মেইন ম্যেনু

ক্রিকেটই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন সৌম্য!

সৌম্য শান্ত সরকার থেকে তিনি এখন সৌম্য সরকার। সময়ের ব্যবধানে ‘শান্ত’ শব্দটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। হারানোরই তো কথা। ২২ গজে যেমন তার হালচাল তাতে এই শব্দটা যে বড় বেমানান। সেই কারণ হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, সৌম্য তার নামের ভেতর থেকে ‘শান্ত’ শব্দটা কেটে ফেলেছেন। ‘সৌম্য’ শব্দের অর্থও একই। তবে সরাসরি এখানে প্রচলিত ‘শান্ত’ শব্দকে খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো তাই সৌম্যটা রেখে দিয়েছেন।

গতকাল বৃষ্টিতে দিনের খেলা পণ্ড হওয়ায় হোটেলে অলস সময় কাটিয়েছেন ক্রিকেটাররা। সেখানেই ধরা গেলে সাতক্ষীরার এই ‘নবাগত নায়ক’কে। কথা বললেন ছোটবেলা, এইবেলা আর ‘ভবিষ্যৎ-বেলা’ নিয়ে।

জাতীয় দলে খেলার পর খুব স্বাভাবিকভাবে জগতটাই পাল্টে গেছে সৌম্যর। রাস্তায় বেরোলে মানুষের বিপুল আগ্রহ তাকে দোলা দিয়ে যায়। বিশেষ করে নিজ শহরে গেলে এই অবস্থাটা টের পান বেশি করে, ‘বাড়ি গেলে মানুষ আমাকে দূরদূরান্ত থেকে দেখতে আসে। ভোর পাঁচটায় বাড়ির সামনে হাজির হন! এসব ভালোই লাগে। কিন্তু সব সময় তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয় না।’

মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তার ক্রিকেটীয় জীবন কখনো বাধাগ্রস্ত হয়নি, ‘বিশেষ করে আমার পরিবার থেকে কখনো কোনো বাধা পাইনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে খেলোয়াড় হতে চাইলে অনেক চিন্তা সামনে আসে। এই প্রতিযোগিতার যুগে সে কতদূর যেতে পারবে-এটাও একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমার পরিবার কখনো ওইভাবে ভাবেনি।’

‘তারা সব সময় আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। এমনকি এখনো। বাবা-মা এখন খুশি হলেও ভালো খেলতে আর অনেক দূর যেতে সবসময় তাগাদা দেন।’ বলছিলেন সৌম্য।

বাড়ি ছেড়ে যখন কেউ বাইরে পড়াশোনার জন্য আসেন, সেই দিনগুলোতে এমন কেউ নেই যে বাড়ির জন্য চেখের জল ফেলেননি। কেউ মেসে নিভৃতে কাঁদেন, কেউ হলের বারান্দায় মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থাকেন। কবে ছুটি পাবেন, কবে বাড়ি যাবেন-এই চিন্তায় দিন পার হয়ে যায়। সৌম্যর ভেতর এই প্রবণতা ছিল মারাত্মক রকমের। বললেন, ‘বাড়ির প্রতি দুর্বলতার কারণে ক্রিকেটই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। যখন বিকেএসপিতে ভর্তি হই, তখন তো একদমই মন টিকতো না। শুধু বাড়ির কথা মনে পড়ত। ভাবতাম, ক্রিকেটটাই ছেড়ে দেব!’

