মেইন ম্যেনু

কোন জেলায় দারিদ্র্যের হার কেমন এবং কেন?

সাধারণত কোনো এলাকায় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ থাকলে সেখানে উন্নয়ন প্রকল্প বেশি নেয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেসব এলাকায় উন্নয়নও হয় বেশি। আর উন্নয়নের হাত ধরে কমার কথা দারিদ্র্য। কিন্তু সরকার ও বহুজাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক দারিদ্র্যের মানচিত্র বলছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অনেকেরই নিজ জেলায় দারিদ্র্যের উচ্চহার রয়েছে।

যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয় জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে। কোনো অঞ্চলকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয় না। তাছাড়া তারা আরো দাবি করেন, দারিদ্র্যের যে মানচিত্র সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করা হয়েছে, তা পুরনো খানা জরিপের ভিত্তিতে। ২০১৫ সালের খানা জরিপের কাজ চলছে। নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ হলে এ মানচিত্রে অনেক পরিবর্তন চোখে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৪ সালে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত জেলাগুলোর একটি তালিকা করে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। তাতে সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ১৫টি জেলার র্যাংকিং করা হয়েছে; যেখানে দারিদ্র্যের হার দেশের গড় দারিদ্র্যের চেয়ে অনেক বেশি। পরিকল্পনা কমিশনও দারিদ্র্য নিরসনে এ ১৫ জেলাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। দারিদ্র্যপীড়িত ১৫টি জেলার এ তালিকা সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশে উচ্চদারিদ্র্যের গড় হার ছিল ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। ওইসব জেলার মধ্যে কোনো কোনোটিতে এ হার ছিল দেশের গড় দারিদ্র্যের প্রায় দ্বিগুণ। ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩২ জেলার দারিদ্র্য সারা দেশের গড় দারিদ্র্যের চেয়ে বেশি। তবে ২০১৫ সালের দারিদ্র্য পরিমাপে দেশে উচ্চদারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৪ থেকে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে বলে পরিকল্পনা কমিশন প্রাক্কলন করেছে। যদিও জাতীয়ভিত্তিক দারিদ্র্য প্রাক্কলন করা হলেও জেলাভিত্তিক হিসাব এখনো পরিমাপ করা হয়নি।

বিশ্বব্যাংক ও ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য রয়েছে উত্তরবঙ্গের জেলা কুড়িগ্রামে। জেলাটিতে ওই সময় উচ্চদারিদ্র্যের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশাল। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বরিশাল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকসহ এ জেলা থেকে উঠে এসেছেন বিভিন্ন সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী।

দারিদ্র্য হারের দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে শরীয়তপুর। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ। মহাজোট সরকারের আগের মেয়াদে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর বাড়ি এ জেলায়। এছাড়া আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের জন্মস্থান এ জেলা।

সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বণিক বার্তাকে বলেন, কোন এলাকায় কোন বড় রাজনীতিবিদের বাড়ি, সেটা হিসাব করে প্রকল্প নেয়া হয় না। বরং কোথায় বরাদ্দ দিলে দেশের সার্বিক উন্নতি হবে, সে বিষয়টিতেই গুরুত্ব দেয়া হয়। আর দারিদ্র্য নিরসনে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোর জন্য সরকার বিশেষ নীতি-কৌশল বাস্তবায়ন করছে। ধীরে ধীরে দারিদ্র্য পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব হবে।

উচ্চদারিদ্র্যে শরীয়তপুরের পরই রয়েছে জামালপুর। এ জেলায় দারিদ্র্যের হার ৫১ দশমিক ১ শতাংশ। বর্তমান সরকারের বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের জেলা এটি। দলেও তিনি প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত। উচ্চদারিদ্র্যের হারে পঞ্চম অবস্থানে থাকা চাঁদপুরে এ হার ৫১ শতাংশ। বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এ জেলার বাসিন্দা। সরকারের আগের মেয়াদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিও এ জেলার বাসিন্দা।

রাজনৈতিকভাবে আরেক প্রভাবশালী জেলা ময়মনসিংহে দারিদ্র্যের হার ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বর্তমান সরকারের ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানসহ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের জেলা এটি। এছাড়া সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নিজ জেলা শেরপুরেও উচ্চদারিদ্র্য রয়েছে। জেলাটিতে দারিদ্র্যের হার ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে গাইবান্ধা। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৪৮ শতাংশ। সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া এ জেলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

উচ্চদারিদ্র্যে নবম অবস্থানে থাকা সাতক্ষীরায় দারিদ্র্যের হার ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের জেলা এটি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বর্তমানে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জেলা রংপুর। জেলাটিতে দারিদ্র্যের হার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া মাগুরায় দারিদ্র্যের হার ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সহকারী একান্ত সচিব-২ সাইফুজ্জামান শিখরের বাড়ি এ জেলায়। এর পরের অবস্থানে রয়েছে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেলা পিরোজপুর। জেলাটিতে দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ১ শতাংশ।

জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দারিদ্র্যকে বিদায় জানাতে সরকার কাজ করছে। এজন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসবের উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বেশি থাকা সত্ত্বেও পিরোজপুর বর্তমানে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উত্পাদনকারী জেলা।

বাগেরহাটে দারিদ্র্যের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। উচ্চদারিদ্র্যের জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজ জেলা গোপালগঞ্জও। এ জেলায় ওই সময় গড় দারিদ্র্য ছিল প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া ১৫তম অবস্থানে রয়েছে রাজবাড়ী জেলা। সেখানে দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ।

যেসব এলাকায় নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেশি, সেসব এলাকাতেই উচ্চদারিদ্র্য বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি হাওড় অঞ্চলের অবকাঠামো সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন তারা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাওড় অঞ্চলে অবকাঠামো সমস্যার পাশাপাশি এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক ভূমি মালিকানা বিদ্যমান। এ বিষয়গুলো সমাধানে জোর দিতে হবে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা জালে সরকারের যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলোর আওতায় দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোর জন্য একটু বেশি সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

দারিদ্র্য নিরসনে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় নীতিসহায়তা ও অর্থসহায়তা দেয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের চেষ্টা চলছে। আর ওইসব এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে কর অবকাশসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, সাধারণভাবে লক্ষ করা যায়, যেসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার ভালো উন্নয়ন হয়েছে, সেখানে দারিদ্র্য বেশি কমেছে। কিন্তু সব এলাকায় একইভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয় না। যেমন হাওড় অঞ্চল ও নদীপ্রবণ এলাকা। সেখানে সমতলের মতো অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে ওই এলাকার দারিদ্র্য নিরসনে বিশেষ কৌশল নেয়া হচ্ছে। একইভাবে চর অঞ্চলসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জন্য আমরা কাজ করছি। তবে দারিদ্র্য নিরসনে বড় ভূমিকা রাখে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি। এজন্য সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে।-বনিকবার্তা






মন্তব্য চালু নেই