা করা হয় ওই আলোচনার পরেই মূলত ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তবে ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমন করলে সেই সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং সেবারই প্রথমবারের মতো তারিক আজিজ জনসমক্ষে আসেন। সেসময় তিনি যুদ্ধের বাস্তবতা এবং এর সম্ভাব্যতা নিয়ে জেনেভায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বাকেরের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন। ওই আলোচনার সময় জেমস বাকের তারিক আজিজের হাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. বুশের লিখিত একটি চিঠি তুলে দেন সাদ্দাম হুসেইনের উদ্দেশ্যে। সেই চিঠি পড়ার পর তারিক আজিজ সেটা আবার জেমস বাকেরকে ফেরত দেন এবং জানিয়েছিলেন যে, বুশ যে ভাষায় কথা বলেছেন তা ইরাকের প্রেসিডেন্টের পড়ার যোগ্য নয়। আলোচনা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরাককে এই বলে সতর্ক করে দেয়া হয় যে যুদ্ধের সময় ইরাক যদি বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করে তাহলে ওয়াশিংটন বাগদাদে হামলা চালাবে এবং সাদ্দাম হুসেইনকে উৎখাত করবে। ওই আলোচনার সময় তারিক আজিজ অবশ্য কিছুটা চেষ্টা চালিয়েছিলেন কুয়েত থেকে ইরাকি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে। তবে তিনি দেশে ফিরে আলোচনার সারবস্তু সাদ্দাম হুসেইনকে বলেওছিলেন। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা হয় যে, ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বিবদমান পার্টিগুলোকে একত্রিত করার কাজটি তারিক আজিজ ঠিকমতোই করেছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো ১৯৯১ সালেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তারিক আজিজকে, কারণ সাদ্দাম হুসেইনের মনে হয়েছিল যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। তখনই মূলত তাকে ইরাকের উপ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা হয় এবং ২০০৩ সালের আগ পর্যন্ত সেই পদেই ছিলেন তিনি। ধর্মে তিনি খ্রিষ্টান হওয়ায় তার পক্ষে কোনোভাবেই ইরাকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ ছিল না, তবে তিনি সাদ্দাম হুসেইনের একজন যোগ্য পরামর্শক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ইরাকে মার্কিন বাহিনী আগ্রাসন চালানো শুরু করলে এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন তারিক আজিজ। ২০১০ সালে ইরাকের সুপ্রিম কোর্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ইরাকের শিয়া এবং কুর্দিদের হত্যার অভিযোগে তাকে ওই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃত অবস্থায় তাকে রাখা হয়েছিল ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাসিরিয়ার একটি কারাগারে। সেই কারাগারে থাকাকালীন সময়েই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান।






মন্তব্য চালু নেই