এখন এতটা দুর্বলতা না থাকলেও পুরোপুরি সেটা যায়নি বলে জানালেন তিনি, ‘এখনো বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। এক দিনের ছুটি পেলেও বাড়ি উড়াল দেই।’

তবে বিশ্বকাপে বাড়ির কথা অতটা মনে পড়েনি সৌম্যর। বললেন, ‘দলে ঢোকার পরও বাড়ির প্রতি দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। তবে বিশ্বকাপে সেভাবে এই অভাবটা টের পাইনি। এর কারণ ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই খুব সংঘবদ্ধ। ক্লোজ। একে অপরের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। বলতে পারেন, আমাদের ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনেও এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

‘আমার লক্ষ্য বাংলাদেশের হয়ে ১০-১২ বছর খেলা। আমি জানি এ জন্য আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। বিশ্বকাপ থেকে প্রায় প্রত্যেকটি ম্যাচে আমি ভালো শুরু করছি, কিন্তু সেগুলো বড় ইনিংসে পরিণত করতে পারিনি। ইদানীং এই সমস্যা অনেকটা কাটিয়ে উঠছি বল মনে হয়। এর কারণ ২০ রানের পর আমি ব্যাটিংয়ে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছি। শট নির্বাচনে সতর্ক হচ্ছি। এই সিরিজের পর কিছু বিষয় নিয়ে বাড়তি কাজ করতে হবে।’

সৌম্য অনুভব করেন দলে টিকতে হলে প্রতিযোগিতার বিকল্প নেই, ‘অমাদের এখানে প্রতিভা আছে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই স্থায়ী হতে পারে না। তবে আমি অনেক দূর যেতে চাই। খারাপ সময় আসবে-এই চিন্তা এখনি করতে চাই না। ব্যাটিং আর প্রাপ্তি উপভোগ করছি। করে যেতে চাই।’

কিছুদিন আগে মাশরাফি বলেছেন সৌম্য দশ হাজার রান করার ক্ষমতা রাখে। সৌম্য এটা শুনেছেন। বললেন সেই চেষ্টাই করে যাবেন, ‘মাশরাফি ভাইয়ের কথা আমি বিশ্বাস করি। এটা আমারও স্বপ্ন। যদি ১০-১২ বছর খেলতে পারি, তবে হয়ে যাবে। আরো কিছু স্বপ্ন আছে। স্বপ্ন দেখি সেগুলো একদিন সত্যি হবে।’

মাশরাফিকে যোদ্ধা আখ্যায়িত করে সৌম্য বলেন, ‘তিনি হলেন আসল যোদ্ধা। জানেন কিভাবে একজনের ভেতর থেকে সেরাটা বের করতে হয়। মাশরাফি ভাইয়ের মতো আমি বিশ্বাস করি, ভালো ক্রিকেটার হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। তাই আমি লড়াইয়ের মানসিকতা পছন্দ করি। আর এ কারণেই সাকিব আর যুবরাজ সিং আমার প্রিয় খেলোয়াড়।’

সাকিব, যুবরাজকে ভালো লাগলেও আরো দুজন আছেন, যাদের দেখে বামহাতি ব্যাটসম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সৌম্য। ছেলেবেলায় ডানহাতি ছিলেন। সৌরভ, লারাকে দেখেই ব্যাট তুলে নেন বামহাতে, ‘যখন খেলা শুরু করি, তখন কিন্তু ডানহাতি ছিলাম। কিন্তু সৌরভ এবং লারার ড্রাইভ দেখে বামহাতি হয়ে যাই। দেখে থাকবেন, আমি ডান হাত দিয়েই থ্র করি। এমনকি বলও করি ডান হাতে।’

জানালেন, এখন পর্যন্ত যাদের বল খেলেছেন, তাদের মধ্যে ট্রেন্ট বোল্টকেই বেশি কঠিন মনে হয়েছে তার কাছে।

‘ক্রিকেট এখন আমার পেশা। রুটি-রুজি। একই সঙ্গে লেখাপড়াও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়ছি। তবে সবার আগে ক্রিকেট। আমার দর্শনটা খুব স্বাভাবিক-হৃদয় থেকে ক্রিকেট খেলে যেতে চাই। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।’ স্বপ্নরা ডানা মেলে ২২ বছরের এই তরুণের চোখে।

তথ্যসূত্র: ডেইলিস্টার।






মন্তব্য চালু নেই